ভাইরাল ভিডিও

 

আজ খন্দকার বাড়ীতে ত্রাণ দেয়া হবে। আশেপাশের এলাকায় মাইকিং করে বলা হয়েছে প্রতি পরিবার থেকে একজন সদস্য গিয়ে যেন ত্রাণ গিয়ে সংগ্রহ করে।

পাশের গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে রহিম আলীও যাচ্ছে ত্রাণ আনতে। ঘরে এখন আর বেশি চাউল নেই। বাপ ছেলের কাজ বন্ধ। রহিম আলী ঢাকায় একটা দোকানে কাজ করে,আর তার বাবা কৃষিকাজ করেন। বাড়ীতে
পাঁচজন মানুষ। খাবারতো আর কম লাগে না!
রহিম আলীর ছয় বছরের ছেলে সুজন বায়না ধরেছে বাবার সাথে সে ত্রাণ আনতে যাবে। কিন্তু রহিম তার ছেলেকে এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে কিছুতেই সাথে নিতে চাইল না। অনেক জোরে একটা ধমক দিয়ে বললো,

—–দেখছনা টিভিতে ডেলি ডেলি কইতাছে? কডিন এক রোগ আয়ছে দেশে! অনেক ছুঁয়াছে,এই রোগ হইলে মানুষের আর রক্ষা নাই। তাইতো বার বার কইরা মাইক দিয়া কইছে হুদা একজন কইরা যায়তে!

রহিম আলী যাওয়ার পরই বৃদ্ধ সুরুজ আলী তার নাতিকে নিয়ে রওয়ানা দিলো। নাতির চোখের পানি তিনি সইতে পারেন না।

নাতিকে ভালো করে বুঝালো,
—কাছে যাবো না দাদা,দূর থেকে খন্দকার বাড়ীর ত্রান দেওয়া দেখায়া আনুম তোমারে।

বৃদ্ধ সুরুজ আলী আর তার অতি চঞ্চল নাতি সুজন হেটে চললো পাশের গ্রামে। এইতো দেখা যাচ্ছে, আরেকটু গেলেই খন্দকার বাড়ী। হঠাৎ ও মাগো বলে চিৎকার করে উঠল সুজন। দাদা দেখলেন তার নাতির পায়ে একটা খেজুর কাটা বিশ্রী করে বিঁধে আছে। তিনি টেনে কাঁটাটা বের করলেন। অনেকখানি পা কেটে গেছে। মূহুর্তের মধ্যেই সুজনের পা ফুলে উঠল।
দাদা তার নাতিকে নিয়ে খন্দকার বাড়ীর পাশেই রাস্তার কিনারে একটা গাছের ছায়ায় বসে পরলেন। ছেলেটা ব্যাথায় কাঁদছে। নাতির কষ্টে একটু পর পর দাদাও চোখ মুছে চলছেন।

খন্দকাররা বিরাট ধনী। তারা ত্রাণ দেবে আর সাংবাদিক আসবেনা! এমন কখনো হয়না। তাদের প্রচার খুব দরকার। এলাকায় প্রভাব ধরে রাখতে প্রচারের বিকল্প নেই।
বছর শেষে যাকাত দেওয়ার সময়ও পরিচিত সাংবাদিক এসে নিউজ করে। এবারও তারা ঢাকা থেকে সাংবাদিক সাথে নিয়েই এসেছেন। স্থানীয় সাংবাদিক ও আছে বেশ কজন।

ত্রাণ বিতরনের এক পর্যায়ে একজন সাংবাদিক বাড়ির বাইরে গেলেন। তার নিউজ করা শেষ। আশেপাশে দেখছেন নতুন কোন খবর পাওয়া যায় কি না। মানুষ নতুন কিছু চায়। একঘেয়ে ত্রাণের খবর আর কত!
হঠাৎই তার চোখ গেল বৃদ্ধ দাদা আর ক্রন্দনরত নাতির উপর। সাংবাদিক মহাশয় ভাবছেন,

—আরে! আরে! সবাই ভেতরে গেল এই বৃদ্ধ লোকটা এখনে কেন বসে আছে? আহারে!আর বাচ্চা ছেলেটা এমন বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে কেন?
তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের কাছে, এমন সময় দেখলেন, খন্দকার বাড়ী থেকে একটা মাঝ বয়সি লোক বের হলো। তার হাতে একটা ত্রাণের ভারি ব্যাগ। লোকটা এগিয়ে গেলো বৃদ্ধ লোকটার কাছে। লেকটার সাথে ধমকে কি যেন বলল। সাংবাদিক ভাবছে মনে হয় আগে থেকেই বৃদ্ধ লোকটাকে চিনে।
বৃদ্ধ একটু নরম স্বরে লোকটাকে কিছু বলল। লোকটা ছেলেটার কাছে গেলেন। ছেলেটা তার দাদাকে জড়িয়ে ধরল। ছেলেটা কিছুতেই বৃদ্ধের গলা ছাড়ছেনা।
লোকটা তখন ছেলেটার হাত ধরে টেনে কাছে নিলেন। কোলে নিলেন ছেলেটাকে। ছেলেটা তখনও কেঁদেই চলেছে।
লোকটি ত্রাণের বিশাল ব্যাগটা দিলেন বৃদ্ধের হাতে তারপর, কিছু বললেন। দূর থেকে সাংবাদিক কিছুই শুনছেন না, কিন্তু আন্দাজ করলেন ব্যাপারখানা কি!,
আরে! লোকটাতো পকেট থেকে টাকাও দিলেন বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ বাচ্চা ছেলেটাকে লোকটার হাতে দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মন খারাপ করে চলে গেলেন। লোকটা ক্রন্দনরত ছেলেটাকে কোলে করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।

দূর থেকে সাংবাদিক মহাশয় পুরো ঘটনাটা ভিডিও করলেন। পেয়ে গেছেন তিনি খবর। এবার তার গ্রামে আসা স্বার্থক হয়েছে।

আসল ঘটনা হলো রহিম আলী ত্রাণের দশকেজি চাউল,আটা, ডাল,আলুর বিরাট ব্যাগটা নিয়ে বাড়িতে রওয়ানা দিতে গিয়ে দূর থেকে তার বাবা আর ছেলেকে দেখতে পায়। তিনি কাছে এলেন। কাছে এসে ছেলেটাকে নিয়ে এতদূর আসায় বাবাকে মৃদু ধমক দিলেন রহিম।
আর বাড়িতে ছেলেকে বকা দিয়েছিলেন বলে ছেলেটা অভিমানে বাবার কাছে না গিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরলো। তখন রহিম আলী দেখলেন ছেলের পা ফুলে গেছে।তাকে খন্দকার বাড়ীতে নিয়ে ঔষধ লাগাতে হবে।আর ছেলেকে এতদূর তার বাবা কাঁধে করে নিয়ে যেতে পারবেনা।ছেলের অভিমানটাও ভাঙাতে হবে। তাই রহিম আলী তার বাবার কাছে ব্যাগটা দিলেন।আর পকেট থেকে খুচরা টাকা দিলেন রিকশা দিয়ে যাওয়ার জন্য।
তারপর সুজনকে তার দাদার কাছ থেকে কোলে করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।যদি একটু ঔষধ পাওয়া যায় সে আশায়।

এদিকে সাংবাদিক সাহেব তার বিরাট উর্বর বুদ্ধি ঘেটে বের করলেন অনেক বড় এক নিউজ। তিনি ভিডিওটা অনলাইনে ছেড়ে দিলেন। তারপর লিখলেন এক হৃদয় বিদারক কেপশন,

“একব্যাগ চাউলের বিনিময়ে এক অসহায় বৃদ্ধ তার ফুটফুটে নাতিকে বিক্রি করে দিলো”

আর মূহুর্তের মধ্যেই খবরটা ভাইরাল। শত শত নয় হাজার হাজার শেয়ার হলো কয়েক ঘন্টার মধ্যে।

 

সুস্মিতা মিলি – সাহিত্যিক 

আরও পড়ুন