বর্ণিল বর্ষবরণ করোনায় বিবর্ণ

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দঃ

কোভিড নাইনটিন কিংবা নভেল করোনার আক্রমণে পৃথিবীব্যাপী এক অদৃশ্য আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সেই আতঙ্কের কারণে এ বছর বর্ষবরণেও ব্যাপক প্রভাব লক্ষনীয়। ইংরেজি বর্ষবরণে যেহেতু করোনার কোন আক্রমণ ছিলোনা তাই বিশ্বব্যাপী ইংরেজি নববর্ষ যথাযথভাবেই পালিত হয়েছে। এ বছরে করোনার সংক্রমণ শুরু হাবার পর থেকে যে সব দেশে বর্ষবরণ এসেছে সে সব দেশে নববর্ষের উৎসব খুব একটা চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশেও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষনীয়।

লুনার ক্যান্ডোর অনুয়ায়ী নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে প্রাচ্যের চীন, কোরিয়া, জাপানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে। এসব দেশে ঐতিহ্যগতভাবে নববর্ষ পালন করে চাঁদের আলোয়। ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চে ১৯ তারিখের যে কোনো দিন হতে পারে এই নববর্ষ। এ সময়ের মধ্যে যেদিন নতুন চাঁদ উঠবে সেদিনই শুরু হয় নতুন বছরের। একে বলা হয় লুনার ক্যান্ডোর। আরবি হিজরি সালের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। একেবারেই ওদের নিজস্ব। এসব অঞ্চলে নববর্ষ উদযাপন করা হয় একেবারেই নিজস্ব আদলে, ঐতিহ্যের বাতাবরণে। আর প্রথম মাসের অর্ধেকটা জুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ ও আয়োজন। পূর্ণিমার রাতে ওদের জীবনে নেমে আসে বাঁধভাঙা আনন্দের বন্যা। নববর্ষের দিনগুলিতে চীন, কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে আত্মীয়তা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য আয়োজন করা হয় পুনর্মিলনীর। বিনিময় করা হয় উপহার। বন্ধুত্বের দিগন্ত প্রসারিত করার জন্য তারা দেশি কায়দায় আয়োজন করে নানান অনুষ্ঠানের। মেলাও বসে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। নববর্ষের প্রথম দিনে তারা স্বর্গ ও পৃথিবীর দেবতাকে তুষ্ট করে নানা উপাসনা-উপচারে, দ্বিতীয় দিনে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। ওয়েইলু নামক বিশেষ ভোজনের আয়োজন করা হয় চীনে। পক্ষব্যাপী আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের মধ্যে সপ্তম দিনটি পালিত হয় ‘শস্যদিবস’ নামে। ভিয়েতনামে নববর্ষকে সংক্ষেপে টেট শব্দে অভিহিত করা হয়। ভিয়েতনামিদের বিশ্বাস, ঈশ্বর ঘরে ঘরে বাস করেন। নববর্ষে কার্প মাছের পিঠে চড়ে বেড়াতে যান স্বর্গে। সেখানে বসে শন্তরে লোক কী করছে, তা খতিয়ে দেখেন। এ বিশ্বাসে অনেকে নদী বা পুকুরে কার্প মাছ ছাড়েন। কিন্তু এ বছর কোন কোন দেশে নববষ পালিত হলেও চীন-জাপান ও কোরিয়ায় নববর্ষের রুপ ছিলো খানিকটা ¤্রয়িমান। বিশেষত করোনার কারণে চীনে নববর্ষের অনুষ্ঠান এবার উৎসবে রূপ নেয়নি।

করোনার সংক্রমনে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ইরানের নওরোজ বা নববর্ষ অনুষ্ঠানে। সুপ্রাচীনকাল থেকে ইরানে উদযাপিত হয়ে আসছে নওরোজ উৎসব। সূর্যের উত্তরায়নে যেদিন দিনরাত সমান থাকে সেদিনই পালিত হয় নওরোজ বা নবদিন উৎসব। সাধারণত ২১ শে মার্চ বা পারস্য ক্যালেন্ডার মতে ২১ শে মার্চের ২-১ দিন আগে বা পরে সূর্যের বসন্তবিষুবের দিন পালিত হয়ে থাকে পারস্যদের ঐতিহ্যবাহী নওরোজ উৎসব। পারস্য পুরাণ মতে পৌরাণিক রাজা জামশেদ নওরোজ প্রথার গোড়াপত্তন করেন। নওরোজে বিভিন্ন প্রতীক হিসেবে নানাবিধ ফুল ফল দিয়ে পারস্যবাসী সাজায় তাদের ঐত্যিবাহী নওরোজ টেবিল। পারস্যবাসী নওরোজ উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা দুই সপ্তাহ অবকাশ যাপন করে থাকে। বেশীর ভাগ সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই নওরোজের প্রথম সপ্তাহে চলে বাৎসরিক ছুটির আমেজ। ইরানের বাইরেও আফগানিস্তান, ইরাক কুর্দীস্থান, কসোভো, আজারবাইজান, কাজাখিস্থান, তুর্কেমেনিস্থান, তাজিকিস্থান, উজবেকিস্থান প্রভৃতি দেশে নওরোজ উৎসব পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর ইরান ও পার্শ্বাতী এলাকে এ অনুষ্ঠান হয়নি বলা চলে। নওরোজ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ইরানের সর্বোচ্চ ধমীর্য় নেতা ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদের হযরত ইমাম রেজার মাজার থেকে নববর্ষের ভাষণ প্রদান করে থাকেন। কিন্তু এ বছর করোনার সংক্রমণের কারণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনী তাঁর নববর্ষের ভাষণও বাতিল করেছেন।

ভারতে বর্ষবরণ উৎসবকে দিওয়ালি উৎসব বলে অভিহিত করে। দিওয়ালি অর্থ দীপাবলি বা আলোর উৎসব। এটি হয় বিভিন্ন রাজ্য বা সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী। দিওয়ালি ধর্মীয় উৎসবও বটে। লক্ষ্মীপূজাসহ চলে দেবদেবীর স্মৃতিচারণ করার উদ্দেশে ভজনসঙ্গীত, কৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। পাঞ্জাবে নববর্ষ উৎসব পরিচিত বৈশাখী নামে। নববর্ষে পুষ্পসজ্জা প্রায় সর্বভারতীয় রেওয়াজ। দক্ষিণ ভারতের অঞ্চলবিশেষের মজাদার খাবার ও পুষ্পাহার গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। উত্তর-ভারতের নববর্ষের উৎসব হোলি বা দোল। এটি বসন্তকালীন উৎসব। এতে পিচকারি মেরে রঙ ছিটিয়ে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যদিয়ে আনন্দ প্রকাশ করার রীতি এখনও বর্তমান আছে। দক্ষিণ-ভারতের দ্রাবিড়দের তিন দিন ধরে এ উৎসব পালিত হয়। করোনার কারণে এ সব উৎসবেও কোন প্রাণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পহেলা বৈশাখ মোতাবেক ১৪ এপ্রিলকে স্থায়ীভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয় বাংলাদেশসহ পশ্চিবঙ্গে। মূলত স¤্রাট আকবরের সময় রাজকার্যে সে সময় হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল। ভারতবর্ষে মুগল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরও হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো। হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল থাকায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। যার ফলে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। সুষ্ঠুভাবে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যেই মুগল স¤্রাট আকবর সে সময় এলাহি সনের প্রচলন করেন। স¤্রাটের আদেশ অনুযায়ী জ্যোতিবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌরসন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তিকরে নতুন সনের নিয়ম নির্মাণ করেন। সবশেষে ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪ এপ্রিলকে স্থায়ীভাবে বাংলা নববর্ষ শুরুর দিন হিসেবে ঠিক করা হয়। বেশ কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশে নববর্ষ একটি উৎসবের আকারে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে টোকেনমানি হিসেবে হলেও নববর্ষ উৎসবভাতারও প্রচলন করা হয়েছে। ফলে বাংলানববর্ষ বাঙালির জাতীয় জীবনের একটি উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে নববর্ষ উৎসবের চিত্র সম্পর্ণভাবেই উল্টো। কোন ধরনের কোন উৎসবের আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে না। শপিংমলসহ গ্রামবাংলার ছোটোখাটো মার্কেটগুলো বন্ধ থাকায় নববর্ষের কোন চিত্রই চোখে পড়ছে না। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক অজানা আশঙ্কা ও ভয় কাজ করছে। করোনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় নিয়েও সকলেই ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। ফলে নববর্ষের বিষয়টি সাধারণ জনগণের মাথা থেকে বিদায় নিয়েছে বলা যায়। তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন-প্রতিষ্ঠান এবং মিডিয়া এ বিষয়টি নিয়ে ঘরোয়াভাবে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বর্ষবরণ না করে বর্ষস্মরণ করতে পারে।

করোনার কারণে গস্খামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হালখাতাও এবার জমবে না বলেই মনে হচ্ছে। অথচ বাংলা নববর্ষের একটি বড় আয়োজন হালখাতা অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের ছোটবড় হাটবাজারে দোকানের বকেয়া পরিশোধের জন্য পহেলা বোশেখ থেকে পুরো মাস জুড়ে হালখাতার আয়োজন চলে। মূলত বছরের শুরুর দিন জমিদার ও বড় বড় তালুকদারের কাছারিতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হতো। সেদিন অধিকাংশ প্রজা ভাল কাপড় পরে জমিদার বাড়িতে খাজনা দিতে আসতো। হালখাতা অনুষ্ঠান পুণ্যাহ অনুষ্ঠানেরই ও পিঠ। উভয় অনুষ্ঠানের সামাজিকতা, লৌকিকতা, সম্প্রীতি ও সৌজন্যের দিকও লক্ষণীয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা বৈসাবি বা বিজু মেলা বসায়। সাঁওতাল, গারো সমাজেও জাঁকজমকের সঙ্গে বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়। এদিন তীর-ধনুক নিয়ে জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়া সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ। মারমা সম্প্রদায়ের লোকজন চারদিন ধরে সাংগ্রাই উৎসব পালন করে। পুরনো বছরের শেষ দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই সাংগ্রাই উৎসবের দিন হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পরের দু’দিন মারমা সম্প্রদায়ের জনপদে হয় আনন্দের বন্যা। ওই দু’দিন মারমা সম্প্রদায়ের পাহাড় পাহাড় চলে জল উৎসব। একে অপরের গায়ে জল ছিটিয়ে পুরনো বছরের ব্যর্থতা, হিংসা-বিদ্বেষ মুছে নতুন বছর হোক ভালবাসা, সাফল্য আর সম্প্রীতির আনন্দ-আশ্রয়। এ বছর এ ধরনের কোন অনুষ্ঠানের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেননা মানুষের ভেতরে যে করোনা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তাতে বেঁচে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসবের ইমেজকে আমরা কাজে লাগাতে পারি বিশ্বাসের সাথে, সতর্কতার সাথে, সচেতনতার সাথে করোনার ভয়াল আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করা। আজ তাই সকলেরই হৃদয়ের আকুতি, হে আল্লাহ, তুমি রক্ষা করো করোনার ভয়াল থাবা থেকে।

[লেখক: কবি ও গবেষক, প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।]

আরও পড়ুন