মুক্তি

 

আশালতা দেবী অনেকদিন থেকে এই সংসার থেকে মুক্তি চেয়ে আসছিলেন৷ বিশেষ করে যেদিন থেকে তাঁর স্বামী চাকরী থেকে অবসরে গেছেন তার কিছুদিন পর থেকেই। অথচ এরআগে তাঁর কখনো মনে হয়নি এমন একটি দিন ওৎ পেতে আছে তাঁদের জন্য! কি সুন্দর সংসার ছিল। আশেপাশে যারা ছিল সবাই এই পরিবারটিকে উদাহরণ হিসাবে টানতেন। তিন তিনটে ছেলে৷ লেখাপড়ায় সবাই ভালো৷ ভালো চাকরী করছে। ছোটোটি বিদেশে৷ কি মা ন্যাওটা ছিলো। আশালতা দেবীর স্বামী একটি বেসরকারী কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর নিজগুণে তিনি সবার কাছে খুব সন্মানিত ছিলেন৷ সন্তানদের চেষ্টা করেছেন ভালো মানুষ তৈরি করতে৷ মানুষ বলতে যদি বিদ্যার্জনকে বোঝায় তাহলে সুকুমার বাবু তাঁর সন্তানদের ঠিকমতই মানুষ করেছেন৷ তবে ইদানীং মনে হয় তাদের মনে সুকুমার বৃত্তি গুলি ঠিকমতো চাষ করতে পারেন নি। তা নাহলে একই বাড়িতে থেকে ভাইয়ে ভাইয়ে মুখ দেখাদেখি বন্ধ! প্রতিদিন একবার এসে জানতে চায় না বাবা মা কেমন আছেন? তাঁদের কিছু প্রয়োজন আছে কি না? আজ কয়দিন ধরে আশালতার কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে। ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। অথচ এই অবস্থায় রিক্সায় ওঠা খুব কষ্টের৷ বাড়িতে দুখানা গাড়ি আছে। ও দুটো বড় আর মেজো ছেলে নিজেরাই কিনেছে৷ দুই একবার সুকুমার বাবু খেতে বসে আকারে ইংগিতে বলেছেনও৷ কিন্তু কেউ যেন শুনলোও না। আত্মসম্মানবোধে টনটনে এই প্রৌঢ় দম্পতির পক্ষে এরবেশি বলা সম্ভব নয়৷

তাই একদিন সন্ধ্যাবেলায় স্ত্রী আশালতাকে রিক্সায় নিয়ে রওনা দিলেন অর্থোসার্জন ডাঃ এস কে সাদেকের চেম্বারে৷ সাদেক সুকুমার বাবুর ছাত্র। অনেকদিন পর প্রিয় শিক্ষক কে দেখে সাদেক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে দুজনকেই প্রণাম করলো। সুকুমার বাবু তো

> ” করো কি করো কি ” বলে হাঁ হাঁ করে উঠলেন। আশালতা প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন। আর মনের অন্য পিঠে ভেসে উঠলো কতদিন মনীশ, অতীশ প্রণাম করে না! সাদেক মাথা চুলকে বললো

> ‘ স্যার লেখাপড়া যেটুকু শিখেছি সেতো আপনার বদান্যতায়। কলেজে ফরম ফিল আপ করার টাকা ছিল না। সেদিন যদি আপনি এগিয়ে না আসতেন তাহলে কি আজ এখানে বসার সুযোগ পেতাম? আমার পড়াশোনা যে ওখানেই শেষ হয়ে যেত। ‘

সুকুমার বাবু ম্লান হেসে বলেন > এভাবে ভাবছো কেন বাবা? সৃষ্টিকর্তাই একটা ব্যবস্থা করে দিতেন।’

সাদেক মৃদুস্বরে বললো, > ‘ করেন নি তো। ‘ মনে পড়ে গেল তার অবস্থাপন্ন আত্মীয়স্বজনের কথা৷

সাদেক আর কথা বাড়াতে না দিয়ে বলে উঠলো

>বলুন মাসীমা কেমন আছেন? ব্যথা সারে নি? তখন বলেছিলাম অপারেশন করিয়ে নিতে। ‘
ফস করে আশালতা দেবীর মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল
‘ অপারেশন? সে যে অনেক টাকার ব্যাপার! তোমার স্যার রিটায়ার করেছেন। এখন কি আর তা সম্ভব? ‘

> কেন সম্ভব নয়? আমি অতীশদের সঙ্গে কথা বলে নেবো৷ হাসপাতালে দিন সাতেক থাকলেই চলবে। আর মাস খানেক বাড়িতে রেস্ট নেবেন। ‘

আশালতা চকিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, না, না, বাবা। তুমি ওদের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলো না। আমার অপারেশনে বড্ড ভয়। আর তাছাড়া বউমারা চাকরী বাকরি করে। নাতি নাতনীদের স্কুলে পাঠানো , টিফিন বানিয়ে দেয়া, ছেলেদের খাবার তৈরি করে রাখা….
রেস্ট নিলে চলবে? তুমি আমায় ওষুধ দিয়ে দাও৷ সেবার যে দিলে অনেকদিন ভালো ছিলাম তো৷ ‘

> কিন্তু মাসীমা এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছেন, ওষুধে কাজ হবে না। আপনার স্পাইন সার্জারি লাগবে৷ সাথে ফিজিওথেরাপি। এরপরে সুস্থ হওয়ার প্রশ্ন আসবে৷ আর রান্নার কথা কি যেন বললেন? আপনার বৌরা রান্না করবে, ওনাদেরই তো রান্না করা উচিৎ। আপনি তো এতদিন করেছেন।

> কি যে বলো না বাবা। আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। সারাটি জীবন তো ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই কাটিয়ে দিলাম। রান্না আর ছেলেদের লেখাপড়ার দিকে একটু লক্ষ্য রাখা, এছাড়া আর কিই বা করার ছিল। আর ওদের কত কাজ! অফিস করে এসে রান্নাঘরে এই গরমে আবার আগুনের সামনে যাওয়া…… কষ্ট হবে না, বলো?

> কে জানে! কেমন এক গলায় বলে উঠলো সাদেক। মনে পড়ে গেল ওর মায়ের কথা। খান সাহেবের বাড়িতে রান্না করে এসেও সাদেকের জন্য দুটো ভাত ফুটিয়ে দিতেন৷ কখনো আলু সেদ্ধ। কখনো একটু ডাল। কালে ভদ্রে একটু মাছ কি মাংস৷ আর এখন নাসিমা কেমন পরিপাটি করে ওর খাবার বানিয়ে রাখে। নাসিমা নিজেও চিকিৎসক। কিন্তু সংসার সামলে, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা দেখে আবার সাদেকের কোন তরকারিটা বেশি পছন্দ, তাও করে রাখে। মানুষে মানুষে এত পার্থক্যও হয়? তাও এমন দুজন দেবতুল্য মানুষের সাথে? সাদেক একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। ফিরে এলো ওর প্রিয় স্যারের গলা খাঁকারিতে।

> জ্বী স্যার, বলুন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো স্যারের দিকে।

> বাবা, তুমি অপারেশনের তারিখ ঠিক করো। মাসখানেক অপেক্ষা করা যাবে? বেশ দৃঢ় কন্ঠে জানতে চাইলেন সুকুমার বাবু। সাদেক মাথা নাড়লো।

আশালতা দেবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন স্বামীর দিকে৷ বলছে কি মানুষটা? একমাসে কোন আলাউদ্দিনের চেরাগ পাবেন উনি? আশালতা কিছু বলতে যেতেই সুকুমার বাবু হাত তুলে থামালেন। বললেন ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ কোনোদিন ভাবতে হয়নি৷ আজো ভাবতে হবে না৷ যা করার আমিই করবো।

> স্যার, যদি কিছু মনে না করেন, মাসীমার চিকিৎসার একটা সামান্য অংশ….৷ মাঝপথে থামিয়ে দিলেন সুকুমার বাবু।

> না বাবা, সামান্য অংশ বলে বলে তুমি এই পর্যন্ত যা করেছ, এই ঋণ আমি কখনো শুধতে পারবো না৷

> ছেলের কাছে বাবার ঋণ হয় স্যার? আপনি না শিখিয়েছেন পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম…..

> ওটা আগে একসময় ছিল। এখন চোখের সামনেই তো দেখছো অতীশ, মনীশ কে। আশীষ তো স্টেটসে যেয়ে ইচ্ছে হলো ফোন করলো, ইচ্ছে হলো না, করলো না৷ শুনি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়…… ।
তুমি বরং তোমার মাসীমার কি কি টেস্ট লাগবে সেগুলো লিখে দাও। আমি দিন কয়েকের মধ্যে তোমাকে জানাচ্ছি।

> ওটা স্যার, আপনি ভাববেন না৷ আমি সময়মতো করিয়ে নেবো। আপনি কখন নাগাদ আসবেন সেটি আমাকে একটু জানিয়ে দেবেন৷

সাদেক তাঁদের এগিয়ে দিতে এসে গাড়ি দেখতে না পেয়ে অবাক হলো। কিন্তু আত্মাভিমানী স্যারকে নিজের গাড়ি অফার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল না। চেম্বারে ফিরে এসে কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে রইলো৷ অতীশরা তো এমন ছিল না। তবে হ্যাঁ, একবার

 

অঞ্জনা দত্ত – উপন্যাসিক ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন