আমার মায়ের বিয়ে

আব্দুল্লাহ আরমান

যতটুকু মনে পড়ে সেদিন খুব বৃষ্টি ছিলো। সকাল থেকে একটানা মুষলধারে বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম ঝমঝম শব্দ। বৃদ্ধ নানা চেয়ার নিয়ে বারান্দার এক কোণায় আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বসে ছিলেন। নানী রান্নাঘরে বসে একটু পরপর আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিলেন। আর আমার মা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে আছেন সেই সকাল থেকে। আমি বিছানায় উঠে মার পাশে শুয়ে বললাম, “মা ক্ষুধা লাগছে, খাইতে দাও…”। কথাটা বলতেই মা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন! তালাকের পর আমার আব্বার কাছ থেকে নানা যখন মা-কে নিয়ে আসেন তখনও তিনি এভাবে কাঁদেননি। মায়ের কান্নার কারণ সেদিন আমি বুঝিনি, বোঝার জ্ঞান আমার ছিলো না। তবে এতটুকু মনে আছে তারপর আর কখনও মা আমাকে এভাবে বুকে জড়াননি, জড়াতে পারেননি।

বিকেলে আমার কয়েক বছরের বড় মামাতো বোন ফারিহা আপুর সাথে পুতুল খেলছিলাম। আপু বললো আজ নাকি পুতুলের মতো আমার মায়ের বিয়ে হবে, বউ সাজিয়ে নতুন বাবা এসে মা-কে নিয়ে যাবে। পুতুলের বিয়ের সময় আনন্দ পেলেও মা’র বিয়ের কথা শুনে আনন্দ পেয়েছিলাম কি-না জানি না তবে দৌড়ে এসে মা’কে না পেয়ে নানীকে বললাম, “মা আমাকে নতুন বাবার বাড়িতে নিয়ে যাবে না?” কিন্তু আমার কথার জবাব না দিয়ে নানী আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় বললেন “আমি তোকে কোথাও যাইতে দিমু না-রে নানা ভাই….. ”
মা-কে দুপুরের পর থেকে আর দেখিনি। যাকেই জিজ্ঞাসা করি কেউ জবাব দেয় না। পরে শুনেছিলাম আমার কারণে যাতে সিনক্রিয়েট না হয় এজন্য পাশের বাড়িতে ঘরোয়া বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল।

নানী আমাকে খাইয়ে দিতে চেষ্টা করলেন, আমি নাছোড়বান্দার মতো মা-কে ছাড়া খাবো না বলে মুখ গোমরা করে বসে থাকলাম। নানী কান্না মাখা কন্ঠে অনেকক্ষণ কাকুতি-মিনতি করেও আমাকে খাওয়াতে না পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্লেট সামনে রেখে মন খারাপ করে চলে গেলেন। খুব ক্ষুধা পেয়েছিলো কিন্তু কি করে খাই, মা-কে ছাড়া কখনও খাইনি যে…..কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
ফারিহা আপুর ডাকে জাগা পেলাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি রাত হয়ে গেছে, বৃষ্টিও পড়ছে। ও বললো তাড়াতাড়ি ওঠ ভাই, তোর আম্মুকে নতুন বাবা নিয়ে যাচ্ছে, দেখবি চল! মনে হলো আমার কলিজাটা কেউ ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তৎক্ষনাৎ ওওও মা-ওওও মা বলে চিৎকার করতে করতে বাইরে এসে দেখি সাদা মাইক্রোটা নাগালের বাইরে চলে গেছে…..।

থমকে দাঁড়ালাম। বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকু হারিয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলাম। “মা আমাকে কেন একা রেখে গেলো” এই কথা ভেবে মুহূর্তেই যেন অভিমান আর কষ্টের পাহাড়ের চাপে বোবা হয়ে গেলাম। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগলো। মা-মা বলে ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করলেও কোনো এক অজানা কারণে তাও পারিনি…..।

সেদিন কেউ আমার চোখের অশ্রু মুছে দেয়নি, দিতে হয়নি। কারণ রাতের আঁধার আর অশ্রু ধোয়া বৃষ্টির জল সবার দৃষ্টি থেকে আমার কান্না গোপন করতে সাহায্য করেছিলো। নয়নের অশ্রু বিসর্জন গোপন করতে পেরেছি কিন্তু বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সাত আসমানের মালিক ঠিকই দেখেছেন।

নানা-নানী বৃদ্ধ মানুষ। আর্থিকভাবে তারা নিজেরাই মামার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তবু সামর্থ্যানুযায়ী তারা আমার দেখভাল করতেন। মায়ের বিয়ের কয়েকমাস পর নানার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে-দুঃখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থেকে বছর খানেক পর নানীও ওপারে চলে গেলেন। মৃত্যুর আগে আমাকে মামার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “বাবা, ওর বাপ-মা থাইকাও নাই। ওরে দেইখা রাখিসরে বাপ….”।
নানীর মৃত্যুর পর আমার দূরন্ত বাল্যকাল আরও বাঁধনহারা হয়ে গেলো। পুকুরে ডুবে চোখ লাল করলেও শাসনের কেউ ছিলো না, স্কুলে না গেলে কারও মাথাব্যথা ছিলো না, না খেয়ে দিন পার করলেও কেউ বলতো না “আয় বাবা খেয়ে নে”। খুব ক্ষুধা লাগলে ভয়ে ভয়ে মামীকে বলতাম। এক প্লেট ভাতের সাথে তরকারি বেশী না থাকলেও বকুনিটা থাকতো পর্যাপ্ত পরিমাণ। মামাতো ভাইবোনদের সাথে আমার খাবার প্লেট আর গায়ের পোশাকের বৈষম্যে স্পষ্ট বার্তা ছিলো “আমি এ বাড়ির আগাছা মানব”।

একদিন কোলে একটা শিশু নিয়ে মা আমাকে দেখতে এলেন। শুনলাম বাবুটা নাকি আমার নতুন ভাই। মায়ের বুকে ওকে দেখে খুব ঈর্ষা হচ্ছিলো। তবে এতদিন মায়ের অনুপস্থিতিতে বুঝে গিয়েছিলাম মায়ের ঐ বুকে জায়গা পাওয়ার অধিকার আমার আর নেই! মা আমাকে খুব কাছে টানার চেষ্টা করতেন। আমাকে দেখে খুশীতে হাসতেন কিন্তু সে হাসিতে থাকা কান্নার স্পষ্ট ছাপ আমার চোখে ঠিকই ধরা পড়তো। সরাসরি মা’র দিকে তাকালে কেন জানি লজ্জা লাগতো, তাই আড়ালে গিয়ে সবার অগোচরে মা’র দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। মন চাইতো মা’কে জড়িয়ে ধরে বলি “ আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও, আমি এখানে খুব কষ্টে আছি মা….”। কিন্তু বলতে পারিনি, কঠিন নিয়তি আমাকে তা বলতে দেয়নি।
আমার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য, অপরিচ্ছন্ন কাপড় ও শরীর দেখে মা বুঝতে পেরেছিলেন আমি ভালো নেই। মা মামাকে বলে আমাকে আমাকে মাদরাসার ‘ইয়াতীমখানায়’ ভর্তি করতে নিয়ে গেলেন। প্রকৃত পিতৃহীন ইয়াতীম না হওয়ায় আমাকে প্রধান শিক্ষক ভর্তি নিতে না চাইলেও মায়ের কাকুতি মিনতিতে অবশেষে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে আমার তিনবেলা খাওয়া,থাকা আর পড়ার ব্যবস্থা হলো।
যাওয়ার সময় কিছু টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে মা ভেজা কন্ঠে বললেন “ যার কেউ নাই, তার আল্লাহ আছে। আল্লাহই এখন তোর সবকিছু, তাই তোকে আল্লাহর হাতেই দিয়ে গেলাম। মন দিয়ে পড়িস বাবা….”

মায়ের শেষ বাক্যটা মনে গেঁথে গেলো। পূর্ণ উদ্যমে পড়ালেখা চালিয়ে গেলাম। খাতা-কলম কিনতে বড় হুজুর দু-চার টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন। ইয়াতীমদের জন্য আসা অনুদানের কাপড়ে তৈরী হতো আমার পাঞ্জাবি। মাদরাসা ছুটি হলে যাওয়ার জায়গা না থাকায় মামার বাড়ি যেতাম। কিন্তু আমি গেলেই সবার অস্বস্তি ছিলো চোখে পড়ার মতো। কোনমতে খাওয়ার ব্যবস্থাটা হলেও থাকার জায়গা নিয়ে বিপাকে পড়তাম। মামীর চোখেমুখে বিরক্তি আর আড়চোখের দৃষ্টি দেখে বুঝলাম আমার অযাচিত আগমন তার কাছে বাড়তি ঝামেলা। তাই একসময় ওখানে যাওয়াও ছেড়ে দিলাম। মাদরাসাই ছিলো আমার বাড়ি, মাদরাসাই একমাত্র ঠিকানা…….।
★★★

৫০ বছর বয়সে মা মারা গেছেন বছরখানেক হলো। মৃত্যুর আগে নাকি শেষবারের মতো বারবার আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন। তবে অন্তিম দেখা হয়নি…..কর্মস্থল থেকে যখন জীবনে প্রথমবারের মতো মা’র (স্বামীর) বাড়ি পৌঁছাই ততক্ষণে তিনি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। মা’কে দেখলাম, খুব কাছ থেকে প্রাণ ভরে দেখলাম। মায়ের বিয়ের দিন মাতৃ-বিচ্ছেদের কষ্টে নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলেও এবার আমি কাঁদলাম, মা- মা বলে শিশুর মতো কাঁদলাম….।

প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে। মা’র কথা ভেবে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। ছোটবেলার মতোই বৃষ্টির জল আমার চোখের অশ্রু ধুয়ে দিচ্ছে…। ফরিদা ( আমার সহধর্মিণী। আমার মতোই নানার বাড়িতে অনাদরে বেড়ে ওঠা ডিভোর্সি মা-বাবার সন্তান) আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ওর হাত দিয়ে আমার দু-চোখ মুছে দিলো। বৃষ্টির জল ও চোখের অশ্রুর পার্থক্য ও ঠিকই বোঝে। হয়তো আগাছার ন্যায় জীবনযাপন করতে গিয়ে আমার মতোই ওর সাথে বৃষ্টি আর অশ্রুর গভীর মিতালী হয়েছে…..।

ও আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বুকে মাথা গুঁজে থেকে মুখ তুলে বললো, “আপনাকে পেয়ে জীবনে প্রথম সুখের দেখা পেয়েছি। জীবনে চলার পথে ভুল হলে ভালোবাসা ও শাসন দিয়ে আমাকে শুধরিয়ে দেবেন। কথা দিন কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমি চাই না আমাদের ভুলে আমাদের সন্তান আমাদের মতো বৃষ্টির পানিতে চোখের অশ্রু আড়াল করুক……।
(গল্প ও চরিত্র কাল্পনিক)

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক ও অনলাইন আক্তিভিস্ত

আরও পড়ুন-বাবা

আমার মায়ের বিয়ে – আমার মায়ের বিয়ে – আমার মায়ের বিয়ে

আরও পড়ুন