নতুন সূর্য

 

ইমনের আজ বিশেষ দিন। অনার্স প্রথম বর্ষের প্রথম দিন। ইমনের বাসা কুড়িগ্রামের উলিপুর।বাবা উলিপুরের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্যায়ী।
গত পরশু রাজশাহী এসেছে। কাজলা আবাসিক এক ছাত্রাবাসে সিট নিয়েছে ইমন। ক্লাশ শুরুর দিন বিশেষ আকর্ষন থাকে ভার্সিটি লেভেলের স্টুডেন্টদের।
সাড়ে আট বাজে ৯ টায় ক্লাস।১৫ মি আগেই মমতাজ উদ্দীন কলা ভবনে উপস্থিত ইমন।ক্লাস নিলেন রেজাউল স্যার- বেশ প্রানবন্ত লেগেছে আজকের ক্লাস।

স্যারের বিশেষ পরামর্শ ছিল- পড়াশোনায় যেন একে অপরের পরিপূরক হই সবাই।
ঐ দিন ৯৫% ছাত্র -ছাত্রী উপস্থিত ছিল।
ইমনের পরিচয় হয় – রুমা, শওকত আর শিশির নামের বন্ধুদের সাথে।
লেকচার সিট,প্রয়োজনী ইনফরমেশন নিতে সর্বদা শিশির আর ইমনের যোগাযোগ হতো।
শিশির নাটোরের লালপুর থেকে এসেছে।
মহীয়সী রোকেয়া হলে তার প্রতিবেশি বন্যার সাথে থাকে।
বন্যা ইংরেজিতে ৩য় বর্ষে পড়ে। পুরো নাম বন্যা বডুয়া।
বন্যা হিন্দু ধর্মের হলেও শিশিরের সাথে মিশে থাকে একদম।
বলতে বলতে দূর্গা পূজা সামনে এলো।
বন্যা এ ছুটিতে লালপুর যাবে।
ইমন আর শিশিরের কথা হচ্ছিল –
শিশির বলছে, কাল তো বন্যার সাথে গ্রামে যাব।
– কেন? সামনে তো ইনকোর্স পরীক্ষা।
যাই মা অসুস্থ এ ছুটিতে দেখা করে আসি।
দূর্গা পূজা শেষ হলেই আমি বন্যা একসাথে চলে আসব।
– আচ্ছা যাও সাবধানে যেও।
বিভিন্ন সময়ে শিশিরের খুব প্রিয় হয়ে উঠে ইমন।টাকা ধার, নোট ফটোকপি, ছোটখাট বাজার ঘাট সবকিছুতেই নিবিড় বন্ধুত্ব শুরু হয় ওদের মাঝে।

সাবাস বাংলাদেশ মুক্তাঙ্গনে পড়ন্ত বিকেল, ইমন আর শিশির প্রকৃতির আভা নিচ্ছে । চারু কলা বা ইবলিস চত্বরে যাই না ইমন। পড়াশোনা বিষয়ে ভীষন কৌতুহলী শিশির – ইমন। মুক্তি যুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার স্বাদ বিষয়ে অনেক আলোচনা হলো দুজনের। ইমন মাঝে মাঝেই বাংলাদেশের সর্বচেয়ে বড় নদী পদ্মার পাড়ে ছুটে আসে। ভার্সিটি থেকে মাত্র ১ কি. দূরেই পদ্মা পাড়। প্রকৃতি আর ইতিহাসের কাছেই মানুষকে বারবার ছুটে যেতে হয়।ইমন সাবাস বাংলাদেশের ভাস্কর্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শিশিরকে মনের ইচ্ছের কথাগুলো সুন্দর ভাবে বলল।
শিশির বলল, গত পূজার নবমীতে বন্যা আপুর সাথে মন্দিরে গিয়েছিলাম।পুরোহিত দেশের শান্তি আর সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করলেন।
ইমন বলল, পৃথিবীর সকল ধর্ম মানবতার কথা বলে।
– চলো আজ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।
ইমন শিশির বিদায় হলো।
সামনে ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভালবাসা দিবস ঘিরে রাবি তে উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সবাই গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ব্যাস্ত।
শিশির বিকেল ৪ টায় ইমনকে জুবেইরী ভবনের সামনে আসতে বলে ফোনে।ইমন সময় সচেতন আর পরিচ্ছন্ন ছেলে। যে দেশে ৪ টার মন্ত্রী সভা আহবান করে ৫ টায় শুরু হয়, যে দেশে ২ টায় মিটিং সমাবেশে কল করে ৪ টায় শুরু হয়, সেই দেশে সময়ের আর কি গুরুত্ব। এ দেশ তো মাহথির মাহমুদের মত নয়!
মাহথির মালোয়েশিয়ার মাটিতে বলেছিল- আমার ১৪ বছর প্রেসিডেন্ট জীবনে ১ মিনিট লেট করে মন্ত্রানালয়ে যাই নি।
ইমন বলল, শিশির বল কোথায় যাবে?
– আজ চলো সূর্যাস্ত দেখি।
ইমন বলল, তুমিও আমার মত প্রকৃতি প্রেমী হয়ে গেলে।
– তা আর পারছি কই।
রিক্সা নিয়ে পদ্মার পাড়ে পৌঁছে গেল দুজন।
হালকা রোদ এসে উপচে উপচে পড়ছে শিশিরের গালে।কৃষ্ণচূড়ার চিরল পাতা তাদের মনে ঝিরিঝিরি বাতাস দিচ্ছে।
গৌধুলীর রঙ যেন আজ ভিন্ন। প্রকৃতি কানে কানে তাদের ভালবাসার বর্তা দিচ্ছে। ইমন বলল, কিছু বলছনা যে শিশির? ঐ দেখ সূর্য পাটে নামল বলে।

কাল পহেলা বৈশাখ। সাহিত্য প্রেমীদের কাছ এ দিন খুব বর্নাঢ্য। ইমন শিশির বিকেলে বিকল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের আয়োজনে ” অনাবাদী মাঠে জাগাও সবুজ দেখবে। সন্ধ্যার সূর্যাস্তের পর তারা আর ডি এ ( মাকের্টে) এসেছে। সাদা আর লাল নতুন সাজের পাঞ্জাবি ইমনকে গিফট করল শিশির। ইমন শিশিরকে একটি চিকন কারুকাজে অঙ্কিত হলুদ শাড়ী উপহার দিল।
বেশ হাসি-খুশি দুজন। অনার্স প্রথম বর্ষে শিশিরের চেয়ে ইমন ১১ মাকর্স বেশি পেয়েছে। আবার দ্বিতীয় বর্ষে শিশির ইমনের চেয়ে ১০ মাকর্স বেশি পেয়েছে। রিক্সায় শিশির ইমন গা ঘেঁষে বসেছে। চাঁদের আলোয় শিশিরকে অপূর্ব সুন্দর লাগছিল।
ইমন মনে করেছিল তার ধ্যানের লক্ষ্ণী বাহুডোরে স্থান পেয়েছে।
ইমন শিশিরকে হলে নামিয়ে দিয়ে ম্যাচে প্রবেশ করল।
সারা ক্যাম্পাস জুড়ে বৈশাখী উৎসবে আন্দোলিত। বিকেলের আগে কোথায় বের হয়নি ইমন-শিশির।
চারিদিকে হৈ হৈ রবে উৎসব আমেজ বিরাজ করছে রাবিতে। শহীদ স্মৃতি সংগ্রহ শালাতে বিকল্পের প্রোগ্রাম যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সবার।
আব্দুল্লাহ হিল কাফীর রম্য অভিনয় যে কোন ঊষর হৃদয় হাসির বৃষ্টিতে মুখরিত হবে।
অনুষ্ঠান চলছিল- হঠাৎ শিশিরের ফোনে বাসা থেকে কল এলো! মহুর্তের মধ্যে শিশিরের উজ্জ্বল তনু বৈশাখী কালবৈশাখী রূপ নিল।
মা মৃত্যু দুয়ারে… দু তিনটি কথা বলেই ইমনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত লালপুর অভিমুখে রওনা দিল শিশির। রাত সাড়ে নয় টায় বাসাই ঢুকতেই কয়েক জনের ভারাক্রান্ত কণ্ঠে ইন্নালিল্লাহি……. রাজিউন শুনতেই কান্নার ভেঙে পড়ল শিশির।

মায়ের মৃত্যুর পর মোবাইলে চার্জ শূন্য শিশিরের। মনের মধ্যে চিন চিন করে উঠছে বারবার। মায়ের দাফনের ৫ ঘন্টা পর ইমনের ফোন এলো শিশিরের মোবাইলে।
ইমন, অনেক বার চেষ্টা করেছি মায়ের শেষ অবস্থা জানার জন্য।
– উনি আমি বাসায় পৌছার আগেই মৃত্যু বরন করেছেন।
এখন কি অবস্থা শিশির?
-অনেক আত্নীয় এসেছিল। সৃষ্টিকর্তার নিকট যে যেমন প্রার্থনা করে বিদায় হয়েছে। ২/৪ জন আছে।
আচ্ছা বিধাতা তাকে ক্ষমা করুন। এভাবেই ইমন শিশিরের কথা শেষ হলো।
সোমবারের রাত কেন জানি খুব গম্ভীর। অন্ধকারে ছেয়ে গেছে পৃথিবীর জনপদ।শন শনে রাতে বন বিড়ালের দল পাইচারী করছে।শিশির ইমনের ঘুম আসছেনা।কাল অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। শিশির রোকেয়া হলে আর অপর দিকে ইমন কাজলা পদ্মা ছাত্রাবাসে।
বাসা থেকে আসার সময় ও আগে ফোনে কথা হয়েছিল তাদের। পরীক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে দুজনের বেশ সলাপরামর্শ হচ্ছিল তাদের।
সম্পর্ক যাই হোক, শিশির ইমনের সার্বিক চালচলন খুবই মিষ্টি মধুর। একে অপরের সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছে ইমন – শিশির।

পরীক্ষার শেষ দিন,শিশির আজ বিশেষ ভাবে একটি ইনভাইট করবে ইমনকে।মনের ভিতরে ফিলিংস নিয়ে পরীক্ষার শেষে শিশির বলল, আগামী পরশু মায়ের মিলাদ ( দোয়া অনুষ্ঠান )
ইমন প্রস্তুত থেক কাল বিকেলে আমার সাথে লালপুর যেতে হবে।
বাবা আর ভাইয়ার সাথে তোমাকে প্রেজেন্ট করতে চাই।
কথা গুলো শেষ হতে না হতেই ইমনের মাথায় বাজ পড়ল।
এ কি শুনলো আজ, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা শিশির মুসলিম পরিবারের মেয়ে।
সাময়িক ইমন ফ্রিজ হয়ে গেল। মানে…..! আমি…….!
কি ইমন এমন করছ কেন? কি হয়েছে তোমার?
– মানে বলছি বাবার শরীর খারাপ।
বাবাকে কথা দিয়েছি কাল বাসায় যাব, আর পরশু তো স্বরস্বতী পূজা।

শিশিরের অশ্রু শিশিরের মতই ঝরছে।
একি শুনল আজ, ইমন ইমন চক্রবর্তী স্বপ্নেও ভাবেনি সে।
এত কথা হয়েছে বংশ পরিচয় জানেনি শিশির।
তা
ইমনের মাঝে অদর্শ আর আন্তরিকতার বিস্তার দেখেছে সবাই।
মনের মাঝে বিশাল ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে শিশিরের। পরশু মায়ের মিলাদ আর ইমন স্বরস্বতী পূজা পালন করবে এ যেন বাঁশের শুকনো পাতায় আগুনের মত।
বার বার আফসেট হয়ে যাচ্ছে শিশির।
ইমনের দাপাদাপি বিরল।তুসের আগুনের মত জ্বলছে সে।
ইমনের বার বার মনে হচ্ছিল, বন্যার সাথে পূজার ছুটি কাটানো,পুরোহিতের আশির্বাদ, আর প্রার্থনা শব্দ গুল কত সতন্ত্রভাবে তার মনে দাগ কেটেছে।
এটি কিভাবে সম্ভব, বাবা মা,সমাজ সভ্যতায় কি জবাব দেবে ইমন।
শত শত প্রশ্ন আজ বিদগ্ধ করে চলেছে ইমনকে।
কোন কথা কারো সাথে হয়নি।
সকালে তিতুমির এক্সপ্রেস এ ইমন কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
আল- হামরা বাস যোগে লালপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো শিশিরের।
রাত ঘনিয়ে এসেছে, হয়তো দুজনের অদৃশ্য যন্ত্রনা পীড়িত করে চলেছে।
শিশির বাবা ভাইকে কিছু বলার সাহস হয়নি।
ইমন চক্রবর্তী বড় গম্ভীর, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-সাঝে শিশিরের ভাবনায় আপ্লুত।
আজ ভোরটা খুব নিশ্বঃপ্রান। ভোরের শিশির কোথায় যেন আত্নগোপনে।
প্রকৃতি আজ বিষাদ লাগছে।পাখিরা গান করছেনা। ফুল গুলো কেমন গন্ধ বিহীন লাগছে ইমনের কাছে।
কিছুক্ষন পর সূর্য উঠবে।নতুন সূর্য, এ সূর্য কিরণে ঝলমলিয়ে উঠবে ভুবন।
নতুন সূর্য উঠি উঠি করছে, তুলী রানী ইমনের মা ইমনকে ডেকে তুলে একটা ব্যাগ হাতে ধরে বলছে বাবা তাড়াতাড়ি ৩ কেজি ছাগলের মাংস আন। আজ বাসায় তোর মামা আসবে।
তোর বাবা দোকানে আছে দেখা করে আসিস। ও হ্যা,মাংস যেন লাল বর্নের হয়।
নতুন সূর্য যখন উঠল, ইমন সাদা রঙের ট্রি- শার্ট পড়ে সাদা এপাসি মোটর বাইক নিয়ে উলিপুর বাজারে ছুটল ১ কি. রাস্তার ব্যবধান।
কিছু দূর যেতেই রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা বালু ভর্তি ট্রাক চাপা দিল ইমনকে।
সাদা শার্ট, সাদা বাইক, সাদা বর্নের চেহারা রক্তে রঞ্জিত হলো ইমনের।
দ্রুত উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে এলে ডাক্তার ইমনকে মৃত ঘোষণা করল।
সত্যিই নতুন সূর্য আজ কত রক্তাক্ত।।

 

আব্দুল মতিন – কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন