এখন দুঃসময়

অঞ্জনা দত্তঃ

ক্যালেন্ডারের হিসাবে এখন শীতের চলে যাওয়ার সময়৷ বসন্ত দুয়ারে দাঁড়িয়ে৷ গাছগুলোতে একটি দুটি করে পাতা উঁকি দিচ্ছে।  অথচ ইতালির Lombardy শহরে দিনগুলো কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। অদূরে ইউক্যালিপটাস গাছে বসে নাম না জানা দুই একটা পাখি থেকে থেকে ডেকে উঠছে। কিন্তু ডে ডাকেও যেন কোন প্রাণ নেই যেন!   সব কেমন গুমোট হয়ে আছে? কতদিনে কাটবে প্রকৃতির রোষ তার সন্তানদের ওপর? ১ লাখ ২৬ হাজার প্রাণ ঝরে গেল পৃথিবী হতে। ২০ লক্ষ মানুষ আজ এক অনুজীবের থাবায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে আর প্রতি পলে মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে। ওরা জানে না,  ওদের স্বজনেরা জানে না ওরা ফিরে আসবে কি না। আর কখনও মিলিত হবে কি না পরিবারের সঙ্গে? আবার হাসি গানে ভরে উঠবে কী ওদের সংসার? আজ ধনী গরীব, রাজা প্রজা সব এক কাতারে সামিল হয়ে গেল। এই দিনগুলোর কথা কী মানুষের মনে থাকবে যখন অন্ধকার কাটিয়ে সূর্যের সোনালী রেখা দেখা দেবে! দেখা তো দিতে হবেই আশার আলোকে। কিন্তু কতদিনে?  কে বলে দেবে মানব সমাজকে?  

 

বিছানায় শুয়ে  প্রার্থনারত অবস্থায় কথাগুলো ভাবছিল ডাঃ যোশেফ। ভোরের আলো তার ঘরের কাঁচের জানালা দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে বিছানায়৷ এখনই উঠতে হবে তাকে। তৈরি হতে হবে হাসপাতালে যেতে৷ আজ দীর্ঘ একমাস যাবত কী যুদ্ধটাই না চলছে যোশেফের দেশ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইতালিতে৷ যোশেফ থাকে অবশ্য Lombardy province  এর Bergamo শহরে। রোম থেকে উত্তরে ৪৬৮ কিমি দূরে প্রভিন্সটি। মোটামুটি উষ্ণ বলা যেতে পারে অঞ্চলটিকে। অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি। উপদ্বীপ ইতালির ভূভাগের মধ্যে Lombardy অন্যতম বড় প্রভিন্স৷ মিলান হলো নিকটবর্তী বড় শহর৷ Lombardyর চারপাশ ঘিরে আছে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া।  

স্লোভেনিয়ার নিচে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গেও যোগ রয়েছে সাগরের মাধ্যমে। অপরদিকে স্পেন। 

 

ডাঃ যোশেফ,  বয়স ৪৫, আজ কুড়ি বৎসর যাবত এই হাসপাতালে চাকরি করছে মেডিসিন বিভাগে৷ সিনিয়র কনসালটেন্ট। বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ। তার স্ত্রী,  সুজান, ৪৩, একজন এনেস্থিসিয়া এক্সপার্ট। আজ মাস দেড়েক ধরে, বিশেষ করে গত একমাস ধরে অন্য সব চিকিৎসকদের মত কখন সূর্যোদয় হয়, কখন সূর্য ডোবে যোশেফ সুজান জানে না৷ মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে হু হু করে রোগীর ঢল নেমেছে হাসপাতালে। রোগীদের জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। যাদের সিম্পটম তত বেশি নয়,  তাদের প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কড়া নির্দেশ ছিল যেন তারা আইসোলেশনে থাকে। দেখা গেল চার পাঁচদিন পর সেই রোগী তার পরিবারের আরও তিন চারজনকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসছে। এদের শরীরেও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের চিহ্ন স্পষ্ট। আর প্রথম রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে এখন হাসপাতালে ভর্তি না করালেই নয়। বাকিদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হল। তাদের কারও বা গলা খুশখুশ করছে,  সামান্য ব্যথা। কাশিও ছিল৷ জ্বর তেমন ছিল না। আবারও আইসোলেশানে থাকার কথা পাখিপড়ার মত করে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল৷ কোন অবস্থাতেই বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করল৷ কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় রোগীরা চিকিৎসকদের উপদেশ মেনে চলেনি। ধরে নিয়েছে ফ্লু হয়েছে। সামান্য কাশি অথবা গলা ব্যথা নিয়ে কে কবে ঘরে বসে থেকেছে? পার্টি করছে। উইক এন্ডে বের হয়ে পড়ছে। পাশের দেশ সুইজারল্যান্ড, নাহয় ফ্রান্স অথবা অস্ট্রিয়া থেকে ঘুরে এসেছে৷ 

 

৩১ শে জানুয়ারি ইতালিতে Wuhan থেকে আসা দুই চাইনিজকে পরীক্ষা করে তাদের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি কনফার্ম করা গেল। সপ্তাহ খানেক পরে Wuhan থেকে ফিরে আসা এক ইতালিয়ানকে করোনা ভাইরাসে  আক্রান্ত অবস্থায় পাওয়া গেল। ফেব্রুয়ারিতেই ৩য় সপ্তাহের দিকে প্রচন্ড জ্বর, কাশি নিয়ে ১ জন মারা গিয়েছিল৷ চিকিৎসকরা নড়ে চড়ে বসল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সব চিকিৎসকদের নিয়ে বসল তাদের করণীয় নিয়ে৷ সব ডাক্তার, নার্সদের ছুটি বাতিল করা হল। তখন পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। কিন্তু মার্চ মাসে সব চিত্র বদলে গেল৷ যেমন রোগী বেড়ে গেল তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল মৃত রোগীর সংখ্যা। শুরু হয়েছিল ৩ /৪ জনের মৃত্যু দিয়ে, সেটি ক্রমে ক্রমে বেড়ে ৩০০–  ৪০০–৭০০– করে করে একসময় হাজার ছাড়িয়ে গেল। যোশেফরা পাথরের মত মুখ করে যন্ত্রের মত কাজ করে যেত৷ এর মধ্যে তাদের হারাতে হয়েছিল বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে। অথচ তারা কাজ করেছিল পারসোনাল প্রটেকশন নিয়ে। তবে তাদের কোথায় ভুল হয়েছিল? হ্যাঁ, মনে পড়ল যোশেফের, প্রথম দিকে ওরা ভেবেছিল Highly infectious pneumonia । বয়স্ক রোগীরা, বিশেষ করে যাদের এ্যাজমা আছে অথবা বয়সের কারণে ফুসফুসের ইলাস্টিসিটি কমে গেছে তাদের সমস্যা হচ্ছে বেশি৷ মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে অকল্পনীয় হারে। তখনও চিকিৎসকরা নিউমোনিয়া মনে করে নিজেরা তেমন কোন প্রটেকশন না নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে চলেছে। ওরা ভুলে গিয়েছিল Wuhan এর কথা। যেখান থেকে ওদের দেশে এই রোগটি ছড়িয়েছিল৷ কয়দিন পরে দেখা গেল মেডিক্যাল পারসোনেলদের মধ্যে কারও কারও জ্বর,  সর্দি, কাশি ইত্যাদি দেখা দিচ্ছিল৷ তাও তারা সিরিয়াসলি নিল না৷ ঐ অবস্থায় রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে লাগল। 

 

ইতালিয়ানদের মধ্যে বয়স্ক লোকের সংখ্যাও বেশি। আর তাছাড়া ওরা সবাই মিলে থাকতে ভালোবাসে৷ তাই যোশেফরা যখন আইসোলেশনের কথা বলত ওরা পাত্তা দেয়নি। মার্চের প্রথম সপ্তাহে Lombardy তে কোয়ারেনটাইন জারি করল। সুপারমার্কেট ছাড়া আর সবকিছু বন্ধ করে দিল। কিন্তু ইতালিয়ানরা বুঝেনি সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা কী? বরং বেড়াতে চলে গেছে আশেপাশের দেশে। এদের মধ্যে অনেকেই শরীরে  ভাইরাস বহন করছিল।কিন্তু তারা সেটি জানত না। নিজেদের অজান্তেই ছড়িয়ে দিয়ে এল অন্যদের মধ্যে, অন্য দেশে। যারা ছিল সুস্থ। তাতে করে যত দিন গেছে ইনফেকশন ছড়িয়েছে তড়িৎ গতিতে৷ হাসপাতালে জায়গা দেয়া যাছিল না। একটা এক্সজিবিশন হলকে অস্থায়ী হাসপাতাল বানাল। তাঁবু বানিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করা শুরু করল। কোন কোন হোটেল কে আইসোলেশন সেন্টার করল৷ তখন থেকে রোগীদের বাসায় না পাঠিয়ে ঐসব হোটেলে আইসোলেশনে রাখতে শুরু করেছে৷ ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতালি জুড়ে বিশেষ করে Lombardy তে মহামারী আকারে আবির্ভূত হল করোনা ভাইরাস সংক্রমণ।  অথচ ইতালি সরকারের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। জানুয়ারির শেষে ইতালি সরকার চীনের সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। কিন্তু আটকাতে পারল না করোনা ভাইরাসকে৷ 

 

মার্চের ১২ / ১৩ তারিখের দিকে সুজান সকাল থেকে কেমন যেন খারাপ বোধ করছিল৷ ওর ওপর দিয়ে গত দুই তিন সপ্তাহে যেন ঝড় বয়ে গেছে৷ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে দিনরাত পড়ে থেকেছে৷ প্রথম প্রথম রোগীদের মৃত্যু নিতে পারত না। এত বৎসর ধরে কাজ করছে৷ রোগীদের  মৃত্যু সুজানের কাছে নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এটা যে শুধু মৃত্যু নয়! রোগীদের যে বাঁচার প্রবল আকাঙ্খা! মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। ওদের দেখে মনে হত ঐ রুমে বুঝি কোন অক্সিজেন নেই৷ হাঁ করে থাকার জন্য গলা শুকিয়ে যেত৷ শুরু হত কাশি। কাশতে কাশতে শরীর কুঁকড়ে যেত৷ শ্বাসকষ্ট ছাড়াও কেউ আগে থেকেই ছিল এ্যাজমা বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ ( COPD),  কারও ডায়াবেটিস, অথবা হার্ট ডিজিজ। অক্সিজেন মাস্ক, নেবুলাইজার কোনটাই এইসব রোগীদের কষ্ট এতটুকু কমাতে পারেনি। সাথে সাথে রোগীকে লাইফ সাপোর্টে নেয়ার ব্যবস্থা করা হত৷ কোন রোগী হয়তো বা ঘন্টা খানেক, কেউ বা দুই ঘন্টা কাটাত ঐ লাইফ সাপোর্টে। এরপর সে রোগী সব সাপোর্টের উর্ধ্বে চলে যেত৷ এত কিছু ভাবার সময় হত না। আর এক রোগীকে ঢোকাতে হত ভেন্টিলেটরে। একজন ডাক্তারকে যদি দিনে চার পাঁচশ রোগীর মৃত্যু দেখতে হয় এটা যে তার ওপর কতবড় মানসিক চাপ সেটি ঐ প্রফেশনের লোকেরা ছাড়া অন্যদের পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়। সুজানের এক একদিন পাগল পাগল লাগত৷ দম বন্ধ হয়ে আসত। আর এই হতভাগ্য মৃতদের জন্য দুই ফোঁটা চোখের জল ফেলার কেউ ছিল না। এমন ছোঁয়াচে রোগ যে স্বজনদেরও সুযোগ ছিল না তার প্রিয়জনের মৃতদেহ সৎকার করা৷ কী কষ্ট! কী কষ্ট!! 

 

সুজান প্রথম ভাবল ওকে কী ডিপ্রেশনে পেয়ে বসেছে? নাঃ! ওরা যেন বোধশক্তিহীন হয়ে পড়েছিল৷ গলা একটু ব্যথা করছিল৷ সাথে হালকা কাশি৷ যোশেফকে ডেকে বলল ওকে একটু লেমন টি বানিয়ে দিতে৷ হাসপাতালে যাওয়ার সময় হয়ে আসছিল। যোশেফ কিচেনে চলে গেল নিজের জন্য কফি এবং সুজানের জন্য লেমন টি নিয়ে আসতে৷ চা নিয়ে বেডরুমে ঢুকে তখনও সুজানকে বিছানায় শোয়া দেখে কপাল কুঁচকে যোশেফ জানতে চাইল 

> এখনও ওঠোনি যে?  হাসপাতালে যেতে হবে না?  

> কেমন যেন ভালো লাগছে না৷ গলা ব্যথা।  কাশিও হচ্ছে একটু। 

বলছ কী?  যোশেফের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। 

> আরে না,  না৷ এত ঘাবড়াবার কিছু নেই৷ প্রত্যেকদিন  এত রোগী ঘাঁটতে হয়। একটু শরীর খারাপ তো লাগতেই পারে৷ প্রপার রেস্ট হচ্ছে না যে৷ 

 > ভুলে যেও না ইতিমধ্যে আমাদের ১৪ জন চলে গেছে৷ বিমর্ষ মুখে বলল যোশেফ৷ 

যোশেফের বিষন্ন চেহারা দেখে সুজান তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসে হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিল৷ গরম চা যেন গলায় একটু আরাম এনে দিল৷ 

> এক কাজ করো৷ তুমি আজ না যাও হাসপাতালে৷ 

> তা কী করে সম্ভব?  এত এত রোগী।  

মাইকেল,  রোজারিও, জেনি ওরা সবাই তো রয়েছে৷ একটা দিন রেস্ট নেয়া যায় না?  

> তা হয় না। এত রোগীর চাপ৷ ঘরে বসেও শান্তিতে থাকতে পারব না। আচ্ছা আমি নাহয়  ঘন্টা দুয়েক পরে যাব৷ ওদিকে কিছুক্ষণ বেশি থাকলেই হবে৷ 

> দেখ৷ শুকনো গলায় বলল যোশেফ৷ আর হ্যাঁ। আজ হাসপাতালে যেয়ে টেস্ট করিয়ে নিও। 

 

এরপরে যা হওয়ার তাই হল৷ সুজানকে আইসোলেশনে যেতে হল৷  কনসালটেন্ট ভর্তি হতেই বলেছিল৷ কিন্তু যোশেফ একা বাড়িতে থাকবে। যদিও সিংহভাগ সময় হাসপাতালেই কাটাত দুজনে। তবু সুজান ভাবল বাড়িতেই ভালো থাকবে। হাসপাতালে থাকা মানে সব সময় কানে বাজবে ডাক্তার নার্সদের ছুটোছুটির শব্দ। তার চেয়ে কয়টা দিন বাড়িতে বসে কাটিয়ে দেয়াই ভালো হবে৷ ওদের একমাত্র সন্তান  এ্যানি রয়েছে স্টেটসে৷ ওখানকার অবস্থাও ভালো নয়। তবে ফ্লোডিরার অবস্থা তত খারাপ নয়। তবু মায়ের মন তো৷ কাজের ফাঁকে ফাঁকে এ্যানির কথা ভাবে আর বুকের ভিতরটা ভয়ে শিরশির করে ওঠে৷ কবে পৃথিবী এই অভিশাপমুক্ত হবে!  

 

দিন দুই পরে সুজানের অবস্থা আরও খারাপ হল। গলার ব্যথা বেড়ে গেল। জ্বর বাড়ছে চড়চড় করে৷ শ্বাসকষ্ট রাতের চেয়ে এখন   অনেকটাই বেড়েছে৷ যোশেফের চোখ এড়ায়নি৷ সুজানকে বলল তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে৷ এই অবস্থায় বাসায় থাকা উচিত হবে না। এখনই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে৷ যোশেফের চোখ জ্বালা করছে৷ ইতিমধ্যে ওদের শহরেই ১৪ জন ডাক্তার চলে গেছে না ফেরার দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে যেয়ে৷ এছাড়া আরও অনেক ডাক্তার নার্স অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ ফ্লোরিডায় মেয়েকে ফোন করতে যেয়ে আবার হাত গুটিয়ে নিল যোশেফ। এতদূরে থাকে মেয়েটা৷ টেনশন করা ছাড়া তো আর কিছুই করার থাকবে না৷ 

 

এরপরের দিন পাঁচেক  কোন দিক দিয়ে চলে গেল যোশেফ বুঝতেই পারেনি৷ ক্ষণে ক্ষণে সুজানের অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল। অথচ সুজানের না ছিল ডায়াবেটিস,  না এ্যাজমা৷ না কোন হার্ট ডিজিজ৷ বয়সও বেশি কিছু নয়। অথচ ওর যেন প্রাণশক্তি ফুরিয়ে আসছে৷ আসলে আজ এতটা দিন ক্লান্তিহীনভাবে সুজান যেভাবে কাজ করে গেছে…  ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করেনি৷ মৃত্যুর মিছিল দেখে কেউ কী খেতে পারে? না ঘুমুতে পারে? না সম্ভব হয় উদাসীন হয়ে থাকা! আর সেইজন্যই মনে হয় সুজান একধরণের ডিপ্রেশনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল যা কি না সে নিজেও বুঝতে পারেনি৷ নিজের সহকর্মীদের নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টা কোন কাজেই আসল না। Lombardy র দীর্ঘ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হল আর একটি লাশ,  যে কি না দিন কয়েক আগেও রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে গিয়েছিল অপরিসীম যত্নে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোশেফকে দিন কয়েকের ছুটি দিয়েছিল। তার আগে তার টেস্ট করা হয়েছিল৷ টেস্ট রেজাল্ট পজিটিভ। এবারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটু স্ট্রীক্ট হল। যেটা সুজানের বেলায় করতে যেয়েও পারেনি সেটি যোশেফকে করতে দিল না। একা বাড়ি থেকে কী করবে? মেয়েও আসতে পারবে না। ফ্লাইট বন্ধ৷ আমরা তোমায় দেখব। 

 

হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে যোশেফ নিষ্পলক চেয়ে থাকে সিলিং এর দিকে৷ আচ্ছা সুজানকে এখানে রাখলে কী ভালো হত না?  ও এমন জেদ করল না? কিছুতেই শুনতে চাইল না৷ আমি কী কোন অবহেলা করেছিলাম? ওর জন্য ঠিক সময়মত যা করার ছিল তা করিনি? লাইফ সাপোর্টে দিতে কী দেরি হয়ে গিয়েছিল?  কত রকমের প্রশ্ন যে যোশেফকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়! যোশেফের মনে হয় ও পাগল হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে যোশেফ সুস্থ হয়ে উঠল। ফ্লু এর ওপর দিয়ে গেল। সুজান কেন পারল না? তার এতদিনের সাথী৷ কোন কাজ তারা একে অপরকে না জানিয়ে করেনি কখনও৷ আর এবারে সুজান ওকে না জানিয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখে চলে গেল? লাইফ সাপোর্টে  নেয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে সুজান ঘোলাটে চোখে তাকিয়েছিল যোশেফের দিকে৷ বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। মুখে অক্সিজেন মাস্ক থাকা সত্ত্বেও হাঁ করে শ্বাস নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা যোশেফ সহ্য করতে পারছিল না। কাঁপা কাঁপা হাতে যোসেফের হাত ধরার জন্য বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিল৷ যোশেফ জিজ্ঞেস করল কিছু বলবে হানি? সুজানের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ডাক্তাররা ভেন্টিলেটর মেশিন রেডি করে নিয়েছিল ততক্ষনে। সুজান আর কিছু বলার সুযোগ পায়নি৷ সে অবস্থায় সে ছিল না। 

 

যোশেফ সুস্থ হয়ে আবার কাজে যাওয়া শুরু করল৷ ডিপার্টমেন্ট থেকে বারণ করেছিল৷ ইতালিতে মৃত্যুর হার কমে এসেছে৷ এই পর্যন্ত প্রায় ১,৩৫,০০০ জন আক্রান্ত হয়েছে৷ মারা গেছে ১৬০০০ এর বেশি৷ আজ দুইদিন ধরে মৃত্যুর হার কমেছে৷ সবচেয়ে খারাপ অবস্থা Lombardy province   এর Bergamo শহরে। ইতালিতে সর্বমোট ৪৫ জন চিকিৎসক জীবন বিসর্জন দিয়েছেন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে যেয়ে৷ আরও কয়েক হাজার মেডিক্যাল পারসোনেল অসুস্থ অবস্থায় আছেন। জানি না তাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে! ইতালিয়ানরা এখন তাদের ভুলগুলো খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে৷ কেননা ইতালিতে ছিল স্বাস্থ্যসেবা ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। তবে তারা অন্য অনেক দেশের মত প্রথমদিকে খুব সিরিয়াসলি নেয়নি রোগটিকে। মানেনি সামাজিক দূরত্ব যেটি এই সময়ে করোনা রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়৷ মেনে চলেনি কোয়ারেনটাইন। হাসপাতালে যায়নি সময় মত। বরং ঘুরে বেড়িয়েছে যেমন নিজের দেশে তেমন প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। এছাড়া ইতালিতে যেসব রোগীদের সিম্পটম ছিল চোখে পড়ার মত তাদের টেস্ট করা হত। অন্যদের নয়। অথচ দক্ষিণ কোরিয়া সিম্পটম থাকুক বা কম থাকুক বা একেবারেই না থাকুক তাদেরও টেস্ট করিয়েছিল৷ ফলে তারা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটিকে ধরতে পেরেছিল এবং সেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছিল৷ তাছাড়া জাপানের পরে ইতালিতে বয়স্ক রোগীদের সংখ্যা ছিল বেশি৷ ইতালির চিকিৎসা সেবার বিশাল এক অংশ সরকার বহন করত৷ যার ফলে এদের গড়আয়ু অনেক বেশি ছিল৷ ছিল অন্যান্য রোগও। সেইজন্য এইরকম একটা মারণ ভাইরাসের থাবা এই জনগোষ্ঠী সামাল দিতে পারেনি। মৃতদের মধ্যে প্রায় ৮৫% এর বয়েস ছিল ৭০ এর ওপরে৷ সামাজিক দূরত্ব না মানায়, আইসোলেশনে না থেকে ঘুরে বেড়ানোতে করোনা ভাইরাস ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রায় দুই শতাধিক দেশে৷ এর তান্ডব এখনও শেষ হয়নি৷ যেসব দেশগুলোতে মাত্র শুরু হয়েছে সেসব দেশে রোগটি যখন সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে তখন মৃতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে শেষ হবে কে জানে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমগ্র  পৃথিবী এমন ঝাঁকুনি আর খায়নি৷ একসময় এই ভাইরাস ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আসবে। আবার শুরু হবে নতুন করে জীবন। কিন্তু একটি অনুজীব যেভাবে পুরো বিশ্বকে লন্ডভন্ড করে দিল, ওলটপালট করে দিল বিশ্বের অর্থনীতিকে সেটিকে যথাস্থানে এনে বসাতে কতদিন লাগবে কে জানে! আর যোশেফের মত যাদের জীবনের ছন্দ মাঝপথে এসে হারিয়ে ফেলল তার স্বাভাবিক গতি তাদের জীবনে আনন্দ ফিরে আসবে কী?  

তথ্যসমূহঃ উইকিপিডিয়া।

আরও পড়ুন