ভালোবাসার প্রতিদান

।। আবদুল্লাহ আরমান ।। 
সাদা কাফনে মোড়ানো বাবার নিথর দেহটা যখন ৪ জন কবরস্থানে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন আমি চাইলেও বাবার খাটিয়ার জন্য আমার কাঁধটা এগিয়ে দিতে পারিনি। কারণ শক্তি ও বয়সে তখন বড়োই অপরিপক্ক ছিলো আমার কাঁধ। কিন্তু তখনও বুঝিনি বাবাহীন এই ভাঙা সংসারের পাহাড়সম গুরুদায়িত্ব আমার সেই দুর্বল স্কন্ধেই অর্পিত হয়েছে।
দাফন শেষে বাড়ি ফিরে এসে দেখি আমার মা বাবার গায়ের চাদরটা বুকে জড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। সে চোখের ভাষা আমি বুঝিনি। কিন্তু স্বামীহীনা এক বাঙালী নারী হিসেবে চরম অসহায়ত্ব ও হাহাকার যেন তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছিলো।
বাবার মৃত্যুর পর অনেকেই মা’র কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। মা বারংবার বিনয়ের সাথে প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। হয়তো হৃদয়ে লালিত বাবার প্রতি ভালোবাসা ও আমাদের তিন ভাই-বোনের অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার বয়সের উনুনে নীরবে-হাসিমুখে শীতল জল ঢেলেছেন।

 

আমিন ও খাদিজা; ওরা শুধু আমার ভাই-বোনই নয়,ওরা সুখ আর স্বপ্নে ভরা আমার দুটি পৃথিবীর নাম। আমার মৃত বাবার ঔরসে জন্ম নেওয়া ১ জোড়া শেষ স্মৃতি। তাই জীবনভর বাবার আদরের দুই নয়নমণিকে সাধ্যমতো আগলে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। বাবা নামক বটবৃক্ষের মৃত্যুতে ইয়াতীম হওয়ার নিদারুণ অসহায়ত্ব আমি অনুভব করেছি প্রতিটি মুহূর্তে। ওদের নিষ্পাপ হৃদয় যাতে সেই অসহায়ত্বের আঘাতে জর্জরিত না হয় এজন্য আমি আর মা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে ওদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

 

সম্পদ বলতে বাবার রেখে যাওয়া ৩ খন্ড আবাদি জমি আর একটা টিনের ছোট্ট বাড়ি। এটুকুই আমাদের সম্বল। চরম অভাবের সংসার। তাই ছাত্র হিসেবে আমার যথেষ্ট সুনাম থাকলেও পড়ালেখা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সংসারের হাল ধরতে আমার সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিলো; কলম অথবা কোদাল। আমি স্বেচ্ছায় কোদালই বেছে নিয়েছিলাম। সত্যি বলতে তাতে আমার একটুও খারাপ লাগেনি। আমি কোদাল-কাস্তে হাতে নিয়ে আমার ভাই -বোনের হাতে খাতা-কলম তুলে দিতে পেরেছি এটাই ছিলো আমার বড় প্রাপ্তি। এক্ষেত্রে ছোটবেলায় মক্তবের হুজুরের মুখে শোনা একটি হাদীস ছিলো আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাঃ “ইয়াতীমের রক্ষণাবেক্ষণকারী ও আমি জান্নাতে দু’আঙ্গুলের ন্যায় কাছাকাছি থাকব”। (সহিহ মুসলিমঃ ৭৩৫৯)। প্রিয় রাসূলের পাশে জান্নাতে জায়গা পাওয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে! তাছাড়া বাবার অবর্তমানে তাঁর “বড় ছেলে” হিসেবে এ ছাড়া আমার আর ভিন্ন কোনো উপায়ও ছিলো না বটে।

 

ষড়ঋতুর শীত-মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টিতে ভিজে অবিরাম সংসার সংগ্রাম করতে গিয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবার খুব একটা সুযোগ হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে শরীর ও মনে অজানা একজনের শূন্যতা অনুভব করতাম। তার জন্য একটুখানি প্রেমবোধ ও তপ্ত স্পর্শের আকাঙ্খা হৃদয়ের কোণে উঁকি দিতো। কিন্তু পরক্ষনেই কাজের ব্যস্ততা ও জীবনের বাস্তবতায় সে অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সংসার চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার সমাপ্তি আর বোনকে ভালো পাত্রের নিকট সমর্পণই ছিলো আমার একমাত্র ভাবনা। ওদের সফলতার মাঝেই নিজের সাফল্য খুঁজে পেতাম।

 

কিন্তু মা তো মা-ই। আমাকে নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ নেই। মাঝেমধ্যেই আমাকে বলতেন “বাপ, বিয়াটা কর। সংসারী হ…..”। আমি হেসে হেসে বলতাম “ আমিতো সংসারই করতাছি মা। তোমরাই আমার সব….”।

 

মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ছোট বোনটাও স্কুলে যায়। সংসার সামলানোর জন্য মায়ের স্থলাভিষিক্ত একজন মানুষ প্রয়োজন। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই মা নিজে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে আমার জন্য তাঁর মেয়েটাকে চাইলেন। ইমাম সাহেব হতাশ করলেন না। ঘরোয়া আয়োজন ও নামমাত্র মোহরে তার মেয়েকে আমার হাতে সমর্পণ করলেন।

 

ফরিদা; আমার সহধর্মিণী। খুবই সাধাসিধা আর অল্পে তুষ্ট হৃদয়ের একজন অসাধারণ ভালো মনের মানুষ। মা’র মৃত্যুর পর এতোটা বছর ভালোবাসা দিয়ে আমাদের সবাইকে ও আগলে রেখেছে। আমার তিনটি সন্তানের জননীও সে । ছোট ভাই-বোনদের প্রতি আমার দায়িত্ববোধ নিয়ে ও কখনও হিংসা কিংবা আপত্তি করেনি। বরং নিজের সন্তানের মতোই ওদের ভালোবেসেছে, যত্ন নিয়েছে।

 

একবার অনেক চেষ্টা করেও আমিনের মাস্টার্স পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সম্পূর্ণ টাকা যোগাড় করতে পারলাম না। ফরিদা ওর রং নষ্ট হয়ে যাওয়া ছেঁড়া বোরকাটা পরিবর্তনের জন্য হাঁস-মুরগি বিক্রি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলো। সেই টাকাগুলো আমার পকেটে গুঁজে দিয়ে একগাল হেসে বললো “যান, টাকাগুলো ওকে দিয়ে আসেন। আর ওকে বইলেন, চাকুরির প্রথম বেতন দিয়ে ও যেন আমারে একটা কালো বোরকা আর হাত-পা মোজা কিইনা দেয়…..”।

 

বোনটার বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। স্বামী-সন্তান নিয়ে ও সুখেই আছে। আমার আদরের ভাই আমিনও ভালো ঘরেই বিয়ে করেছে। অবশ্য আমাকে না জানিয়েই বিয়েটা করেছিলো। শ্বশুর বাড়ির বদৌলতে ভালো চাকুরীও পেয়েছে। বেতনও নাকি ভালোই । গ্রাম দেখাতে আমিন ওর বউকে নিয়ে বিয়ের পর একবারই এসেছিলো। আমি আর ফরিদা ওদের যত্নের ত্রুটি করিনি। কিন্তু আমাদের ভাঙা বাড়িতে এসে নাকি ওর বউয়ের খুব কষ্ট হয়েছে, তাই আর আসে না।

 

মাঝেমধ্যে খুউব মন চায় আদরের ভাইটাকে কাছ থেকে একবার দেখে আসি। কিন্তু শরীরটা আর আগের মতো চলে না। বংশধারায় বাবার হাঁপানি রোগ যেমন পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি তাঁর রেখে যাওয়া অমোচনীয় গরিবী জীবন। ভাই-বোনদের জীবন গুছিয়ে দিতে আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই করার ফুরসত পাইনি। তার আগেই কিডনির জটিলতা আর তীব্র হাঁপানি আমাকে ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত বানিয়ে ঘরের কোণে বন্দী করেছে।

 

ভেবেছিলাম আমিনের চাকুরী হলে ওর একটু আর্থিক সহযোগিতা পাবো। কিন্তু বড় ভাইকে ছোট ভাইয়ের এমন সহযোগিতা নাকি সমাজের অলিখিত সংবিধান বিরোধী রীতি। তাই ওর সহধর্মিণীর প্রতিবাদের মুখে ও এই সংবিধান মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ওর বউ সঠিক সিন্ধান্তই নিয়েছে। সবাই তো আমার ফরিদার মতো সহজ-সরল নয়, যে নিজেকে নিঃস্ব করে অন্যের সংসার গুছিয়ে দেবে! ওরা ভালো সংসারী হয়েছে, সুখে আছে, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

 

শ্বাসকষ্ট দিন দিন বেড়েই চলেছে। গোটা দুনিয়া ভরা বাতাস থাকলেও ইনহেলার ছাড়া আমি বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি না। তিনবেলা ভাতই যেখানে আমার পরিবারের জন্য একরকম বিলাসিতা সেখানে দামী ইনহেলার দিয়ে শ্বাস নেওয়া অন্যায় বৈকি।

 

কয়েকদিন হলো আমার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বড় ছেলে আর ফরিদা মাথার কাছে অসহায়ের মতে বসে বসে কাঁদে। আমার অবস্থা বেগতিক দেখে ফরিদা ওর পুরাতন বোরকাটা পরে কিছু টাকা ঋণের জন্য গতকাল আমিনের বাসায় গিয়েছিলো। আমিন বাসায় ছিলো না। ওর স্ত্রী ফরিদাকে পাশে বসিয়ে অনেক গল্প করেছে। শুনিয়েছে ওদের সীমাহীন অভাবের কথা। আমিনের অফিস করার জন্য একটা বাইক কেনা দরকার। শহরে ফ্ল্যাট কেনার জন্য মাসিক কিস্তি দিতে গিয়ে বাইক কেনা হচ্ছে না। কথার ফাঁকে গ্রামে পৈতৃক জমি আর কতটুকু বাকী আছে সেটাও নাকি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো। ওদের পাহাড়সম অভাবের কথা শুনে ফরিদা টাকা ধার চাওয়ার সাহস পায়নি। শুধু বলে এসেছে, “ আমিনরে কইয়ো আমরা খুব ভালো আছি। সময় করে ওর ভাইরে যেন শেষবারের মতো দেইখা আসে। পরে হয়তো সময় পেলেও আর দেখার সুযোগ হবে না। থাকো বইন,যাই….”।

 

গত রাত থেকে ইনহেলার দিয়েও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শরীর ইঙ্গিত দিচ্ছে কবরে যাওয়া এখন সময়ের ব্যবধান মাত্র। অজানা এক নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু ভয়, উৎকন্ঠা সারাক্ষণ হৃদয়কে তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রতিদিন যেন নির্জনতার গহীন থেকে গহীন কূল-কিনারাহীন অরণ্যে আমি হারিয়ে যাচ্ছি।
ফরিদা পাশে বসে কাঁদছে। বড় নিদারুণ সেই কান্নার গুণগুণ আওয়াজ। চোখ মেলে ওর দিকে তাকালাম। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের চোখে যে অসহায়ত্ব আমি দেখেছিলাম ফরিদার চোখেও সেই অভিন্ন বার্তা।

 

ভালো খাবার,বাড়ি, পোশাক কিংবা স্বচ্ছল জীবন….কিছুই ওকে দিতে পারিনি। যাদের জন্য ওকে ঠকিয়েছি ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তারা কেউ আজ আমার পাশে নেই। অথচ আমার কাছে সুখের ছিটেফোঁটা না পেয়েও ও আমাকে দু’হাতে আগলে রেখেছে। আল্লাহ! কেবল তুমিই পারো এর বিনিময় দিতে।
ফরিদার হাতটা আলতো করে ধরলাম। ও আমার মুখের কাছে কান এগিয়ে দিলো। বললাম “আমারে মাফ কইরা দিও ফরিদা”। কথাটা শেষ করতে না করতেই ও আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো….।

 

আবার বললাম,
“ ছেলেদের দেইখা রাইখো। রিজিকের চিন্তা কইরো না, আমি রিজিকের মালিক না। রিজিকের আসল মালিকের নিকট তোমাগো আমানত দিয়া গেলাম…..আল্লাহ ভরসা”।
মায়ের কান্না দেখে বড় ছেলেটাও মুখের কাছে কান এগিয়ে দিলো। ওকে বললাম; “বাপ, তুই আমার বড় ছেলে। তোর ছোট্ট কান্ধেই তোর মা আর দুই ভাইকে রাইখা গেলাম। ওরা এতীম, ওদের দেইখা রাখিস বাবা। আর শোন বাবা; বড় ছেলেরে অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়, মাইনা নিতে হয়। দুনিয়ায় ওদের কাছে তোর ত্যাগের প্রতিদান পাওয়ার আশা করিস না….এই ভালোবাসার প্রতিদান আল্লাহর কাছেই জমা রাখিস। আর সারাজীবন ঈমানের পথে চলিস বাপ। মনে পড়লে আমার জন্য দু’হাত তুলে দোআ করিস….।”
ফরিদা,ও ফরিদা….!! আমার খুব ঘুম পাইতাছে, আমারে কালেমার তালক্বীন দেও….!!
(গল্প ও চরিত্র কাল্পনিক)

 

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে গল্প ও কলাম লেখক এবং শিক্ষক 
ভালোবাসার প্রতিদান- ভালোবাসার প্রতিদান  -ভালোবাসার প্রতিদান  -ভালোবাসার প্রতিদান  -ভালোবাসার প্রতিদান
আরও পড়ুন