উদ্ভিদবিজ্ঞান কেন পড়ব? উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়ে হতাশা নয়!

এ টি এম রফিকুল ইসলাম

আমরা যারা উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়তে এসেছি বা পড়ছি তাদের মধ্যে ২-১ জন ব্যতিক্রম ছাড়া কেউই নিজের ইচ্ছায় অথবা এই বিষয়টিকে একান্ত ভালোবেসে পড়তে আসিনি; আমরা যারা এই বিষয়টি পড়তে এসেছি তাদের বেশিরভাগ ছাত্র/ছাত্রিই ডাক্তার হবার স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেল ভর্তি কোচিং করেছিলাম। কিন্তু মেধা আর ভাগ্য একসাথে ক্লিক না করার কারণে এম. বি.বি.এস. কিংবা অন্য কোন বিষয়ে চান্স না পেয়ে একান্ত বাধ্য হয়েই বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের এই বিষয়টিতে পড়তে এসেছি। কিন্তু সত্যি কি আমরা ভুল করেছি? আমার উত্তর না; একদমই ভুল হয়নি; বরং ভালই হয়েছে।

এবার আসি, কেন ভাল হয়েছে? তার ব্যাখ্যায়।
হুম, যদি এম.বি.বি.এস এ চান্স পেতাম সেটা ভাল হত কিন্তু তার মানে এটা নয় যে উদ্ভিবিজ্ঞানে চান্স পেয়েছি এটা খারাপ, বরং আমি বলব ভাল। কেন ভাল? আর কেন খারাপ নয়; সেটা পরে বলছি।
তার আগে বাংলাদেশের জব সেক্টর নিয়ে একটু আলোচনা করি।
বাংলাদেশের পেক্ষাপটে জব মার্কেটগুলো সাব্জেক্ট নির্ভর নয়। আমাদের দেশের জব মার্কেট বলতে বুঝি ১. সরকারী জব ২. বেসরকারি জব।

১. সরকারী সাধারণ জবগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। বিশেষ জবগুলো সাব্জেক্ট রিলেটেড। অর্থাৎ সাধারণ সরকারী জব যেমন বি.সি.এস. (ক্যাডার), পিএস সি নন ক্যাডার জব, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, শিক্ষকতা (প্রাইমারি) সরকারি ব্যাংক- বীমা(বাংলাদেশ ব্যাংক,সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, কৃষি, বিডিবিএল, কর্মসংস্থান, আনসার বিডিবি, আরো কিছু স্পেশালাইজড ব্যাংক ), ইত্যাদি এগুলোতে সব সাবজেক্ট এর শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পায়। একজন শিক্ষার্থী বাংলায় কিংবা ইতিহাসে পড়েও এডমিন ক্যাডারে ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা পুলিশ অফিসার অথবা ফরেন ক্যাডার হয়ে থাকে, আবার একজন কম্পিউটার সায়েন্স অথবা ফিজিক্সে পড়া শিক্ষার্থী, এমনকি এমবিবিএস পড়ুয়া ডাক্তার কিংবা বুয়েটে পড়া ইঞ্জিনিয়াররা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ফরেন ক্যাডার, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা পুলিশ অফিসার হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়েও আমরা এইসব বিসিএস ক্যাডারভুক্ত চাকরিগুলো পেতে পারি। সাইন্স ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ায় খুব সহজেই উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিযোগিতামূলক এই পরীক্ষায় অন্যান্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে।
আবার এমন অনেক আছেন যারা বাংলায় কিংবা ইতিহাসের মত বিষয় পড়েও উল্লেখিত সরকারি ব্যাংকগুলোতে চাকুরী করছেন। বরং সরকারি ব্যাংকিং জবগুলোতে বিবিএ কিংবা এমবিএর স্টুডেন্টরা খুব কম পরিমাণে চাকুরি পাচ্ছে। তোমাদের কারো বিশ্বাস না হলে একটু যাচাই করে দেখলেই দেখতে পাবে। আমি দেখেছি, একটি সরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮৫ পার্সেন্ট স্টুডেন্ট আসে সাইন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে, ৫ % বাণিজ্য অনুষদ থেকে এবং বাকি ১০% পার্সেন্ট আসে কলা ও সোশ্যাল সাইন্স এর অন্যান্য অনুষদ থেকে। এবং উল্লেখিত এই ব্যাংকগুলোতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ায় খুব সহজেই চাকরি পাচ্ছে।
এবার আসি সাবজেক্ট রিলেটেড সরকারি জবগুলো নিয়ে। সাবজেক্ট রিলেটেড সরকারি জবগুলো প্রত্যেক বিষয়ের জন্যই আলাদা আলাদা। উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়ে কেউ যেমন আইটি কর্মকর্তা কিংবা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে না, তেমনি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও কেউ বন কর্মকর্তা কিংবা বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম এর ট্যাক্সনোমিস্ট হতে পারে না। এ ধরনের কিছু কিছু জব, সাবজেক্ট স্পিসিফিক হয়ে থাকে এবং এদের বিজ্ঞাপনেও সাবজেক্টগুলোর নাম উল্লেখ থাকে। কাজেই এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক সাবজেক্টের জব প্রার্থীদের জন্যই নিজ নিজ ফিল্ডে কাজ করার সমান সুযোগ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, সরকারি কলেজগুলোতে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক, এই পদগুলো সবার জন্য subject স্পেসিফিক ।

২. এবার আসি বেসরকারি জব সেক্টরে, বেসরকারি জব সেক্টরগুলো কিছুটা বিষয়ভিত্তিক। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবিএ, এমবিএ, সাইন্সের কিছু স্পেসিফিক সাবজেক্ট যেমন গণিত,পরিসংখ্যান এই বিষয়গুলোর কোয়ালিফিকেশন উল্লেখ করে দেয়। এক্ষেত্রে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা অনেকটা কম। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা দেশের নামকরা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গুলোতে খুব সহজেই চাকরি পেতে পারে। তেমনি ভাবে অন্যান্য বেসরকারি জবগুলোতেও এন্ট্রি করতে পারে। বেসরকারি জব প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়। সেক্ষেত্রে entry-level এ প্রবেশ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যে কেউ পরবর্তীতে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারে। এছাড়া বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে শুধুমাত্র উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয় পড়েই শিক্ষকতার চাকুরি নিতে হয়। এছাড়া এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সকল বিষয়ের সমান সুযোগ রয়েছে।

এবার বিষয়টি আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করি। ঢাকা,রাজশাহী, ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের যেকোনো একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরিপ চালানো হলে এটা দেখা যেতে পারে যে, উক্ত ব্যাচের প্রায় ৯৫% শিক্ষার্থী সরকারি জব করছে। বাকি ৫% ভাগ শিক্ষার্থীরা বেসরকারি জব কিংবা ব্যবসা করছে। এই ৯৫ পার্সেন্ট সরকারি জবের মধ্যে ১০-১৫% বিসিএস ক্যাডার(এডমিন, পুলিশ, শিক্ষক ও অন্যান্য, ২-৩% বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ২-৩% গবেষক (দেশে বা বিদেশে), বড় একটা অংশ সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং সরকারি মাধ্যমিক ও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। বেসরকারি জব করা ৫ পার্সেন্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই এমপিওভুক্ত স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক।

এবার আসি যারা ২-৩% (দেশে বা বিদেশে) গবেষক; তাদের প্রসংগে, এই জায়গাটিতে বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের অন্য বিষয়ের সাথে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ের অপারচুনিটির তুলনা করলে দেখা যায় যে, আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তখন আমার বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজী, ফার্মাসিতে পড়ুয়া বন্ধু-বান্ধবীরা উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়কে একটু আড়চোখে দেখত অর্থাৎ নেগলেক্ট করত। কিন্তু এইসব বিষয়ের তুলনায় দেশের চাকুরির বাজারে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের চাকুরীর সুযোগ সুবিধা অনেকগুণ বেশি। তেমনি ভাবে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে এবং সফলতার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী যেহেতু জেনেটিক্স, এগ্রিকালচার, মলিকুলার বায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্লান্ট ফিজিওলজি, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইকোলজী এন্ড এনভাইরনমেন্ট বিষয়গুলো অধ্যায়ন করে তাই এ বিষয়গুলোতে সে খুব সহজেই ( বিদেশে এই বিষয়গুলোর অনেক অপারচুনিটি আছে) বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত রেখে নিজেকে গবেষণায় নিয়োজিত রাখতে পারে। এই সুবিধা বাণিজ্য কিংবা কলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নাই বললেই চলে। বাণিজ্য কিংবা কলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা হাজারো চেষ্টা করে বিদেশে একটি স্কলারশিপ ম্যানেজ করতে হিমশিম খায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়, যেখানে বায়োলজিক্যাল সাইন্সের বিশেষ করে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী খুব সহজেই জাপান, ইউরোপ, কিংবা আমেরিকার মত দেশে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

এক্ষেত্রে, এমবিবিএস পড়ুয়া ডাক্তারদের একটু পিছিয়েই রাখতে চাই। আমি দেখেছি বাংলাদেশের এমবিবিএস পড়ুয়া অনেক ডাক্তার সরাসরি পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হতে পারেন না, প্রথমে তাদের এম এস করতে হয়। এবং তারা আমদের মতই বায়োকেমিস্ট্রি, মলিকুলার বায়োলজি বা জীন নিয়ে গবেষণা করেন। এক্ষেত্রে একটি বিষয় জানা উচিত যে, আমরা উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়লেও পরবর্তীতে উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী যে কোন বিষয়েই সেলুলার ও মলিকুলার লেভেল এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারব, এবং পরবর্তীতে এই ফিল্ডে ক্যারিয়ারও ডেভলপড করতে পারব। আমার পরিচিত অনেক ভাই এবং আপুরা আছেন যারা উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করে এখন হিউম্যান সেল, এনভাইরনমেন্টাল সাইন্স নিয়ে কাজ করছেন; তাও আবার আমেরিকা,কানাডার, জাপান, ইটালির মত দেশে বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানে। আবার অনেকে এনভাইরনমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানে।

কাজেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে এবং গবেষক হওয়ার ক্ষেত্রে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের অপারচুনিটি অনেক ও বিশাল।
খুবই সংক্ষিপ্তভাবে, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয় অধ্যায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলাম। আশাকরি যারা উদ্ভিদবিজ্ঞানে পড়ছো, তোমরা আশাহত হবে না।
তবে একটি বিষয় মনে রাখবে এই পৃথিবীটা প্রতিযোগিতা মূলক। এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র যোগ্যতমরাই টিকে আছে এবং থাকবে। অর্থাৎ Struggle for existence & Survival of the fittest. প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম যেকোনো ধরনের নির্বাচনের ক্ষেত্রেই এই কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য।

লেখকঃ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি গবেষক

আরও পড়ুন