ভাবী! লাগবে?

ড. সালেহ মতীন

‘মসজিদের শহর’ ছাড়াও রাজধানী ঢাকার আরো অনেক পরিচয় ও উপাধি রয়েছে। যেমন, প্রাচীন নগরী, ব্যস্ততম নগরী, তিলোত্তমা নগরী ইত্যাদি। তবে ঢাকার আরেকটি পরিচয় ক্রমেই পরিস্ফূটিত হচ্ছে সেটা হলো, ‘প্রতিযোগিতার নগরী’। দিন-রাত এখানে প্রতিযোগিতা যেন ঢেউয়ের তালে আঁছড়ে পড়ছে। ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার গঠনের প্রতিযোগিতা নগরবাসীকে সর্বক্ষণ যেন তাড়া করে ফিরে! সবাই সবাইকে পাশ কাটিয়ে আরো সামনে যাওয়ার প্রতিযোগিতার মহড়া এখানে এখন প্রকাশ্যে দৃশ্যমান। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাটা অসম কিংবা অসৎ পর্যায়ও ছুঁয়ে যাচ্ছে বলে লক্ষ্য করা যায়।

স্কুলগুলোতে প্রতিযোগিতা যেন নানা রূপে নানা বর্ণে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে নিচের শ্রেণির কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রে এ প্রতিযোগিতা ধারণ ও লালন করে তাদের মায়েরা। রেজাল্ট ভালো করতে হবে, অমুকের উপরে উঠতে হবে ইত্যাদি অসম চিন্তাসমৃদ্ধ প্রতিযোগিতার মনোভাব শিশুদের আনন্দঘন শৈশব ও মায়েদের ঘুম যেন কেড়ে নিচ্ছে।

পিইসি পরীক্ষা প্রবর্তিত হওয়ায় এই প্রতিযোগিতা খানিকটা অগ্রবর্তী হয়েছে। ১০-১১ বছরের পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিশুদের উপর অভিভাবকের যে তাড়া কাজ করছে তাকে রীতিমতো অত্যাচার বলা চলে। বাজারের ২/৩ প্রকারের নোট বই ছাড়াও কোচিং এর নোট শীট এমনকি ভিন্ন ভিন্ন কোচিং এর নোট সংগ্রহ করে তা বেচারা শিশুদের পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপরও অবস্থা এমন যে, কোথাও কোন নোটের সন্ধান পেলে মায়েরা সেটা সংগ্রহ করার জন্য লাফিয়ে পড়ছে। ফটোকপির দোকানগুলো এখানে আরো একটু এ্যাডভান্স। তারা ভালো কোন নোট পেলে স্ক্যান করে রাখে যেটা আগ্রহী অভিভাবকদের কাছে পরে একটু বেশি মূল্যে বিক্রি করে। অনেক সচেতন অভিভাবক এখন ফটোকপির দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আছে নাকি মামা ভালো কোন নোট?”

রাজধানী ঢাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর মায়েদের একটি শক্তিশালী কমিউনিটি আছে যেখানে পড়ালেখার বাইরেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অনেক সুখ দুঃখের শেয়ারিং হয়। স্কুল আঙিনায় সে কমিউনিটিতে শুধু মায়েদের সদর্প বিচরণ। আর এখানে শিক্ষার্থীর বাবারা নিতান্তই অসহায়! মাঝে মাঝে ছেলেকে স্কুলে দিতে অথবা আনতে গেলে অভিভাবক মায়েদের হাস্যোজ্জ্বল আসরের পাশে কতক পুরুষের অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা দেখলে সত্যিই কষ্ট লাগে। এ অসহায় পুরুষের তালিকায় কখনো কখনো আমাকেও নাম লেখাতে হয়।

রাতিব রিদওয়ান, আমাদের পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া পুত্র। কিন্তু পরীক্ষা পুত্র নয় পুত্রের মা-ই দিবে বলে মনে হচ্ছে। আমি দুষ্টুমী করে বলি, “তুমি তো পিইসি পরীক্ষা দাওনি সুতরাং ছেলের সাথে দিয়েই ফেলো।” যেখানে যা পাচ্ছে কোন পিছুটান ছাড়াই তা সংগ্রহ করে ছেলের পড়ার রসদে যুক্ত করছে। এখানে স্কুলের ভাবী কমিউনিটির মধ্যে সহযোগিতা ছাড়াও পরোক্ষ প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান রয়েছে।

কয়েকদিন আগে ঘটেছে এক মজার ঘটনা। যানজটের কারণে স্কুলে পৌঁছাতে রাতিবের সেদিন ৫ মিনিট দেরি হলো। রাতিবের মা ছেলেকে স্কুলের গেটে ঢুকিয়েই লক্ষ্য করল তুলি ভাবী তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তাকে পেয়েই যেন তার শান্তি মিলল। “কী ব্যাপার ভাবী, কী হয়েছে?” “আরে ভাবী, কোথায় ছিলেন আপনি?” তুলি ভাবী আরো অনেক মায়ের সামনে তার কানের কাছে মুখ এনে বলল, “বিজ্ঞানের ভালো এক সেট নোট পাওয়া গেছে, লাগবে?” বাসায় তাড়া থাকায় দেখার বা যাঁচাই করার সুযোগ তখন ছিল না রাতিবের মায়ের। শুধু বলল, হ্যা ভাবী দেন, কত? “সত্তর টাকা”। মুহূর্তের মধ্যে একটি এ-ফোর সাইজের খামের হাত বদল হলো।

বাসায় গিয়ে বিজ্ঞানের ভালো মানের নোট সংগ্রহকারী মা খাম খুলে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। লেখাটা যেন চেনা চেনা লাগছে!

এ কি! এ তো আমারই ছেলের লেখা নোট! গত সপ্তাহে রাত জেগে আমার নোট করা বিজ্ঞানের এ অংশ ছেলেকে দিয়ে লিখিয়েছিলাম যার একসেট ফটোকপি নিয়েছিল রেখা ভাবী। তাকে বলেছিলাম কাউকে যেন না দেয়। তিনি অঙ্গীকারও করেছিলেন। অবশেষে নিজের ঘরে উৎপাদিত আমারই ছেলের হাতের লেখা নোট আমাকেই সত্তর টাকা দিয়ে কিনে আনতে হলো!

লেখকঃ কলামিস্ট ও বিশিষ্ট ব্যাংকার

 

আরও পড়ুন