করোনায় শিক্ষার হালচাল ও করনীয়!!!!

মোসা: নাছরিন সুলতানা

শিক্ষা একটি স্তর ভিত্তিক ও চলমান প্রক্রিয়া। একটা বিষয় এর সাথে অনেকগুলো বিষয় জড়িত ! কেউ চাইলেই এক কথায় এর সমাধান দিয়ে দিবেন এটা চিন্তা করাই বোকামি ছাড়া আর কিছুই না! এখানে কোন একটি বিষয় এর উপর নির্ভর করে কোন সমাধান করা যাবে না । অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখে সে আলোকে সমাধান করার চেষ্টা চালানো যাবে বলে আমি মনে করি। প্রায় আড়াই মাস হয়ে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ । আরও কতদিন বন্ধ থাকবে সেটাও অজানা। তাই বলে কিন্তু কিছুই থেমে নেই! তবে সবাই যে সকল সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে বা পাবে এর কোন গেরান্টি নেই! ইতিপূর্বে যে সকল পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো-

সরকারি ভাবে প্রথম শ্রেণি থেকে মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত বিটিভিতে “ঘরে বসে শিখি” নামে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে! এছাড়া সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করার নির্দেশনা রয়েছে! এটা পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন Apps এর মাধ্যমে।

এখন প্রশ্ন হলো এটা কতটুকু কার্যকর এরং কতটুকু হচ্ছে?
এতেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যেমন কতজন শিক্ষক বা শিক্ষার্থী এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে? এটা শুধুমাত্র বিভাগীয় শহরগুলো কেন্দ্রিক চিন্তা করলে হবে না, সারা বাংলাদেশের কথা চিন্তা করতে হবে! দেখা যাচ্ছে এখনো এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে কারেন্ট নেই, নেট এর লাইন নেই, শিক্ষার্থীদের বা তাদের অভিবাবকদের কাছে স্মার্ট ফোন নেই! তাদেরকে কি করে এর অন্তর্ভুক্ত করা যাবে? এটা যে শুধু শিক্ষার্থীর বেলায় তা কিন্তু নয় শিক্ষকও আছেন তাদের দলে! সেটা ঐ গ্রাম এর কথা বাদ দিলাম, এই ঢাকা শহরেও এমন অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এর শিক্ষক আছেন যিনি একটা ফেইসবুক চালাতে পারেন না, বা চালান না তিনি কি করে অনলাইন ক্লাস নিবেন? সরকারের পক্ষ থেকে সবসময় বলা হচ্ছে মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস নেওয়ার জন্য, বেশিরভাগ শিক্ষক নিচ্ছেনও তবুও সেটা পর্যাপ্ত নয় এই অনলাইন ক্লাস পরিচালনার ক্ষেত্রে! তাই বলে তো আর বসে থাকা যাবে না! তাই আমার যেটা করতে পারি এই সময়ের জন্য সেটা হচ্ছে-

১। যেহেতু বছরের প্রায় ছয় মাস চলে গেছে তাই বার্ষিক পরীক্ষার কথা চিন্তা করে সিলেবাস একটু কমানো যায়!

২। সে সকল জায়গায় বা  যে সকল শ্রেণির জন্য অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে তারা সেভাবেই চালিয়ে যাবেন এবং যাদের সুযোগ আছে কিন্তু করছেন না তারা অবশ্যই করবেন!

৩। যে সকল এলাকা এগুলোর সুযোগ নেই কিন্তু অন্তত মোবাইল আছে সেখানে শিক্ষকরা ফোনে শিক্ষার্থীদের এক সপ্তাহের পড়া একসাথে দিবেন এবং মনিটরিং করতে পারেন!

৪। যারা অর্থের অভাবে এ কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করতে পারছেন না তাদেরকে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে সাহায্য দেওয়া যেতে পারে; যেমন একটা ফোন কিনে দেওয়া বা ইন্টারনেট এর খরচ দেওয়া!

৫। সরকারি ভাবে বা বেসরকারি ভাবে আরো একটা কাজ জরুরি করা দরকার বলে আমি মনে করি, সেটা হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটা নেটওয়ার্ক সার্ভিস চালু করা যার রেট হবে নামে মাত্র; সরকার প্রয়োজনে ভর্তুকি দিবেন তবুও চালু করা অন্তত এই বিশেষ সময়ের জন্য! আর বেসরকারি ভাবে কেউ বা কোন বড় বড় কোম্পানি এগিয়ে আসলে তো আর কোন কথাই নেই!!

৬। আর এক‌টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সচেতনতা এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিবাবক এই তিন স্তরকে সচেতন হতে হবে।

শিক্ষক এর ইচ্ছা থাকতে হবে যে সে তার শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন এবং তাদের পাঠ চালিয়ে যাবেন তা হলে উনি নিজেই হাজার উপায় বের করতে পারবেন । কারণ প্রত্যেকটি শিক্ষকই সবচেয়ে ভাল জানেন তার শিক্ষার্থীর অবস্থা। তাদের কি ধরনের সাপোর্ট দিয়ে শিক্ষার আওতায় আনা যাবে । যদি তারা কোন সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বলতে পারেন যে এ সাপোর্ট পেলেই  তার শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনা করতে সমস্যা নেই; সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান এর পক্ষে সম্ভব হলে তার সমাধান করা, তারা না পারলে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে সাহায্য করা! প্রতিটা প্রতিষ্ঠান যদি আলাদা ভাবে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করার চেষ্টা করে তা হলে আমরা মনে হয় বেশি সময় লাগবে না এই সমস্যা উতরে যেতে এবং খুব একটা কষ্টও হবে না। কারণ সরকারি ভাবে ছাড়াও প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে কিছু দাতা সদস্য থাকেন । এছাড়া এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তি আছেন যাদের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানও আছে যারা শিক্ষা ক্ষেত্রে সহায়তা দিচ্ছেন! তাদের কাছ থেকেও সাহায্য নিতে পারেন।

তারপর অভিবাবকের এখানে একটা বড় ভুমিকা আছে। শিক্ষার্থীদের অবস্থা অনুযায়ী তাদেরও ইচ্ছা শক্তি থাকতে হবে; যেমন প্লে, নার্সারি, কেজি এগুলো কোন ফর্মাল এডুকেশন নয় তাই এদের তেমন চাপ না দেওয়াই ভাল । এরা একই ক্লাসে আগামী বছর থাকলেও কোন সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু ক্লাস ওয়ান থেকে একটু চিন্তা করা যায় যেহেতু এখানে দুই বছর রাখা যাবে না সিস্টেম এর কারণে। তাই সকল অভিবাবকও চিন্তা করতে পারেন কি ভাবে বাচ্চাদের মানসিক চাপ না দিয়ে পড়াশোনার মধ্যে রাখা যায়? যেহেতু বেশিরভাগ অফিস বন্ধ তাই বাবা মা নিজেরাও বাচ্চাদের একটু সময় বেশি দিতে পারেন! বাবা মার কাছে বাচ্চারা বেশি আনন্দ নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়, সেটা কাজে লাগাতে পারেন। আবার যাদের ফোন নেই বা নেট নেই বলছেন তারাও চাইলে এটা মেনেজ করতে পারেন;  যেমন বাচ্চা স্কুলে গেলে তার রিকশা ভাড়া, খাওয়া, কাগজ কলম ইত্যাদি অনেক টাকা খরচ হতো যা এখন লাগছে না, চাইলে সেগুলো কাজে লাগাতে পারেন আবার দু’একজন চাইলে স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে স্কুল এর বেতন থেকেও সেটার ব্যবস্থা করতে পারেন যদি সংখ্যায় কম হয়! মোট কথা অভিবাবকগন যদি সচেতন হন এবং মনে করেন তাদের বাচ্চাদের অনলাইন ক্লাস এর আওতায় আনবেন তা হলে তারাও চাইলে উপায় বের করতে পারবেন!

যাদের জন্য এতো কিছু সেই শিক্ষার্থী!হ্যাঁ তাদেরও ভুমিকা আছে । তাদের আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকতে হবে ।সেটার জন্যও একটু সচেতনতার পদক্ষেপ নেওয়া যায় । যেমন টিভি, মিডিয়ায় এবং অনলাইনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ দেওয়া যায় অনলাইন ক্লাস এর গুরুত্ব দিয়ে। যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে তাদের নিজের জন্য এই অনলাইন ক্লাসগুলো দেখা বা শুনা জরুরি! যখন তারা অনুভব করবে তাদের এই ক্লাসগুলো জরুরী তখন তারাও উপায় বের করতে পারবে কি ভাবে তাতে অংশগ্রহণ করবে!

সর্বশেষে বলতে চাই এগুলো একমাত্র কোন সমাধান নয়, পরামর্শ মাত্র। আমার কাছে মনে হয়েছে এভাবে চেষ্টা করতে পারি, কারণ মহামারী সেতো মহামারীই । এটা বলে কয়ে আসে না যে সবাই আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে ! যে কোন দুর্যোগ যে কোন সময় হতে পারে । এটা কারও একার পক্ষে মোকাবেল করা সম্ভব নয়! এর জন্য দরকার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা! মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব! তাই মানুষ যদি সম্মিলিতভাবে চায় তাহলে কোন সমস্যাই সমস্যা নয়! মৃত্যু একমাত্র সত্য যার কোন সমাধান নেই! এছাড়া এমন কোন সমস্যা নেই যার কোন সমাধান নেই! কোন না কোন উপায় আছেই কারও না কারও কাছে । শুধু দরকার চরম ইচ্ছা শক্তি! সবাই যদি চেষ্টা করি তবে শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্যা কেন? সকল ক্ষেত্রের সমস্যা দূর করা যাবে ইনশাআল্লাহ!!!!!

লেখকঃ কলামিস্ট এবং  থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, লালবাগ, ঢাকা।

 

আরও পড়ুন