বেকারত্ব কি আমাদের মূর্খ জাতিতে পরিণত করছে?!

মুনীরা রাহমান তাশফী

বাংলাদেশে বেকারত্ব ভয়াবহ প্রকট রূপ নিয়েছে। এটা একটি জাতির জাতিগত মূর্খতার প্রতিফলন মাত্র! কারণ, যে জাতি তার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ক্রাইসিস মোকাবেলা করতেই পারছে না যুগ যুগ ধরে, এই অবস্থাকে আপনি সেই জাতির জাতিগত মূর্খতা ছাড়া আর কী বলবেন?

যাই হোক, বেকারত্ব— জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল নয়। এমনকি চাকুরির বাজারে কম্পিটিশন বেড়ে যাওয়াও মূল কারণ নয়। বেকারত্বের কারণ হিসেবে সবসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও চাকুরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করার মানে হলো— শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো ব্যাপার। অর্থাৎ, মূল কারণ থেকে ফোকাস সরিয়ে দেওয়া।

তো এখন প্রশ্ন হলো, প্রধান সমস্যাটি কী? মূল সমাধানটাইবা কী!

প্রধান সমস্যা হলো, আমাদের দেশের কর্মসংস্থান সেক্টরগুলোতে যেই বেসিক চাহিদা ও দক্ষতাগুলো বিশেষভাবে প্রয়োজন, সেসবের সাথে সমন্বয় না করেই আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। আর সেটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। চলছে গাড়ি, ঠ্যালাগাড়ি—এই অবস্থা!

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান সিলেবাস ও পাঠ্যসূচী সম্পর্কে নিশ্চয়ই সবার কমবেশি জানাশোনা আছে। চিন্তা করুন তো, অনার্স-মাস্টার্স করেও বেসিক দক্ষতার অভাবে চাকুরি পাচ্ছে না লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। অনেক সময় নিয়োগদাতা চাইলেও নিতে পারছে না।

কারণ বেশিরভাগ আবেদনকারীই বেসিক দক্ষতায় কাঁচা থাকে এবং প্রায়ই দেখা যায় প্রদত্ত কাজের প্র্যাকটিক্যাল ক্ষেত্রগুলোতে অদক্ষ। এখন দেখুন,যেখানে নিয়োগকারীর প্রয়োজন দক্ষ কর্মী, সেখানে তিনি অদক্ষ, আনাড়ি বা আনকোরা কাউকে নিবেন কিভাবে?!

তাহলে ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী কি ঘাস খেয়ে পড়াশোনা করেছে? না, তেমনও নয়। আসল ব্যাপার হলো, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে এবং পাঠপদ্ধতিতে এদেশের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বেসিক দক্ষতাগুলো অর্জনে কার্যকর কোনো ফোকাস দেয়নি।

এ পর্যায়ে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এদেশে এত লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত বেকার থাকতে কিভাবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, কোরিয়া থেকে সেদেশের নাগরিকরা এদেশে এসে বড় বড় গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানায় চাকুরি করছে এবং শত শত কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে তাদের দেশে।

এ বিষয়ে নয়া দিগন্তের একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে:

বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করে তার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশীরা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৬ সালে ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (মার্কিন) এবং ২০১৭ সালে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করে। অপর দিকে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশীরা বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে রেমিট্যান্স হিসেবে। এর মধ্যে শুধু ভারতীয়রাই বছরে নিয়ে যায় ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা। (২৫ আগস্ট, ২০১৮)।

বিদেশীরা আমাদের দেশে বড় বড় চাকুরি করে আমাদের প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত রেমিটেন্সের বড় একটি অংশ তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। এরচে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে এ জাতির!

কিন্তু কথা হলো, তারা তো এখানে মামু-চাচা কিংবা গায়ের জোরে চাকুরি পায় না। তারা যোগ্যতাবলেই চাকুরি পেয়ে থাকে। এদেশের কর্মসংস্থান সেক্টরে সবচে কাঙ্ক্ষিত কমন যোগ্যতা হলো- ইংরেজিতে সাধারণ বাতচিত ও করেসপন্ডিং করতে পারা। আর হলো, স্ব-স্ব ফিল্ডে প্র্যাকটিকাল নলেজ থাকা। এই দুই দিককে ফোকাস করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি। কারণ, লেখাপড়া শুধু সার্টিফিকেটের জন্য নয়, চাকুরি পেতে এবং করতেও কাজে লাগতে হবে তো, নাকি?

শিক্ষাব্যবস্থায় তথাকথিত সৃজনশীল, পিএসসি, জেএসসি- এসব ভুংভাং সংস্কার দেখিয়ে সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নাই। এদেশের কর্মসংস্থান সেক্টরের কমন চাহিদা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার সাথে সমন্বয় করেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নতুন সংস্কার অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। যে জাতি তার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে পারে না, সেই জাতি দুনিয়ার সবচে বড় মূর্খ জাতি বৈকি!

এছাড়া বেসরকারি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়াও বেকারত্ব সৃষ্টিতে কনট্রিবিউট করে। এরকম আরো কিছু কারণ আছে। তবে প্রধান সমস্যার সমাধান না করে অন্যান্য সমস্যার দিকে নজর দিলে কি কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসবে? আসবে না।

আরেকটা সমস্যা হলো,

বেকারত্ব সমস্যাকে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে জিইয়ে রাখার জন্য কথায় কথায় উদ্যোক্তা হওয়ার ফানুস ছড়ানো হয়। অথচ প্রত্যেক বেকারের পক্ষে কি উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব? কিংবা উদ্যোক্তা হতে চাইলেও সেটার জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স ও সুযোগ-সুবিধা কি প্রত্যেক বেকার পাচ্ছে বা পাবে? উত্তর হলো, না।

সুতরাং ভাবতে হবে সমষ্টিকে নিয়ে। ক্ষুদ্রসংখ্যক সফল উদ্যোক্তাদেরকে বেকারত্ব নিরসনের মানদণ্ড ভাবা চরমতম বোকামি। যা বেকারত্বের প্রধানতম কারণের ওপর থেকে ফোকাস কমিয়ে দেয়। বেকারদের মধ্যে অতি নগণ্য সংখ্যকের পক্ষে উদ্যোক্তা হয়ে সফল হওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঋণসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, ব্যবহারিক দক্ষতা ও রিসোর্সের অভাবে অধিকাংশের পক্ষে সফল হওয়া অসম্ভব।

যুগান্তরের রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ (২৮ মার্চ, ২০১৮)।

আর উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে বেকারত্ব ১০.৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (২১ আগস্ট, ২০১৯, বা.প্র.)।

এখন প্রশ্ন হলো, এত বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রত্যেকেই যদি উদ্যোক্তা হতে যায়, তাহলে কি এটি কোনো সুফল দেবে? সমাধান আসবে? নিশ্চয়ই না। আমি উদ্যোক্তা হওয়াকে অপ্রয়োজনীয় বলছি না। অবজ্ঞাও করছি না। বরং এটাই বলতে চাইছি যে, সমস্যার মূল গোড়ায় ফোকাস দিন। সমাধানের মূল জায়গায় হাত দিন। এর বাইরে অপরিকল্পিত মোটিভেশন-ব্যবসার জোয়ারে মূল জায়গার ফোকাসটা যেন হারিয়ে না যায়।

লেখক: মুনীরা রাহমান তাশফী
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন