বাবা

আব্দুল্লাহ আরমান 

যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। মুহূর্তকাল চিন্তা না করেই আমার তৎক্ষনাৎ উত্তর হবে “যখন আমার ছেলেটাকে বুকে জড়াই”। যদি আবারও জিজ্ঞাসা করা হয়, আমার দু-চোখে দেখা শ্রেষ্ঠ দৃশ্য কোনটি, আমি কালবিলম্ব না করেই বলবো “আমার ছেলের ফোকলা দাঁতের হাসি”

অনেকের কাছে ব্যাপারটা নিছক আবেগ কিংবা নিতান্তই ছেলেমানুষি মনে হতে পারে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা এর চেয়েও গভীর! পিতা হওয়ার আগ পর্যন্ত পিতৃত্বকে উপলব্ধি একরকম অসম্ভবই বটে। প্রতিটি সন্তানই পিতার কাছে এমন আদরের। তবে ব্যক্তিত্বের ভিন্নতায় সন্তানের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গী একেকজনের একেকরকম হয়ে থাকে। মা মানেই মমতাময়ী, মায়ের এই মমতাময়ী চরিত্রে নেই কোনো ব্যতিক্রম, ভিন্নতা কিংবা বৈচিত্র্য । কিন্তু পুরুষ হিসেবে বাবাদের ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি সৃষ্টিগতভাবেই বৈচিত্র্যময়। তাঁদের শাসন, বকুনি,ধমক, কঠোরতা, পিটুনি, নীরবতা, গাম্ভীর্যতা, কর্কশতা, চোখ রাঙানো, নানান নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির মাঝে লুকিয়ে থাকে সাত সমুদ্রের জলে সিক্ত নিখাঁদ ভালোবাসা । মায়ের অবারিত ভালোবাসার সাথে বাবার সংযতবাক ও গম্ভীর অভিব্যক্তির সমন্বয় একটি শিশুর নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খল জীবনগঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বুকের ভিতরে বাঁধভাঙা স্নেহ লুকিয়ে রেখে স্বেচ্ছায় কঠোরতার খোলস পরিধান তাঁর ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ কল্যানকামী মনোভাবেরই অংশ। পরিণত বয়স কিংবা যথাযথ বোধশক্তি ছাড়া বাবাদের এই সুপ্ত ভালোবাসা উপলব্ধি সম্ভব নয়।

পড়ালেখার জন্য আমাকে প্রায় এক যুগ ছাত্রাবাসে থাকতে হয়েছে। কি খেয়েছি, কখন খেয়েছি, খেতে কষ্ট হয় কি-না বারংবার বাবার এই একই প্রশ্নগুলো মাঝেমধ্যে আমাকে খুব বিব্রত করতো। এখন নিজে বাবা হওয়ার পর এই তাঁর একঘেয়ে কথাগুলোর মাঝে লুকিয়ে থাকা স্নেহের গভীরতা বুঝতে আর কষ্ট হয় না। আমার ছেলের তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার দৃশ্য মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়, আর পর্যাপ্ত না খেতে পারলে বুকে যেন ব্যথার শেল বিঁধে যায়। হয়তো এ-কারণেই একযুগ ধরে বারংবার একই প্রশ্ন করে তিনি একঘেয়েমিতা অনুভব করেননি!

মাসখানেক আগে জ্বর ও অরুচির কারণে আমার বাবা কিছুদিন একপ্রকার না খেয়েই দিনাতিপাত করেছেন। নিজের শরীর বিষয়ে তাঁর উদাসীনতার কারণে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য দেখে মনে কষ্ট ও অভিমান নিয়ে হালকা বকুনি দিলাম। তিনি যে বাবা, আমার ঈষৎ রাগের মাঝে লুকিয়ে থাকা গোপন ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তাঁর পিতৃত্বের লেন্সে ঠিকই ধরা পড়েছে। বকুনি শুনে বাধ্য ছেলের মতো চাপা হাসি দিয়ে কী কী খেতে মন চায় গড়গড় করে সব বলে দিলেন। অরুচির কারনে নিজ ছেলের উপার্জিত টাকায় কেনা খাবারগুলো ভালোভাবে খেতে না পারলেও আমার যৎসামান্য যত্নে ওনার চোখেমুখে যে খুশী ও তৃপ্তির আভা আমি দেখেছি তা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। তখন অনুভব করলাম, জীবনের দ্বিতীয় শৈশবে এসে বাবারা চায় কেউ তাকে একটু ভালোবাসা মাখানো শাসন করুক- বকুনি দিক, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে তাকে দেখভালের একটুখানি দায়িত্ব নিক। আমার মনে হয় না এই মহান মানুষগুলো সন্তানের কাছে নিজেদের জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু চায়!

কিছুদিন আগে আমার মামা বললেন, “২৩ বছর হলো আব্বাকে কে হারিয়েছি। এই ২৩টা বছরে আর একটিবারও ‘আব্বা’ ডাকতে পারিনি। ছেলেটাকে (আদর করে) বাবা ডাকি কিন্তু নিজের আব্বাকে ডাকার সেই তৃপ্তি পাই না। হারালে বোঝা যায় বাবা নামক সেই বটবৃক্ষের মর্যাদা….”।
মামার কথাটা সেদিন হৃদয়ের বড্ড গহীনে আঘাত করেছে। আমার জীবদ্দশায় বাবার মৃত্যু কল্পনা করলে যেন দুঃসহ বেদনা ও শূন্যতার কূলহীন মহাসাগরে হারিয়ে যাই। জানি না ধৈর্যের সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবো কি-না!
স্বল্প জ্ঞান, অপর্যাপ্ত শিক্ষা-দীক্ষা, দুর্বল সামাজিক অবস্থান, আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, সংসার ও কর্মজীবনে ব্যর্থ ইত্যাদি যা-ই হোক না কেন সবকিছুর উর্ধ্বে তাঁর পরিচয় তিনি ‘জনক’, যার ঔরসে জন্মে আমরা পেয়েছি কলঙ্কতিলক মুক্ত বেঁচে থাকার বৈধ পরিচয় ।

একজন আদর্শ ও সফল পিতা হওয়া মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। তবে প্রত্যেক বাবা আমৃত্যু তার সমস্ত সামর্থ্য ও কর্মশক্তি উৎসর্গ করে সন্তানকে সাধ্যানুযায়ী সুন্দর জীবন উপহার দিতে চেষ্টার নূন্যতম কমতি করেন না। নিজে ঘামের সাগরে হাবুডুবু খেয়ে আজীবন সন্তানের মাথায় বটবৃক্ষের ন্যায় নিঃস্বার্থে-নীরবে শীতল ছায়া বিলিয়ে যান। তাঁর বিকল্প-সমতূল্য-সমকক্ষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই,থাকতে পারে না,থাকা অসম্ভব।

প্রতিটি মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি হলেন ‘মা’। বাবা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সেই মহীয়সী মায়ের সবচেয়ে শ্রদ্ধাভাজন,ভালোবাসার মানুষ, কেয়ারটেকার ও দুই জীবনের সাথী। এ দিক থেকে তিনি সম্মান ও ভালোবাসার বেশী হক্বদার। আমরা কি পারি মায়ের সেই মুকুটবিহীন রাজাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে?!

কন্যা সন্তানকে আল্লাহ বাবাকে জয় করার পরশপাথর দান করেছেন। সেবা-যত্ন, শ্রদ্ধা, আদর ও মায়াবী কথায় তারা বাবাকে নিজের হৃদয়ে লুকানো ভালোবাসা অবলীলায় বোঝাতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে সৃষ্টিগত অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্য ও কোনো এক অজানা জড়তায় আমরা ছেলেরা তা পারি না। তাই সারাটি জীবন আমাদের বুকের চিলেকোঠায় লালিত সবচেয়ে সত্যি সেই কথাটি অব্যক্তই রয়ে যায় “বাবা, তোমাকে বড্ড বেশী ভালোবাসি….”।

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

আরও পড়ুন-

সত্যিকারের পুরুষ চাই

আরও পড়ুন