কোভিড ১৯ ও কিছু কথা

ফারহানা শরমীন জেনীঃ

বর্তমান বিশ্ব কঠিন এক ক্রান্তিলগ্নে অবস্থান করছে। বাতাসের বিশুদ্ধতা আছে ঠিকই কিন্তু মুক্ত বাতাসে সবুজ ঘাসে হাঁটার মতো সাহস আমাদের নেই। অবরুদ্ধতার মাঝেই যেন মিলেছে মুক্তির শ্বাস। কথায় আছে বনের বাঘে খায় না কিন্তু মনের বাঘে খায় সেই হয়েছে আমাদের অবস্থা।

“গৃহবন্দী বা আপনাকে নজরদারীর মাঝে রাখা হয়েছে। বিনা অনুমতিতে কোথাও যাবেন না”। এই কথাগুলো আইনের শাসনের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে আছে। একসময় ভাবতাম এটা আবার কি ধরনের শাস্তি? নিজের বাসায় পরিবার পরিজনের সাথে থাকছে খাচ্ছে এর আবার কিসের শাস্তি? বর্তমান পরিস্থিতি আমাকে চোখে আঙুল শুধু নয় রীতিমতো শাস্তি নির্ধারণ করে বুঝিয়ে দিল গৃহবন্দীর অর্থ ও মর্মপীড়া। পৃথিবীর মালিক একনোটিশে গোটা বিশ্বকে করে ফেলেছেন গৃহবন্দী, রিজিকের মালিক একনোটিশে ক্ষমতাধর সকল মানুষের ক্ষমতাকে আটকে দিয়েছেন। অনেকেই ভাবছে এটা গযব। কিন্তু না, এটা গযব নয়, এটা একটা নিদর্শন। পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্যের অধিকারী মহান স্রষ্টা তার কারিশমার কেবল একটু নিদর্শন আমাদের পাঠিয়েছেন চক্ষুষ্মান হওয়ার জন্য। গযব যদি হতো তবে ইতিপূর্বে যেমম এক একটা জনপদ নিশ্চিহ্ন করেছেন, পেরেক পুতে দিয়েছেন সেই  সভ্যতার শেষ কফিনে তারপর তাদের ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে ভবিষ্যৎ সভ্যতার সামনে উপস্থাপন করেছেন নজীর হিসেবে। সুতরাং আমাদের ওপর সৃষ্টিকর্তা গযব দেননি বলে আমার বিশ্বাস। শুধু একটু সতর্কতা মূলক নিদর্শন।

এই অবস্থায় আমরা গৃহবন্দী হয়ে হয়ে পড়েছি অচল এবং স্থবির। যারফলে মনে হরেক রকম ভাবনা এসে ভীড় করছে, কেউ কেউ করোনা নিয়ে চলে যাচ্ছে ডিল্যুশনের জগতে। এই ডিল্যুশন আবার ছড়িয়ে দিচ্ছে হাতের মুঠোয় বহন করা সহজলভ্য সোশাল মিডিয়ায়। যার ফলশ্রুতিতে একশ্রেণির দূর্বল চিত্তের  মানুষ দুঃশ্চিতায় প্রেসার ডায়াবেটিস বাড়িয়ে ফেলছে। যা আরও ক্ষতিকর হচ্ছে। আমরা মানুষকে আশার বাণী শোনাতে পারি না কিন্তু হতাশার বাণী শোনাতে বড়োই দক্ষ। ঠিক সেই ঠাকুরমার ঝুলির গল্পে যেমন পড়েছি যে রানী কালো একটা মেয়ে জন্ম দিয়েছেন সেটা অপভ্রংশ হতে হতে হয়ে গেল রাণীর একটা কাক হয়েছে। আমরা হচ্ছি এধরণের পাবলিক। কুরআন নাযিলের সময় আল্লাহ এসব অদৃশ্য শত্রু সম্পর্কে আমাদের তথ্য দিয়েছেন। দেড় হাজার বছর আগেই এধরণের অদৃশ্য শক্তির ব্যাপারে জানিয়েছে আল কুরআন!

বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এ আয়াতগুলো দেড় হাজার বছর আগের। এখন গুজব বানানো অস্থির বয়ান না দিয়ে বরং এই আয়াতগুলো চর্চায় এবং কুরআনের গবেষণায় ব্যস্ত থাকলে মন অনেকটা শান্ত হবে। শান্ত মনে শত্রুর আক্রমণ কম হয়।

-সূরা আহযাব-৯-
আর তারপর আমি তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম এক ঝঞ্ঝা বায়ু এবং এক বাহিনী । এমন এক বাহিনী যা তোমরা চোখে দেখতে পাওনি।

-সূরা ইয়াসীন-২৮-২৯
-২৮-২৯/ তারপর (তাদের এই অবিচারমূলক জুলুমকার্য করার পর ) তাদের বিরুদ্ধে আমি আকাশ থেকে কোনো সেনাদল পাঠাইনি। পাঠানোর কোনো প্রয়োজন‌ও আমার ছিল না। শুধু একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, আর সহসা তারা সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। (মৃত লাশ হয়ে গেল)
.
-সূরা আ’রাফ-১৩৩
-১৩৩/ শেষ পর্যন্ত আমি এই জাতিকে পোকামাকড় বা পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত, প্লাবন ইত্যাদি দ্বারা শাস্তি দিয়ে ক্লিষ্ট করি।
.
-সূরা বাকারা-২৬
-২৬/ নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা কিংবা এর চাইতেও তুচ্ছ বিষয় (ভাইরাস বা জীবাণু) দিয়ে উদাহরণ বা তাঁর নিদর্শন প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না।
.
-সূরা আ’রাফ-৯৪
-৯৪/ ওর অধিবাসীদেরকে আমি দুঃখ, দারিদ্র্য, রোগ-ব্যাধি এবং অভাব-অনটন দ্বারা আক্রান্ত করে থাকি । উদ্দেশ্য হলো তারা যেন, নম্র এবং বিনয়ী হয়।
.
-সূরা মুদ্দাসসির-৩১
-৩১/ তোমার ’রবের’ সেনাদল বা সেনাবাহিনী (কত প্রকৃতির বা কত রূপের কিংবা কত ধরনের) তা শুধু তিনিই জানেন।
.
-সূরা ত্বা’হা-১৪
-১৪/ নিশ্চয়ই আমিই হলাম ’আল্লাহ’। অতএব আমার আইনের অধীনে থাকো।
.
(তথ্যসূত্র : ভোরের ডেক্স অনলাইন সংস্করণ।)
যেকোনো ভাইরাস থেকে বাচার অন্যতম উপায়  ইম্যুনিটি সিস্টেম ঠিক রাখা। আর ইম্যুনিটি সিস্টেম ঠিক রাখতে ফরজ ইবাদত জরুরি।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উত্তম ব্যায়াম, এছাড়া পাঁচবার অযুর ফলে পরিচ্ছন্ন থাকার সুযোগ হচ্ছে। পানি বা ফ্লুইড জাতীয় খাদ্য, ঈষদুষ্ণ গরম খাবার গ্রহণ প্রয়োজন ইম্যুনিটি সিস্টেম ঠিক রাখতে,  হালকা ব্যায়াম, নফল ইবাদত বই পড়ায় ব্যস্ত থাকা খুব জরুরি। আর আপনি যখন এই কাজগুলোতে ব্যস্ত থাকবেন তখন মহান সৃষ্টিকর্তা তার রহমতের চাদর দিয়ে আপনাকে অবশ্যই ঢেকে রাখবেন।

সর্বোপরি করোনা মোকাবিলায় যেটা জরুরি তা হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো। আমাদের সচেতনতা গোটা বিশ্বে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে পারে। আমরা গৃহবন্দী থাকার ফলে জীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে পারবে কম।তাহলে আমরা সেটাই করি। আল্লাহ জীবন দেয়ার কর্তা নেয়ারও কর্তা।আমার যদি এখন ডাক আসে তবে এক্ষুণি চলে যেতে হবে এই রঙমহলের ঝাড়বাতি ফেলে তাহলে কিসের ভয়? তাই বলে আল্লাহ বলেননি যে তোমরা সাবধান হয়ো না।  আমরা ভাবতে পারছি না বিশ্বের অর্থনীতির চাকা কোনদিকে ঘুরে যাচ্ছে। কতটা নিচে নেমে যাচ্ছে সূচক। কতটা হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে শিল্প আর খেটে মানুষদের কথা আর নাই বলি। আর এই মুহূর্তে আমি আপনি চটকদার গল্প বানিয়ে মানুষের মাঝে প্যানিক না ছড়ায়। মহামারীর সময় যে নিষেধাজ্ঞা আছে সেগুলো মানার ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন??

রোগ নিয়ে ছেলেখেলার কোন সুযোগ আমাদের নেই। আপনার যেমন পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে তেমন কিন্তু ডাক্তারদেরও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। সুতরাং এ মুহূর্তে কারণে অকারণে ডাক্তারের চেম্বারে যাবেন না। তারা তো প্রত্যেকে তাদের ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছেন। প্রযুক্তির এই শীর্ষ যুগে ভিডিও কল দিন। তথ্য গোপন একটি অপরাধ ও মানসিক বৈকল্য। যারা তথ্য গোপন করছেন তাদের জন্য খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়, গার্ড পিয়ন সবাইকে। একজনের অপরাধে কতজনকে যেতে হচ্ছে আইসোলেশনে। প্লীজ একটু সহানুভূতি দেখান সবাই সবার প্রতি। উপসর্গ অনুভব করলে নিজেই চলে যান করোনার ইউনিটগুলোতে।
তাতে সবাই নিরাপদ থাকবে।আপনারা কি জানেন দুধের বাচ্চা ফেলে রেখে লেডিডাক্তার নার্স অনেকে ডিউটি করছে।

আমরা ব্যাংকারদের কথাও ভাবছি না। দলে দলে ব্যাংকে চলে যাচ্ছি। আর ব্যাংকে আগত প্রবাসীদের ভীড়ও কম নয়। কেউ একজন ধারক না হলেও বাহক হতে পারে এটা ভুলে যাচ্ছি। ইউরোপ কান্ট্রিগুলোতে এভাবেই মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বেশি। লক্ষ্মণ নেই অথচ একজনের দ্বারা আরেকজন আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য ব্যাংকারদের এই দূর্যোগের সময় তারা আমাদের যে সহযোগিতা দিচ্ছে তার প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখানো দরকার।

আমরা শুধু মৃত্যুর মিছিলের কথা পড়ছি কিন্তু যারা সুস্থ হচ্ছে তাদের গল্পগুলো কেন শুনতে চাচ্ছি না!তারা কিভাবে সুস্থ হলো সেগুলো বারবার পড়ে দেখি। পেন্সিল বাংলাদেশের অন্যতম সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনলাইন লেখক গ্রুপ।সেখানে অনেকেই তাদের বা আত্মীয় স্বজনের সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প লিখছেন সেগুলো পড়ে জানুন তারা কি ব্যবস্থা গ্রহন করেছিলেন। মনের সাহস আমাদের এই যুদ্ধে জয়ী করবে নিশ্চয়। ঈমান পরীক্ষার এটাও একটা সময়। আল্লাহ আমাদের সে সুযোগ দিয়েছেন।

আমরা অনেকেই ভীষণ ভেঙে পড়েছি মসজিদ যেতে পারছি না তাই। লকডাউনের সময় মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়বো কিনা?অনেকের মনেই এই প্রশ্ন।

উত্তর দিয়েছেন ইসলামী স্কলার আবদুস শহীদ নাসিম

০১. ইসলামি মানবাধিকার বিধানের অন্যতম মূলনীতি হলো: “তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা।” (আল কুরআন ০৪: ২৯)
০২. রসুলুল্লাহ সা বলেছেন: “কোনো এলাকায় মহামারী দেখা দিলে কেউ যদি আল্লাহর কাছে আশা নিয়ে সবরের সাথে ঘরে অবস্থান করে, সে একজন শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।”
(মুসনাদে আহমদ)
০৩. রসুলুল্লাহ সা আরো বলেছেন: “কোনো এলাকায় মহামারী দেখা দিলে তোমরা সে এলাকায় যেওনা। আর ঐ এলাকায় থাকলে সেখান থেকে বের হয়োনা।” (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরাং একথা পরিষ্কার যে,

০১. মহামারী এলাকায় যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকলে নামাজের জামাতে জড়ো হওয়া যাবেনা।
০২. জামাতে গেলে সেখান থেকে ঘরে ফিরে আসা যাবে না, যতোদিন না প্রমাণ হয় আপনি ভাইরাসমুক্ত।
০৩. মহামারীর প্রকোপের সময় ঘরে অবস্থান করাই উত্তম। কারণ তাতে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে।
০৪. যে কাজ জীবন হানিকর, সে কাজ ইসলামে নিষেধ।
০৫. অতএব, মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়া আপাতত স্থগিত রেখে ঘরে জুহর নামাজ পড়া কর্তব্য।
০৬. অনান্য নামাজের ব্যাপারেও একই কথা।

এরপরও আমরা কেন ধৈর্য ধরতে পারছি না।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডাঃ জুবায়ের হোসেন তার একটি লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে ইতি টানতে চাই —

“আপনাদের বলা হলো
মসজিদে জামাত এড়িয়ে বাসায় নামাজ পড়ুন যেখানে মসজিদে নববী ও মসজিদুল হারামাইন বন্ধ করে দেওয়া হলো। আপনারা আরো বেশি সংখ্যক মসজিদে যেতে লাগলেন। আর আমাদের গালি দিতে থাকলেন ইসলামের দুশমন ও নাস্তিক বলে।

আপনারা হুজুরের বয়ানে বিশ্বাস করলেন ইসলামে সংক্রমণ ব্যাধি বলে কিছু নেই।

কিন্ত রাসুল ( সাঃ) এর সেই হাদিসটা আমলে নিলেন না যে তোমরা অসুস্থ উট কে সুস্থ উট থেকে আলাদা করে ফেলো।

আপনারা হুজুরের কথায় বিশ্বাস করলেন যে আপনারা ইমানদার, আপনারা ৩৬০ ও ১২ আওলিয়ার দেশের লোক।

তাই আপনাদের করোনা ভাইরাস আক্রমণ করবেনা।

কিন্ত আপনারা চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কথা আমলে নিলেন না।”

বড়োই পরিতাপের বিষয় আমরা অন্ধ আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের কষ্ট নিজেরা বাড়ায়। সামনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা আসছে।আসুন মন্দা  কাটনোর উপায় বের করার জন্য চিন্তা ভাবনা করি।

ফারহানা শরমীন জেনী
সাহিত্যিক ও প্রভাষক, কমেলা হক ডিগ্রী কলেজ, বিনোদপুর রাজশাহী।

আরও পড়ুন