ফেসবুকীয় ভালোবাসা

মোর্শেদা হোসেন রুবি

আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী।আমার বিয়ের আজ সাত বছর পূর্ণ হল!অবশ্য আমাদের সম্পর্কের বয়স আরো বেশী। বিয়ের আগে প্রেম করেছি তিন বছর। তারপর বিয়েটা পারিবারিকভাবেই হয়েছ।।মেরাজ এর সাথে প্রেমটা আসলে ঠিক প্রেম ভেবে করা হয়নি। এক দুর্দান্ত আকর্ষণ ছিলো শুরু থেকেই। মেরাজ আমার আপন ফুপাত ভাই। ছোটবেলা থেকেই দুজনের খুনসুটি বেশ জমতো। ও আমাকে দেখলেই বেণী ধরে টান দিয়ে বলতো,” কিরে, কেমন আছিস? যা দেখি, তোর গ্রামার বইটা নিয়ে আয় ! টেন্স টা একটু ধরি! দেখি কেমন পারিস!”

আমি তখন সবে ফ্রক ছেড়ে স্কার্ট ধরেছি। লজ্জা নামক বস্তটার সাথে তখন নতুন সখ্যতা হয়েছে। বলা নেই কওয়া নেই হুটহাট চলে আসে আর আমার গন্ডদেশ লাল করে দিয়ে চলে যায়। আর লজ্জাটা এমন সময়ই আসতো যখন কিনা মেরাজ ভাই আমাদের বাসায় আসত। মেরাজ ভাইয়ের ঠাট্টাগুলো তখন থেকেই বেশ ভোগাতো আমায়। সে চলে যাবার পরও মনের ভেতর সেসব স্মৃতি ঘুরপাক খেতে থাকত অনেকক্ষণ ধরে।

মেরাজ ভাইয়ের চোখের সামনে দিয়েই একটু একটু করে বড় হলাম। কৈশোর পেরিয়ে তারুন্য, তারপর বাঁধভাঙ্গা যৌবন।একদিন মেরাজ ভাই আমাকে ব্যাডমিন্টন খেলতে দেখে চোখ গরম করে ধমক দিয়ে বললো, ” কি রে লম্বা ঠ্যাং বের করে লাফিয়ে লাফিয়ে এসব কি খেলছিস?”

-” ব্যাডমিন্টন…!”

-” ওড়না নাই তোর ?”

-” আমি কি বড় হয়েছি নাকি যে ওড়না পড়বো?”

-” চটকনা মেরে বত্রিশটা দাঁত ফেলে দেবো। খালি পাকা পাকা কথা। যা, ওড়না পড়ে আয়। আর এখন থেকে স্যালোয়াড় কামিজ পড়বি। খাসির রানের মতো পা বের করে….!”

কথাটা খুব গায়ে লেগেছিল। না ঠিক গায়ে না, আঁতে লেগেছিলো। আগে কখনো মেরাজ ভাইয়ের বকাটাকে ঠিক বকা মনে হয়নি। তবে ঐ কথার পর থেকে আর পারতপক্ষে মেরাজ ভাইয়ের সামনে পড়তাম না। সযত্নে নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। মেরাজ ভাই তখন ভার্সিটির তুখোড় ছাত্র। শত শত বান্ধবীর ভীড়ে সেও আমাকে হয়তো ভুলেই গিয়েছিল। তারপর একদিন…

মেরাজ ভাইয়ের একমাত্র বোন কণা আপার বিয়ে ঠিক হল। আমাদের পুরো বাড়ীর দাওয়াত পড়লো বিয়ের সাতদিন আগে থেকে। আমি তখন স্কুলের চৌকোঠ পেরোনো সদ্য কলেজ পড়ুয়া তরুনী। নিজের সমস্ত সত্ত্বায় যৌবনের মনমাতানো সৌরভ টের পাচ্ছি অণুক্ষণ। সেই সৌরভের ম’ ম’ গন্ধে চারপাশে ভ্রমরের গুঞ্জণও অনুভব করছিলাম। যেখানেই যাই ফেউ পিছু লাগে। সবাই শুধু বন্ধুত্ব পাতাতে চায়। কাছে আসার শর্টকাট ওয়ে যেটাকে বলে, সেই “ফ্রেন্ডশীপ” এর অফার রোজই দুচারটা পাওয়া শুরু করেছি।
এমনকি মেরাজ ভাইয়ের এক চাচাতো ভাই রাজীব ভাইও কণা আপার বিয়ের দুদিন আগে হঠাৎ পেছন থেকে এসে আমার দুই গালে আলতো করে রং মাখিয়ে দিল। দৃশ্যটা মেরাজ ভাই দুর থেকে দেখে ফেলেছিলো এবং আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে প্রচন্ড চড় কষিয়েছিলো সেদিন। গালের লাল রঙের আড়ালে চড়ের রংটা কেউ টের না পেলেও আমার গালটা পুরোমাত্রায় টের পেয়েছিল সেই চড়ের জ্বলুনি। কণা আপার বিদায়ের মুহূর্তে গালের জ্বালায়ইহাপুস নয়নে কাঁদছিলাম। সবাই ভাবছিলো আমি কণা আপার জন্য কাঁদছি।

কেবল মা একবার ডেকে বললো,” তোর গালে আঙ্গুলের দাগ কিসের রে..? কেউ মেরেছে নাকি?”

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেছিলাম। আরে কিসের দাগ! কি উল্টোপাল্টা বকছ ?” মা’কে ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে দিয়ে একাকী বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাবান দিয়ে ঘষে রং তুলতেই আসল চিত্রকর্ম ফুটে উঠেছিলো। পাঁচ আঙ্গূলের অঙ্গুরীয় চিত্রকর্ম । ইস্, কি জোরেই না চড়টা মেরেছে কসাইটা। মাথাটা একেবারে ঘুরে উঠেছিলো।

এখন এই দাগ ঢাকি কি দিয়ে! কণা আপার ফাঁকা ঘরে এসে গালের ফুটে ওঠা দাগগুলোকে ফেস পাউডার দিয়ে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা চালালাম। এরই মধ্যে আমার ডাক পড়লো নিচে একসাথে খাবার জন্য। দ্রুত নিচে নেমে এলাম। কণা আপাকে বিদায় দিয়ে সবাই তখন এক আনন্দমাখা শোকে মুহ্যমান। হঠাৎ মেরাজ ভাই সুযোগ বুঝে আমার হাত ধরে আচমকা হিড়হিড় করে বারান্দার নির্জন কোণে টেনে নিয়ে এলো।সেদিনই প্রথম মেরাজ ভাইয়ের সিগারেটের গন্ধ আমার মুখে এসে আছড়ে পড়েছিলো।
মেরাজ ভাই এর চোখগুলো দেখাচ্ছিলো ঠিক জবা ফুলের মতো। আমার এক নিঃশ্বাস ব্যবধানে থেকে সে বললো,” ঠিক করে বল্, রাজিবের সাথে তোর কি চলছে?”

রাজিব হলো মেরাজ ভাইয়ের বড় চাচার ছেলে। আমি কোনমতে মাথা দুদিকে নেড়ে ‘কিছু না’ শব্দটা বললাম। মেরাজ ভাই তখন মুখটা আরো এগিয়ে নিয়ে বললো,” মাস দুয়েকের মধ্যেই আমি বাইরে চলে যাবো। যাবার আগে আম্মাকে দিয়ে মামার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাব। চুপচাপ হ্যাঁ বলে দিবি। নইলে কিল কিন্তু একটাও মাটিতে পড়বে না। মনে থাকবে?”

আমার তখন ভরা যৌবনে আগুণ লাগি লাগি করছে। উত্তাপটা টের পাচ্ছি অল্প অল্প। কোনোমতে সায় দিলাম।
মেরাজ ভাই হঠাৎ গলা খাদে নামিয়ে বললো,” চড়ের জন্য স্যরি। পরে কোনোদিন আরো ভালো করে ক্ষমা চেয়ে নেবো! এখন যা..!”

আমার যে ছাই কি হয়েছিলো! ফট করে মুখের উপর বলে দিলাম, ” এখনই চাইতে সমস্যা কি? এখনই চান নইলে বিয়েতে মানা করে দেবো!”

মেরাজ ভাই কিছুক্ষণ আমাকে দেখলেন। আমার নত দৃষ্টি আর লাল হয়ে যাওয়া গালের দাগ। তিরতির করে কাঁপতে থাকা অধরোষ্ঠ তার নিচে রাজহংসীর মতো মরাল গ্রীবা।
দেখা শেষ হলে বললো,” উঁহুঁ….এখন না !” বলে দ্রুত সরে গিয়েছিলো সেখান থেকে।

মেরাজ ভাই যাবার দিন পনের আগেই বাবা আর ফুপী মিলে আমাদের বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। সেই অনুযায়ী পরের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।

এক ঘোরলাগা সন্ধ্যায় আমার হাত দুটো বাবা মেরাজের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই ক্ষণ কোনোদিনও ভোলার নয়। বাসর রাতে মেরাজ ভাই চড়ের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। পরম ভালোবাসায় আর আন্তরিকতায়। তারপর আমাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে, কাউকে গায়ে হাত দিতে দেয়াটা চরম অন্যায়।

আমি না বোঝার ভান করে বেশ মজা করে প্রশ্ন করেছিলাম,” কেন ?”

মেরাজ ভাই ততোধিক মজা করে বলেছিলেন ,

” ভাইব্রেশন নষ্ট হয়ে যায়। শরীর হচ্ছে টাচ মোবাইলের মতো। অতিরিক্ত স্পর্শে এর স্পর্শকাতরতা নষ্ট হয়ে যায়। আজকাল চারিদিকে দেখিস না, দশ বারোটা প্রেম করার পর মেয়েগুলোর কেমন জড়তা কেটে যায়, এজন্যেই তো এদের জামাইরে পানসে লাগে। দুই দিনও যায় না, নানান ছুতোনাতায় ডিভোর্স। আগে মেয়েদের চোখে বিয়ে বা স্বামী নিয়ে একটা রঙীন স্বপ্ন শিহরণ কাজ করতো। আবার বাবা-মা ছেড়ে যাবার ব্যথায় কাঁদতো। এখনকার মেয়েগুলা বেশীর ভাগই যেন কেমন। কাঁদেও না শিহরিতও হয় না। ওদের ভাইব্রেশন একেবারে গেছে! শোন্, মন হচ্ছে ঝাউবন। বাতাস লাগলে দুলবেই। তোকে স্থির থাকতে হবে। “

আমি শুনেই লজ্জায় রাঙা হয়ে বলেছিলাম,” আমাকে কেমন মনে হয় আপনার?”

মেরাজ ভাই উত্তরটা অন্যভাবে দিয়েছিলেন। যাক্, এই হলো আমার বিয়ের গল্প।

বিয়ের পরপরই মেরাজ ইটালী চলে গেল। পরের তিনটা বছর আমার কাটলো কাঁটার শয্যায়। চিঠি আর ফোন আমার ব্যাকুলতা পৌঁছে দিচ্ছিলো সুদুর ইটালীতে মেরাজের কাছে। তখনও ফেসবুক চালাতে শিখিনি। মেরাজ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। নিজেই আইডি খুলে দিয়েছিলো। পাসওয়ার্ডও ওরই দেয়া। আমি মেসেঞ্জারে শুধু মেরাজের সাথেই কথা বলতাম। মেরাজ তিন বছরের মাথায় চলে এলে আমার একাকীত্ব ঘুচলো।

এরপর একের পর এক ফাল্গুন এসেছে। আমাদের সম্পর্ক দিনে দিনে আরো মধুর থেকে মধুরতর হয়ে উঠেছে। ইমোশন কমে গিয়ে গাঢ় হয়েছে ফিলিংস। এখন আমি মেরাজের চোখের ইশারাও বুঝি। হাজারো ভীড়ের মধ্যেও ও আমার দিকে তাকালেই আমি বুঝে ফেলি ওর কি চাই!”

এরই মাঝে আমাদের একমাত্র মেয়ে “রৌশনী” আমাদের দুজনের বন্ধনটাকে আরো মজবুত করে তুলল ! মেয়ে অন্তঃপ্রান বাবা মেরাজ মেয়ের ব্যপারে খুব সতর্ক। বারবার আমাকে সতর্ক করে বলতো,

মেয়ের দিকে খেয়াল রাখবা। ওকে কারো কোলে বসতে দিবা না। ওকে এখন থেকেই গুড টাচ ব্যাড টাচ এগুলি শিখাবা। কি যে অবস্থা চারিদিকে। আজকাল নেট দেখে দেখে দুনিয়ার অসভ্যতা শিখে ফেলেছে অল্প বয়েসী ছেলেপেলেরা। এরা বড় কাউকে পায় না তো তাই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোরে তাদের লালসার খোরাক বানিয়ে ফেলেছে।

মেরাজ আর আমার ভালোবাসার ফসল আমাদের একমাত্র মেয়ে রৌশনী’র বয়স এখন তিন। ওর কথার ফুলঝুরিতে আমার সারা ঘর এখন মুখরিত।

আজ আমার সপ্তম বিবাহ বার্ষিকীতে আমরা দুই মা মেয়েতে অপেক্ষা করছি মেরাজের জন্য। আমি ঘরেই মেরাজের পছন্দের খাবারগুলো রেঁধেছি। মেরাজকে সকালে পই পই করে বলে দিয়েছিলাম যেন সন্ধ্যার আগেই চলে আসে। এখন বাজে রাত দশটা অথচ কোনো খবর নেই। ফোন দিলাম, বন্ধ দেখাচ্ছে।

মেরাজ ফিরল তবে অনেক রাত করে। বউ হিসেবে আমি বরাবরই ধীরস্থির শান্ত মেজাজের। ওর দেরীর কারণ জানতে চাইলাম। মেরাজ এড়িয়ে গেল। আমাদের সম্পর্কটা বরাবরই খুব মসৃণ ছিলো। কখনো বড় ধরনের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। তবে আজ মনে হচ্ছে এই মেরাজ আমার অচেনা। ও আমার চোখে চোখ রাখছিলো না। কয়েকটা দিন এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো। সম্পর্কটাও যেন উষ্ণতা হারাচ্ছিল দিনকে দিন ।

তারপর এলো সেই অনাকাঙ্খিত দিনটি যেদিন মেরাজ আমাকে জানালো সে আসলে কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে। মেয়েটা তাকে বিয়ে করতে চায়। মেরাজও চায়।আমি বাকরুদ্ধ হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম বলতে পারবো না। শুনলাম নিজেই বলছি,” আমার ভালোবাসায় কি কোনো কমতি ছিলো? কোনো ভুল করেছি আমি? ”

মেরাজ নিজের চুলগুলো মুঠো করে ধরে বলেছিলো, “তোমার না, আমার ভুল হয়েছে। মেয়েটার সাথে ইনবক্সে চ্যাট করতে গিয়ে কখন যে ওর কথায় ইমপ্রেসড হয়ে গিয়েছি বলতে পারবো না। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। মানে বিয়ে না করে উপায় নেই ! তোমার অনুমতি আছে তো?”

কান্না চেপে অনুমতি দিলাম। আমার এই সহজ সরল রূপটাই নাকি মেরাজের ভালো লাগে। খুশি হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। ভেবেছিলাম, থাক করুক বিয়ে। আমার ভাগের টুকু আমি ঠিকমতো পেলেই চলবে। বিয়ে না করে যদি আমার অগোচরে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে পুষতো তাহলে সে হয়তো আমার সংসারের ভাগ নিতে আসতো না কিন্তু আমার স্বামীকে আরো বেশী নিজের করে পেতো কারণ যে কোন নিষিদ্ধ সম্পর্কের আকর্ষণ সবসময় বেশী। তারচে হালালভাবে থাকুক। অন্তত মেরাজকে তো আমি পাবো।

এর দিন দশেকের মাথায় মেরাজ আমাকে না বলে হঠাৎ চট্টগ্রাম চলে গেল আর ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল। আমি অনুভূতিশূন্য অবস্থায় ফুপীকে চিঠিটা দেখালাম। জানালাম যে মেরাজ আমাকে তালাক দিয়েছে। সত্যি বলতে সেদিন রাগ করবো না অভিমান করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কেবল মেরাজের একটি কথা বারবার আমার মনে পড়ছিল।
‘ তুই হলি আমার অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচেনা জানিস তো! ‘ মেরাজ আমাকে বিয়ের পর কখনো তুই কখনো তুমি বলেই ডাকতো।

মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য ব্যাগ গুছালাম। ফুপী বললেন,” তুই যাবি কেন। ঐ হারামজাদী যাবে। ঢাকায় আসুক, দুটোকে ঝাড়ুপেটা করবো। তোকে আমি বিয়ে করিয়ে এনেছি। ঐ ফেসবুক আলীকে আমি চিনি না জানি। আমার নাতিন নিয়ে তুই আমার চোখের সামনে থাকবি!”

ক্লান্ত গলায় বললাম,” বাড়ীতো বেশী দুরে না ফুপী। আপনি রোজ আপনার নাতিনকে গিয়ে দেখে আসবেন। কিন্তু আমি মেরাজের মুখ এ জীবনে আর দ্বিতীয়বার দেখতে রাজী নই। আর আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে এটা ওকে বলে দেবেন !”

জীবন জীবিকার প্রয়োজনে একটা স্কুলে চাকরী নিলাম। মেরাজ মেয়ের খরচ দিয়ে যাচ্ছিল। একটু বেশীই দিচ্ছিলো। আমি রৌশনীর প্রয়োজনীয়টুকু রেখে বাকিটা ফুপীর হাতে ফিরিয়ে দিতাম।

মেয়েকে নিয়ে দিন একরকম কেটে যাচ্ছে আমার। সমস্যা কেবল একটাই, মেয়েকে নিয়ে পথেঘাটে বের হলে মেরাজের সাথে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। আর তখনই কলিজাটা দুমড়ে মুচড়ে উঠে।

মেরাজ অবশ্য মেয়েকে দেখলেই আঙ্গুল তুলে ডাক দেয় আর মেয়েটা তখন আমার দিকে তাকায়। আমি নিরবে মেয়েকে নিয়ে সরে আসি। মাঝেমধ্যেই ফুপীকে দিয়ে রৌশনীকে ডেকে নিয়ে যেতো সে আর একগাদা চকোলেট চিপস জুস দুহাত ভরে দিয়ে দিতো। কখনো আমার জন্য আইসক্রিমও দিয়ে দিতো সাথে। আমি দুদিন ফিরিয়ে দেবার পর দেয়া বন্ধ করেছিলো। মাঝেমধ্যে ফোনে মেসেঞ্জারে নক করতো। তারপরই ব্লক করলাম ওকে।

এর মধ্যে একদিন আমার আম্মু এসে জানালো রাজীব ভাই আমার খবর পেয়ে তার আম্মুর মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি যতদুর শুনেছি রাজীব ভাইয়ের স্ত্রী বিয়ের ছয়মাসের মধ্যেই হার্ট এ্যাটাকে মারা গেছেন। তারপরে আর তিনি বিয়েই করেননি। আজ হঠাৎ তার বিয়ের সাধ জাগলো কেন কে জানে !

আমি মা’কে কঠিন স্বরে জানিয়ে দিলাম, আমার ইদ্দত এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে বিয়ের প্রস্তাব কেন ? তাছাড়া আমিতো বলেছি আমি আর বিয়ে করবো না। বিয়ের শখ জন্মের মতো মিটে গেছে।

আম্মু বোঝানোর চেষ্টা করলেন,”এভাবে কি সারাটা জীবন একা থাকবি? রাজীব ভালো ছেলে। সে তো রৌশনীকে সহই তোকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তোর ইদ্দতেরও আর মাত্র চার পাঁচদিন বাকি। তুই রাজী হলে আগামী সপ্তাহেই রাজীব বিয়ে করতে প্রস্তুত!”

-” তাকে মানা করে দাও। সে রাজী হলে কি হবে! আমি তো রাজী না! ”

আম্মু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন। রাজীব ভাইয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার পরের দিনই আম্মু হন্তদন্ত হয়ে এলেন আমার কাছে।

উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন,” শুনেছিস রানু , মেরাজের এই বউটা নাকি সুবিধার না। সে নাকি ফেসবুকে দুনিয়ার ছেলেদের সাথে খাতির রেখেছে। খুব চালু মেয়ে। বিষয়টা মেরাজ টের পেয়ে যাওয়ায় এখন ওদের মধ্যে মহা গ্যাঞ্জাম দেখা দিয়েছে। রাগারাগির এক পর্যায়ে মেরাজ নাকি ঐ বৌ’কে বেরও করে দিয়েছে। তারপরই বেচারা তার মায়ের কাছে কেঁদে গিয়ে পড়েছে! বলছে যে তার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। সে মোহের ফাঁদে পড়েছিলো। ঐ মেয়ের ফুসলানিতেই সে তোকে ডিভোর্স দিয়ে নিজের কপাল পুড়েছে কিন্তু মন থেকে ও নাকি শুধু তোকেই ভালোবাসে। হায়রে ফেসবুক ! কতজনের যে ঘর ভাঙ্গলো। মেরাজ তো তবু তার ভুলটা বুঝতে পারছে। সে এখন তোকে যে কোনো মূল্যে ফেরত চায়। তোর ফুপী মনে হয় আজই আসবেন তোর সাথে কথা বলতে। আল্লাহর রহমত যে মেরাজ তার নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে। এবার তো আর তোর আপত্তি নেই, কি বলিস?”

মনের কোনো এক বদ্ধ দরোজায় প্রচন্ড আঘাত হানলো মেরাজের খবরটা। বুকের ভেতর গুমরে মরা অভিমানগুলো একটু খানি নিঃশ্বাস ফেলার জন্য আঁকুপাঁকু করে উঠলো। কয়েক মিনিট শান্ত হয়ে বসে ভাবলাম। তারপর উঠে গিয়ে দু ‘রাকাত নামাজ পড়তে মনটা এবার অনেকটাই শান্ত হয়ে এলো।

মায়ের কাছে বললাম, ” একটু রাজীব ভাইকে ফোন করো তো মা!”

-” কেন ? হঠাৎ আবার রাজীব কেন?”

-” আমি রাজীব ভাইয়ের প্রস্তাবে রাজী। সে কথাটা বলার জন্যই ফোন করতে বলেছি। তুমি ফোন করে কথা বলবে না আমি বলবো?”

-” এ কেমন জেদ? মেরাজ তো নিজের ভুল স্বীকার করেছে। মানুষের তো ভুল হতেই পারে। সে এখন তোর জন্য তড়পাচ্ছে। কতবার তোকে ফোন দিল ছেলেটা। তুই তো ওর ফোনটাও ধরলি না। তাছাড়া ও তো তোকে ভালবাসে। তুই এসবের মধ্যে রাজীবকে টানছিস কেন? ”

-” কারণ মেরাজ ভুল করলেও আমি ভুল করতে চাইনা। ভালোতো আমিও মেরাজকে একসময় বাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। এখন সেই শ্রদ্ধাটা আর নেই। যেখানে শ্রদ্ধা নেই সেখানে ভালোবাসা বেশিদিন টিকবে না। মানুষ ভুল করতে পারে আমিও জানি। সে আমাকে ছোটোবেলা থেকেই ভালো মন্দের জ্ঞান শিখিয়ে এসেছে। মন্দের পথে হাঁটলে মন্দ যে তাকে একসময় গিলে ফেলে এই জ্ঞানটুকু তো তার মধ্যে ভালভাবেই ছিলো। সব জেনে বুঝেও সে ঐ পথেই গেছে বলেই গপ্পরে পড়েছে। কিন্তু আমি একই ভুল দুইবার করবো না।
তুমি রাজীব ভাইকে ফোন দাও, এক্ষুণি!”

অগত্যা মা রাজীবের মা’কে ফোন দিয়ে আমার সম্মতির কথাটা জানিয়ে দিতেই কিছুক্ষণের মধ্যে রাজীবের মেসেজ এলো! ” অনেক ধন্যবাদ। সারাজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। ”

নিরবে মেসেজটা দেখে দুচোখ বন্ধ করতেই দেখলাম তরতর করে দুফোটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।জানিনা এ কিসের কান্না।ভালোবাসার না চরমতম অভিমানের।

(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন-

চোরাবালি

আরও পড়ুন