Ads

সংকটের কবলে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ।। ২য় পর্ব

।। ড. মো. নূরুল আমিন ।।

শিক্ষার একটি সার্বজনীন সংজ্ঞা আছে। এই সংজ্ঞাটি বৃটিশ ম্যান পাওয়ার কমিশন কর্তৃক প্রণীত। এতে বলা হয়েছে, “Education is defined as activities which aim at developing the knowledge, skills moral values and understanding required in all aspects of life rather than a knowledge and skill relating to only a limited field of activities. The purpose of education is to provide the conditions essential to young people and adults to develop an understanding of the traditions and ideas influencing the society in which they live and to enable them to make a contribution to it. It involves study of their own religion and culture and of the laws of nature as well as the acquisition of linguistic and other skills which are basic to learning, personal development, creativity and communication.”

অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে জীবনের সর্বস্তরের সার্থক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ধীশক্তি অর্জনের লক্ষ্যে যে কর্মকা- পরিচালিত হয় তার সমষ্টির নাম; শুধু একটা নির্দিষ্ট কাজ বা কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকা- নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুবক ও বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া যাতে তারা যে সমাজে বসবাস করে সে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তারকারী ঐতিহ্য ও ধ্যান-ধারণাগুলোকে বুঝতে পারেন এবং সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার এই কার্যক্রমের মধ্যে তাদের নিজস্ব ধর্ম, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক আইন অধ্যয়ন প্রভৃতি যেমন অন্তর্ভুক্ত তেমনি শিক্ষার মৌলিক বিষয়াবলী যেমন ভাষার ব্যুৎপত্তি, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত ও পারস্পরিক পত্র যোগাযোগে দক্ষতা অর্জনও রয়েছে।

বৃটিশ ম্যানপাওয়ার সার্ভিসেস কমিশনের এই সংজ্ঞাকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে দুনিয়ার অধিকাংশ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি জাতি স্বাধীন জাতি হিসেবে তাদের কৃষ্টি-কালচার শেখার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা কি করছি? আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যদি তার নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ হন তাহলে এর দায় কে নেবে? জাতি, শিক্ষাব্যবস্থা, না বিশ্ববিদ্যালয়?

যখন শুনি তারা বা তাদের কেউ কেউ গুগল থেকে তরজমা করে পাঠ্যপুস্তক লেখেন লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন-

সংকটের কবলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ।। ১ম পর্ব

স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাস এবং উপাদান আধেয় নিয়ে সারা দেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। শিক্ষক-অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন যে এ সব পাঠ্যপুস্তকে বিশেষ করে ৫ম থেকে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত যে সব প্রবন্ধ নিবন্ধ, ছড়া কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা শুধু বিভ্রান্তিকরই নয় বরং সর্বশক্তিমান আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট মুসলমানদের আদর্শ ঐতিহ্য, ধর্ম বিশ্বাস এবং সংস্কৃতিরও পরিপন্থী। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এই দেশে মানুষ সৃষ্টির ইতিহাসকে ছেলে মেয়েদের স্মৃতিপট থেকে মুছে দিয়ে সেখানে বিবর্তনবাদকে আপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে এনে মানুষকে বানর, হনুমান ও সিম্পাঞ্জির বংশধর হিসাবে পরিচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে এবং বলা হচ্ছে যে কালের বিবর্তনে তারা আকৃতি পরিবর্তন করার প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে লেজ খসে-মানুষের বর্তমান অবয়ব গ্রহণ করেছে। দেশবাসীর প্রবল আপত্তির মুখে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি সম্প্রতি একটি সাফাইও গেয়েছেন। তিনি বলেছেন যে পাঠ্যপুস্তকে ডারউইনের থিওরীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কোথাও বানর/সিম্পাঞ্জিকে মানুষের পূর্ব পুরুষ বলে অভিহিত করা হয়নি। তার এই অবস্থানের পেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কোমলমতি এই শিশু কিশোরদের বইতে ডারউইনের মতবাদ অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তি কি? এটা কি তাদের মধ্যে নাস্তিক্যবাদ ঢোকানের লক্ষ্যে শ্লো পয়জন নয়? বইগুলোতে মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাফল্যকে বিকৃত ও খাটো করা হয়েছে। যে বর্ণভেদ প্রথা এবং সতিদাহ প্রথা, হিন্দু সমাজকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে সেই বর্ণভেদ প্রথা নাকি মুসলিম শাসকরা প্রচলন করেছিলেন এবং নারী নির্যাতনের জন্য তারাই দায়ী। তাদের কথানুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র-হিন্দুদের এই বর্ণ প্রথাও নাকি মুসলমানদের অবদান! এই পুস্তকগুলোতে পর্দা প্রথাকেও অপমান করা হয়েছে। এখানে ইসলাম বিদ্বেষ, ইতিহাস বিকৃতি এবং যৌন বিকৃতিকে ও উৎসাহিত করা হয়েছে। পারস্পরিক সম্মতিতে ছেলে মেয়েদের সংসর্গকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম মনীষীদের প্রবন্ধ নিবন্ধ ও শিক্ষামূলক গল্প-কবিতা বাদ দিয়ে হিন্দু পুরানের গল্প ও হিন্দু লেখকদের মুসলিম বিদ্বেষমূলক প্রবন্ধ, গল্প কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন কি রাসূল (দ:) এর বিদায় হজ্বের বক্তৃতাও বাদ দেয়া হয়েছে।

এই দেশে হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দু এবং মুসলমানরা পাশাপাশি বসবাস করে এসেছে। তাদের আচার আচরণ, খাদ্য প্রণালী ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা গোসল করেছি তারা স্নান করেছে। আমরা বদনা ব্যবহার করেছি তারা লোটা, পিতার বোনকে আমরা ফুফু, মায়ের বোনকে খালা, ভাইয়ের বউকে ভাবী, মায়ের মাকে নানী, পিতার মাকে দাদী ডাকছি, বোনের স্বামীকে আমরা ভাইসাব বা দুলাভাই বলি। এখন এই বই পত্রের অনুশীলনে আমাদের ছেলে-মেয়েদের কালচার পরিবর্তন করে মাসি, পিসি, ঠাকুর দা, ঠাকুর দি, দিধা, ঠাকুর মা, জামাই বাবু প্রভৃতি শিখানো হচ্ছে। মুসলিম সমাজ এগুলো গ্রহণ করতে পারছে না।

আরও পড়ুন-

আমার কাছে চার্লস ডারউইন ।। এবনে গোলাম সামাদ

আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেক শীর্ষনেতা বলে থাকেন যে ১৯৭১ সালে অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টি করার জন্যই তারা স্বাধীনতা এনেছিলেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অর্থ কি ধর্মহীন বাংলাদেশ? অনেকে ধর্মকে সম্প্রদায় বলে। যেমন মুসলিম সম্প্রদায়, হিন্দু সম্প্রদায়, খৃষ্টান সম্প্রদায়। বিভিন্ন ধর্মানুসারীদের মধ্যে যখন সংঘাত বাধে তখন তাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে। তাহলে বাংলাদেশকে ধর্মহীন করার জন্যই কি শিক্ষা ক্ষেত্রে এই কসরৎ চলছে? এই সিলেবাস ও তার কনটেন্ট যারা তৈরি করেছেন তাদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা নগণ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সিনিয়র অফিসারদের প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কিছু দিন আগে টাঙ্গাইলের একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে একজন হিন্দু শিক্ষককে সরকার নিয়োগ দিয়েছিলেন। দেশে এখন অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল আছে যেখানে হিন্দু শিক্ষক শিক্ষিকারা ইসলাম ধর্ম পড়ান। এর উদ্দেশ্য কি পরিষ্কার নয়?

একটি মুসলিম দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, টেক্সটবুক বোর্ড, এমন কি মাদরাসা বোর্ডেও অমুসলিম কর্মকর্তার মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ইসলামকে নির্মূল করার ইঙ্গিতবহ নয় তো? শিক্ষা মন্ত্রালয়ের এক তথ্যানুযায়ী আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক শিক্ষিকাদের শতকরা ৬৫ ভাগেরও বেশি অমুসলিম, মুসলমানদের মধ্যে আমাদের দেশে কি শিক্ষক হবার উপযোগী বেকার যুবক যুবতি নেই? প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বত্রই এখন এই প্রবণতা লক্ষণীয়? এর সাথে প্রতিবেশী হিন্দু ভারতের অবস্থা তুলনা করার জন্য সাচার কমিটির রির্পোট আমাদের হয়ত কিছু সজাগ করতে পারে।

আগেই বলেছি অধুনা আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের সাথে দেশব্যাপী ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের বিশাল কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছি। এ ব্যাপারে ফেরআউনের আমলের একটি গল্প আমার মনে পড়লো। পাঠকরা এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু আছে বিবেচনা করে দেখতে পারেন, গল্পটি হচ্ছে:

“হামান নামে এক ব্যক্তি মিশরের জালেম শাসক ফেরআউনের বন্ধু ছিল। একদিন হামান ফেরআউনকে পরামর্শ দিল যে তুমি নিজকে খোদা দাবি কর। ফেরআউনের উত্তর ছিল, বন্ধু এদেশের মানুষ এটা কখনো মানবে না। হামান বললো আমাকে সময় দাও, আমি তোমাকে খোদা বানিয়ে ছাড়বো, প্রথমে ১০ বছরে আস্তে আস্তে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আসমানী কিতাবের শিক্ষা তুলে নিতে হবে। তারপর ১০ বছরে যারা এই আসমানী কিতাবের শিক্ষা দেয় তাদের উপর এমন কিছু মিথ্যা জঘন্য দোষ চাপিয়ে দিয়ে মেরে ফেলতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম আসমানি কিতাবের শিক্ষকদের নাম শুনলেই ঘৃণা করে। বাংলাদেশের অবস্থার সাথে এই গল্পটি কিছুটা মিলে কি?

আরও পড়ুন-

ইতিহাসের অজ্ঞতা গোলামী ডেকে আনতে পারে ।। ২য় পর্ব

এ প্রসংগে আরেকটি ঘটনা অনেকে পছন্দ করতে পারেন তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান খেলনা কবুতর হাতে নিয়ে জনসভায় সমাগত জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন,

আপনারা আমার হাতের এই সাদা কবুতরটি দেখতে পাচ্ছেন? জনতা সমস্বরে জবাব দিল জি দেখতে পাচ্ছি। এই কবুতরের কি হাত পা চোখ আছে? এই কবুতরের কি ডানা আছে, তারা বললেন আছে। এই কবুতর কি উড়তে পারবে? তারা বললেন না। তিনি বললেন কেন? সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, বলল, এর তো প্রাণ নেই, উড়বে কিভাবে? প্রফেসার আরবাকান বললেন পশ্চিমারা এরকম ইসলাম পালনকারী মুসলিম চায়, তারা চায় খেলনা কবুতরের মতো আপনারা নামায পড়বেন, কুরআন তিলাওয়াত করবেন, বিশাল ওয়াজ মাহফিল করবেন কিন্তু প্রাণহীন কবুতরের মত, ভেতরে কুরআনের শিক্ষা থাকবে না, দ্বীনের পথে লড়াই এর প্রেরণা থাকবে না। তিনি বললেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা ঈমানের প্রাণ। এই প্রাণ না থাকলে মানবতার মুক্তির জন্য কোন কাজ করাই সম্ভব নয়, এই প্রাণ নাই বলেই আজকে আমাদের ঈমান আকিদা বিশ্বাস ও শিক্ষা ব্যবস্থার উপর এই হামলা আসছে।

পাঠ্যপুস্তকে মানুষের অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে ডারউইনের বিবর্তনবাদকে নিয়ে যেহেতু বেশি বাড়াবাড়ি করা হয়েছে সেহেতু তাকে নিয়েই আমি প্রথম আলোচনা করতে চাই, তার সময়কাল ছিল ১৮০৯ থেকে ১৮৮২ সাল।

পরের পর্ব-

সংকটের কবলে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ।। ৩য় ও শেষ পর্ব

চলবে…

লেখকঃ প্রাবন্ধিক , গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব  এবং সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম

…………………………………………………………………………………………………………………………

মহীয়সীর প্রিয় পাঠক ! সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে লেখা আর্টিকেল ,আত্মউন্নয়নমূলক অসাধারণ লেখা, গল্প  ও কবিতা  পড়তে মহীয়সীর ফেসবুক পেজ মহীয়সী / Mohioshi  তে লাইক দিয়ে মহীয়সীর সাথে সংযুক্ত থাকুন। আর হা মহীয়সীর সম্মানিত প্রিয় লেখক! আপনি আপনার পছন্দের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইলে-  [email protected]  ও  [email protected] ; মনে রাখবেন,”জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম ।” মহীয়সীর লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধনের জন্য রয়েছে  আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মহীয়সী লেখক ও পাঠক ফোরাম ; আজই আপনিও যুক্ত হয়ে যান এই গ্রুপে ।  আসুন  ইসলামী মূূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সুস্থ,সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি । আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলো ।” (সূরা বাকারা-১৪৮) । আসুন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে সচেষ্ট হই । আল্লাহ আমাদের সমস্ত নেক আমল কবুল করুন, আমিন ।

ফেসবুকে লেখক ড. মো. নূরুল আমিন

আরও পড়ুন