বিদেশে নারীর উচ্চশিক্ষা

পর্ব-১

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে উপমহাদেশের পুরুষদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাত্রাকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হতো। উচ্চবর্ণের হিন্দুদেরতো জাহাজে উঠলেই জাত গেলো রব উঠত। এরপরে ইংরেজদের সাথে তাল মিলিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুরা বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়াকে বিলেতে পড়তে যাওয়ার গর্বিত সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিদেশ পড়তে যাওয়ার ব্যাপারে জেন্ডার কোনো ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে কী? এই প্রশ্নের উত্তরটা একেবারে হ্যা বা না তে দেওয়া যায় না।কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুব বড় একটা কারণ হিসেবে কাজ করে। মোটা দাগে এক কথায় বলতে গেলে মেয়েদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা অবশ্যই সহজ কোন কাজ নয়।

ক্যারিয়ারের অন্যান্য গ্লাস সিলিংযের মতোই যারা একাডেমিক লাইনে যেতে চায় সেসব মেয়েদের জন্য ব্যাপারটা বেশ চ্যালেঞ্জিং; বলা যায় নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ করা।

এর সাথে কখনও কখনও ধর্মীয় বিধি-নিষেধ জড়িত; কখনও পারিবারিক শৃঙ্খলা দায়িত্ববোধও। কোন এক সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে একজন পুরুষ যেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আমি বিদেশ ডিগ্রি নিতে যাবো, ঠিক সেইভাবে একজন মেয়ে বলতে পারে কি না সেটা বিবেচনার দ্বায় পাঠকের কাছেই ছেড়ে দিলাম।

মেয়েরা উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে প্রচুর পরামর্শ চায় কিন্তু সামাজিক একটা সেটআপে পরামর্শ দেওয়াটাও অনেক সময় বেশ কঠিন।

একবার একজন খুব ভালো ছাত্রী যিনি নার্সিং থেকে পড়ালেখা করেছেন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কী করবেন?যে ছেলের সাথেই বিয়ের কথা হোক না কেন বিদেশ পড়ার আগ্রহ শুনলে কেউ আর আগাতে চায় না। বাউন্ডুলে ভবঘুরে ভাবে।

মেয়েদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তারা ভোগে এই এক ধরণের সমস্যায়, আর যারা বিবাহিত তারা ভোগেন অন্য আরেক জটিল ইকুয়েশনে। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা প্রফেসরদের চিনি যারা ইউরোপ আমেরিকায় পড়ার সুযোগ পেয়েও ভারতে পিএইচডি করেছেন কারণ আসা যাওয়াটা সুবিধা। ছুটি পেলেই দেশে এসে দায়িত্ত পালন করা যায়।এটা বললাম নারী প্রফেসরদের কথা; যাদের একটা নির্দিষ্ট চাকুরী সামাজিক অবস্থান থাকার পরেও দূর বিদেশে পাড়ি জমাতে পারেননি পড়ালেখার জন্য।

কথা হলো তাহলে কী মেয়েদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা উচিৎ না? উত্তরটা হলো অবশ্যই দেখা উচিৎ। তবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে একটা ছেলের চেয়ে কম করে হলেও দুই বছর আগে। মেয়েদের খুব লিমিটেড সময়ের মধ্যে জীবনের অনেক কিছু গুছিয়ে নিতে হয়। একটা ছেলে গতানুগতিক নিয়মে ৩২-৩৩ পর্যন্ত অবিবাহিত থাকলেও সমস্যা হয় না, কিন্তু একটা মেয়ে অবিবাহিত  থাকা নিয়ে কি বলব; ৩০ এর পরে মাতৃত্ব নিয়েও নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করে। ক্যারিয়ার করলে মাতৃত্বের দাবী পূরণ হয় না, মাতৃত্ব নিয়ে মেতে উঠলে ক্যারিয়ার অনেক সময়ই সুনামির ধাক্কা খায় । অনেকেই যা আর কোনোদিন সামলে নিতে পারে না। তাই যে কোনো মেয়েরই যার বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আছে তাকে ব্যাপারটা নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগেই ভাবতে হবে। সম্ভব হলে অনার্সে উঠার পর থেকেই জিআরই, আইএলটিএসের প্রিপারেশন নিতে হবে। যতো যাই হোক অনার্সের শুরুর দিকে কিছুটা হলেও ফেইসবুকি্‌ হ্যাঙ্গাউট, বন্ধুআড্ডা বাদ দিয়ে কিছু সময় এসব খাতে ব্যয় করা সম্ভব। এই সময়টাকে কাজে লাগানো, প্রো-এ্যাক্টিভিটি একটা মেয়ের ভাগ্য অনেকখানি বদলে দিতে পারে। (চলবে)

লেখকঃ কলামিস্ট, পিএইচডি গবেষক, হ্যাসেটটাইপ বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

 

 

আরও পড়ুন