প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা

হোসনে আরা মেঘনা

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে পারেনি। আর প্রাথমিক শিক্ষা হলো সকল শিক্ষার মূল ভিত্তি। ভীত শক্ত না হলে প্রাসাদ যেমন টেকসই হয়না, তেমনি প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার উপরের ধাপও পেরোতে পারেনা। এর গুরুত্ব অনুধাবণ করে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ  গ্রহণ করেছেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি ফুলের উদ্যান। এখানে শিশুরা ফুলগাছ আর শিক্ষকরা হলেন মালী। মালী যদি চারাগাছের সঠিক যত্ন নেন, তবে সে গাছ শক্তিশালী হবে এবং পরিপূর্ণ পুষ্পে পুষ্পিত হবে। অতএব, শিশুর মাঝে লুকায়িত থাকা সৎ ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন এবং সৃজনশীলতায় উদ্বুদ্ধ করে তোলাই একজন শিক্ষকের মুখ্য কাজ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা 

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধান শিক্ষককে নানা ভুমিকায় অভিনয় করতে হয়। ভূমিকার যথাযথ রূপ প্রদর্শিত হলে প্রাথমিক শিক্ষা অনায়াসে একজন শিক্ষার্থীর শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে। চলুন জেনে নেই একজন প্রধান শিক্ষক কি কি রূপে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ পান।

১. সুযোগ্য প্রতিনিধি :  প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে, শিক্ষার্থীদের আচরণের কাঙ্খিত ও বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে প্রধান শিক্ষক নিজ বিদ্যালয়ে যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব করেন।

২. উপযুক্ত সংগঠকঃ শিক্ষা কর্মকে তরান্বিত করতে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর সঠিক অগ্রগতির লক্ষ্যে প্রধান শিক্ষক অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক -এই তিন ব্যাক্তিকে একই সরল রেখায় অবস্থান করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

৩. বিজ্ঞ গবেষকঃ প্রধান শিক্ষক প্রতিটি শ্রেনীতে প্রতিটি শিক্ষকের পাঠ উপস্থাপন পর্যবেক্ষণ করেন, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির যথাযথ মূল্যায়ণ করেন, অপারগ শিশুর নিরাময়মূলক ব্যবস্থা নেন এবং প্রয়োজনে পাঠপরিকল্পনা, পাঠটীকা, শিখনফল ডায়েরীতে নোট করে পাঠ উপস্থাপন বা প্রদর্শণের নির্দেশনা দেন।

৪. পরিকল্পনা প্রণেতাঃ শিক্ষার্থীদের গ্রহণ ক্ষমতা, চাহিদা, আগ্রহ, প্রয়োজন, বয়স ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে শিক্ষা কর্মকান্ডে সামঞ্জস্যতা বিধান করতে নির্দিষ্ট কর্মসূচী গ্রহণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন প্রধান শিক্ষক।

৫. বিচক্ষণ বিশেষজ্ঞঃ  প্রথমিক স্তরের ২৯টি প্রান্তুিক যোগ্যতার সবগুলো যাতে শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞের ভূমিকা পালন করেন এবং এ দায়িত্বে তিনি ঐকান্তিক একাগ্রতার পরিচয় বহন করেন।

৬. সক্ষমকারী মটিভেটরঃ শিক্ষার্থীদের কুসংস্কার হতে দূরে রাখতে মা সমাবেশের মাধ্যমে উন্নত মানসিকতা তৈরী, সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত, দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ইত্যাদির লক্ষ্যে প্রধান শিক্ষক এক জন সক্ষমকারী মটিভেটরের দায়িত্ব পালন করেন।

৭.উত্তম প্রশিক্ষকঃ সহকারী শিক্ষকদের সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছা, সময়মত শ্রেণিতে গমন, শ্রেণি-শৃঙ্খলা রক্ষা,নিয়ম মেনে পাঠ উপস্থাপন এবং পাঠের কাঙ্খিত যোগ্যতা ও শিখনফল অর্জনে প্রধান শিক্ষককে উত্তম প্রশিক্ষকের ভূমিকায় থাকতে হয়। তিনি সহকারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পিটিএ এবং এসএমসি ‘র উত্তম প্রদর্শকও বটে। তাঁকে “জাতির বিবেক” বলেও আখ্যা দেওয়া হয়।

৮. যোগ্য তত্ত্বাবধায়কঃ  প্রতিষ্ঠানে তিনি সদা নিরপেক্ষ ভূমিকায় থেকে সকল বিষয়ের তত্ত্বাবধান করে থাকেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সহযোগিতায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ও দেখভাল করেন।

৯. যোগ্য সমন্বয়কারীঃ তিনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে স্টাফ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, এসএমসি, পিটিএ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নির্বাচিত প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিভিন্ন দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে সমন্বয় সাধন করেন।

১০. নীতি নির্ধারকঃ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে সহকারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিদ্যালয়ের চার পাশের জনসাধারণের জন্য প্রধান শিক্ষককে কিছু নিয়ম -নীতিও নির্ধারণ করতে হয়।

পরিশেষে বলা যায়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকই সর্ব বিষয়ে ব্যবস্থাপকের ভূমিকায় আছেন। তিনি সকল কর্মের উত্তম পরামর্শদাতা, নীতি প্রণয়নকারী, তিনিই আদর্শ নেতা এবং সর্বপরি তিনিই জাতির মূল্যবোধের উদ্বুদ্ধকারী।

লেখকঃ শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

আরও পড়ুন