আনন্দ কুমারের ‘সুপার থার্টি’ যেভাবে ‘সুপার হিরো তৈরি করে

শারমিন আকতার

আনন্দ কুমার ভারতের একজন জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ এবং গণিতবিশারদ । তার নিজের শৈশব এবং কৈশোর অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হলেও তিনি ভারতের সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী ছেলেমেয়েদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘সুপার থার্টি ’(Super 30)। যার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ডিসকভারি চ্যানেলের প্রামাণ্য চিত্র ।  আনন্দ কুমারের জীবন এবং এই ‘সুপার থার্টি’ এর উপর ভিত্তি করেই বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা ঋত্বিক রোশনের ছবি ‘সুপার থার্টি’  তৈরি হয় । আনন্দ কুমারের পরামর্শেই এই ছবির নাম রাখা হয় ‘সুপার থার্টি’ । যেটা গত বছরই জুলাই মাসে মুক্তি পেয়েছে এবং বক্স অফিসে এক সপ্তাহের মধ্যেই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে । এই সুপার থার্টির জন্যই  আনন্দ কুমার লিস্ট অব দ্যা বেস্ট এশিয়া ২০১০ এ নাম লেখান । এই সুপার থার্টির জন্যই আনন্দ কুমার বিভিন্ন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা পেয়েছেন ।

সুপার থার্টির জন্যই যখন আনন্দ কুমারের এতো সুনাম, তাহলে কি এই সুপার থার্টি? সুপার থার্টি মূলত ভারতের পাটনায় অবস্থিত আনন্দ কুমারের ‘রামাঞ্জুন স্কুল অব ম্যাথমেটিকস’ কোচিং সেন্টারের এর একটি কোচিং প্রোগ্রাম । যেই প্রোগ্রামের অধীনে ভারতের সুবিধাবঞ্চিত, চরম মাত্রায় দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের ফ্রি কোচিং,বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও তাদের বিনা মূল্যে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে  । প্রতি বছর একটি নির্বাচনী টেস্টের মাধ্যমে তিনি ৩০ জন দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে নির্বাচন করেন যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে ও ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট ‘ ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’ পড়ার স্বপ্ন দেখে ।  তিনি এক বছর  ধরে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ তাদেরকে ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট ‘ ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’ এর JEE (Joint Entrance Examination) তে ভর্তির জন্য কোচিং করে থাকেন । যেখানে আমাদের দেশে কোচিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষা বাণিজ্য চলছে দেধারছে, সেখানে আনন্দ কুমারের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থসহ ফ্রি কোচিং!

কিভাবে আনন্দ কুমার এই সুপার থার্টি গড়ে তুললেন ? শুরুটা আনন্দ কুমারের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না । তিনি নিজেও ছিলেন একজন সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র মেধাবী ছাত্র ।বাবা একজন পোস্ট অফিসের ডাক পিয়ন । আনন্দ কুমারের মাধ্যমিক পাশের পর আনন্দ কুমারের বন্ধুরা যখন আরও ভাল কলেজে পড়াশুনার জন্য দিল্লি যেতে থাকেন তখন আনন্দ কুমার অনেক ভাল ছাত্র হওয়ার পরও পাটনাতেই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলেন । উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পরও অর্থাভাবে তিনি পাটনা থেকে দূরে কোথাও আরও উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠাতে পড়াশুনার সুযোগ পান নি ।  পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যান । এখানে গ্রাজুয়েশন চলা কালে তিনি নাম্বার থিওরির উপর জার্নাল পাঠান ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে । এই কাজে অসাধারণ মেধা ও দক্ষতার পরিচয় পেয়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশনের জন্য তিনি প্রস্তাব পান । কিন্তু প্লেনের টিকিটের টাকা জোগাড় করতে না পারার কারণে তাকে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশুনা শেষ করতে হয় । অর্থাভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার এই কষ্ট তাকে বেশ ভাবিয়েছে ।

পরবর্তীতে তার জীবনের এই ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে তার বাবা মারা যান । তার বাবা মারা গেলে তিনি আরও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান । কি করবেন এখন? তাদের সংসার চলবে কি করে? এসময় ১৯৯২ সালের দিকে তার মাকে সংসার চালাতে সাহায্য করার জন্য তিনি রামাঞ্জুন স্কুল অব ম্যাথমেটিকস নামে একটি কোচিং সেন্টার গড়ে তোলেন, যেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রদেরকে গণিতে কোচিং দেয়া হয় । এসময় তিনি ৫০০ রুপি ভাড়ায় একটি কক্ষ নেন যেটি কোচিং এর জন্য ক্লাসরুম হিসাবে ব্যবহার করা হত । প্রথম অবস্থায় তার মাত্র ২ জন ছাত্র ছিল । এর পর বছর গড়াতেই ছাত্র সংখ্যা ৩৬ হয় । এর তিনি বছর পর তার ছাত্র সংখ্যা ৫০০ এর অধিক হয়ে যায় ।

এরপর ২০০০ সালের দিকে যখন গরীব কিন্তু বেশ মেধাবী কিছু ছাত্র আসতে থাকে যারা ‘ ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’ এর JEE (Joint Entrance Examination) কোচিং এর খরচ বহন করতে পারবে না কিন্তু ভাল মতো নির্দেশনা পেলে বেশ ভাল করতে পারবে । যারা প্রতিভাবান, মেধাবী কিন্তু অনেক দরিদ্র তাদেরকে কিভাবে সুযোগ দেয়া যায় এই চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো । এই সুবিধাবঞ্চিতদের কথা মাথায় রেখে ২০০২ সালে তিনি সুপার থার্টি (Super 30) প্রোগ্রাম চালু করেন । যার জন্যই মূলত তিনি এখন এতো জনপ্রিয় । ২০০২ সাল থেকে প্রতিবছর মে মাসে তিনি রামাঞ্জুন স্কুল অব ম্যাথমেটিকস এর অধীনে নির্বাচনী পরীক্ষা নেন । এর মাধ্যমে ৩০ জন মেধাবী কিন্তু দরিদ্র এবং সুবিধা বঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রী বাছাই করেন যারা ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ার স্বপ্ন দেখে । তিনি তাদেরকে এক বছরের জন্য ফ্রি কোচিং, বিনা মূল্যে সমস্ত শিক্ষা উপকরণ প্রদান এমনকি তাদের থাকা-খাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করেন । তার মা জয়ন্তী দেবী সেই বাচ্চাদের জন্য খাবার রান্না করেন এবং তার ভাই প্রণব কুমার তাদের দেখাশুনা করেন ।

২০০২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি যে ৪৮০ জন ছাত্রকে বিনা মূল্যে কোচিং দিয়েছেন তাদের মধ্যে ৪২২ জনই ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’ এর JEE (Joint Entrance Examination) তে উত্তীর্ণ হয় এবং ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’ ভর্তি হন । যাদের রাস্তায় টোকাই বা ফেরিওয়ালা হবার কথা অথবা ছোট-খাটো কোন পেশায় ঢোকার কথা সেই সুবিধাবঞ্চিতদের তিনি কিভাবে ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার পথ তৈরি করছেন । ভাবতে অবাক লাগে ।

ভারতের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আপনার বাবা মারা যাবার পর আপনি কিভাবে নিজেকে এই অবস্থানে নিয়ে এলেন । জবাবে তিনি বলেন – বাবা মারা যাবার পর বাবার একটা কথা আমার সব সময় মনে হত যা বাবা প্রতিদিন আমাকে বলতেন-“ কখনও সাহস হারিয়ো না । সমস্যার মোকাবেলা কর সমস্ত শক্তি দিয়ে । তুমি যে ক্ষেত্রেই কাজ করো না কেন মনোযোগ দিয়ে কাজ কর । সমস্ত শক্তি এবং উদ্যম নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও । যদি তুমি শিক্ষক হতে চাও তাহলে তোমার জায়গায় তুমি সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ কর । যেই কাজ করো না কেন সেটা পারফেকশনের সাথে করার চেষ্টা কর । দুনিয়ার নাম্বার ওয়ান হবার চেষ্টা কর । কখনও ভেঙ্গে পড়ো না এবং কখনও হাল ছেড়ে দিও না ।” বাবার এই কথা আমাকে অনেক সাহস জোগায় ।

তিনি তার ছাত্রদেরকে পড়ানোর পাশাপাশি বড় স্বপ্ন দেখান । তাদের জন্য মোটিভেশনাল মেনটর হিসাবেও কাজ করেন । তিনি তার সুপার থার্টির ছাত্রদেরকে সব সময় বলেন “ আব রাজাকা বেটা রাজা নেহি বানেগা, হকদারি রাজা বানেগা ।” অর্থাৎ ‘এখন রাজার ছেলে রাজা হবে না, যোগ্য যে সেই রাজা হবে ।’ তিনি সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্নকে আরও সান দেন নানা ধরণের মোটিভেশনাল বক্তব্যের মাধ্যমে ।

অবশ্য ‘আব রাজাকা বেটা রাজা নেহি বানেগা, হকদারি রাজা বানেগা’ এই বক্তব্যের জন্য নানা ধরণের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে । সমাজের কিছু প্রভাবশালী মানুষ চাচ্ছিল না যে সমাজের এক কোণে পড়ে থাকা অবহেলিত সুবিধাবঞ্চিতরা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আসীন হোক । তাই তারা তার এই সুপার থার্টির কাজেও বাঁধা দেয়া শুরু করলো । বিশেষ করে যখন আনন্দ কুমারের জীবনী নির্ভর ‘সুপার থার্টি’ ছবির পরিকল্পনা হয় তখন তিনি বিভিন্নভাবে বাঁধার সম্মুখীন হন । তার ভালো চান না এরকম কেউ কেউ তাকে এই ছবি বানাতে নিষেধ করেন । এই সময় তার ভাইকে এলাকায় এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় । কিছু লোক তাকে উঠে নিয়ে যায় । আবার ট্র্যাক চাপা দেবারও চেষ্টা করে ।

এক টিভি সাক্ষাৎকারে তাকে এই বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন এই সময়ও আমার বাবার কথা মনে পড়তো । বাবা বলতেন –“যত বড় ভিলেন তোমার সামনে আসবে তার চেয়ে বড় হিরো তোমার পাশে দাঁড়াবে । তুমি শুধু ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যাও ।”

সুপার থার্টির এই মহান কাজের জন্য তিনি কারও কাছ থেকেই কোন সহায়তা নেন না । রামাঞ্জুন স্কুল অব ম্যাথম্যাটিকসের আয় দিয়েই এটার ব্যয় নির্বাহ করেন । সুপার থার্টির সাফল্যের পর অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সরকারী এবং বেসরকারি সংস্থা সহায়তার জন্য এগিয়ে আসলেও তিনি তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এখনও করেন । এমনকি সুপার থার্টির ওয়েব সাইট (www.super30.org )এ ঘোষণা দেয়া আছে “No Donation Please”. তার এই কাজ দেখে আমার শুধু মনে হয় আমাদের দেশেও কেন এমন আনন্দ কুমার তৈরি হয় না; যার জীবনের উদ্দেশ্যই হবে মানব সেবা । “জীবে প্রেম করে যেই জন/ সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।” এই মুহূর্তে Samuel Taylor Coleridge এর সেই কথা খুব মনে পড়ছে – 

“He prayeth best, who loveth best
All things both great and small;
For the dear God who loveth us,
He made and loveth all.”

লেখকঃ শারমিন আকতার, সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন