অবাঞ্ছিত

সুচন্দ্রা মুখার্জী

রাতের মায়াবী আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে রূপোলী আলোয় মোড়া শহর সিঙ্গাপুর।সাতাশতলা আবাসনের
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে সুরমা হয়ে দেখছিল জ্যোৎস্নাধোয়া রাতটাকে।
তখনই দুটি নবজাত শিশুর কান্নায় সচকিত হয়ে ছুটে গেল ঘরে।নিজের শিশুকন্যা আর অন্যজন তার নাতনি;এই
পরিবারের সাম্রাজ্যের রাণী।অনেক আদরে সোহাগে যত্নে;বৈভবের আশ্বাসনে রিয়ার নাড়িছেঁড়া ধন টিকলি!
কিছু অঘোষিত অঘটন জীবনের অজান্তেই ঘটে যায়।

পরপর তিনটি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জননী সুরমার কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে গর্ভসঞ্চার হলো আর তার বীভৎস পরিণতি এই বয়সে পুনরায় মা হওয়া।গর্ভপাত সম্ভব ছিলনা রক্তাল্পতার জন্য তাই কোলে এল ক্ষীণকায়
অপুষ্টিতে ভোগা এক কন্যা সন্তান।
আসন্নপ্রসবা বড় মেয়ে রিয়ার সন্তানকে দেখাশোনা করবার অভিপ্রায় নিয়ে এসেছিল; কিন্তু নিজেই মা হয়ে বসল
;বেওয়ারিশ ধিক্কার আর অহর্নিশি গঞ্জনা!
রিয়া মাকে লাঞ্ছিত করে প্রতিপদে;”ছিঃ ছিঃ ছিঃ মা
লজ্জা করেনা?এই বয়সে কি বাচ্চা হতে আছে?;”
ঘৃণায় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।ছেলেমেয়েদের তীব্র বিতৃষ্ণা;স্বামীও বীতশ্রদ্ধ?
অবাঞ্ছিত অনাহুত এই বাচ্চাটা কেন জম্ম নিল?
বিবর্ণ এই অশ্রুগুলো আজ বড় বেহায়া;যেন সেধে বিষপান করেছে সুরমা!সূর্যটাও লজ্জায় আরক্ত লাল হয়।বানভাসি
চাঁদ আলো না ফেলে ছোবল মারে।রক্তে নিগূঢ় গ্রন্থিতে নাড়ির টান এনে দিয়েছে নাভিশ্বাসের যন্ত্রণা !
সুরমা ছুটে গিয়ে নাতনীকে কোলে নিল;অথচ নিজের  শিশুকন্যার ক্ষীণ চীৎকার তাকে তো বিচলিত করেনা? এক আকাশ কান্না আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখে;অভিমান
জমিয়ে রাখে মেঘের কাছে।

জামাই প্রবীর একটু রাত করে বাড়ি ফেরে। রিয়া জিগ্গেস করে; “দেরী হলো যে?
প্রবীর তীর্যক মন্তব্য করে;”আমার প্রিয় শালীর জন্য বেবী ফুড কিনতে গিছলাম।”
বিদ্রুপাত্মক হাসি হেসে রিয়া বললে;”কালে কালে কতই যে হলো;পুলিপিঠের ল্যাজ গজালো!! বলে দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়লো!
অপমানের তীর বিঁধলো সুরমার দগ্ধ হৃদয়ে ! সুরমার শুষ্ক স্তনের দুটো খয়েরী বোঁটা চুষে বাচ্চাটি ক্লান্ত;দুধ পায়না। কৌটোর দুধ খেতেও চায়না।
রিয়ার স্তনযুগল যেন দুগ্ধস্রোতা স্রোতোস্বিনী।টিকলি প্রাণভরে মায়ের দুধ টানে আর দিনদিন হৃষ্টপুষ্ট হয়ে
উঠছে।

সুরমার স্বামী নিয়মিত ফোনে খবর নেয়;সংসারের সদস্যদের কথা;খুঁটিনাটি খবর নেয় কিন্তু নিজের নবজাত কন্যার কথা ভুলেও জিগ্গেস করেনা। সুরমা সাধ করে ওর নাম রেখেছে দিয়া। রিয়া, প্রিয়া অরিত্রর বাইশ বছর পর আবার গর্ভধারণ! দিয়া।
রিয়া অগ্নিমুর্তি হয়ে বলে, “খবর্দার মা আমাদের সঙ্গে মিলিয়ে তুমি ওর নাম রাখবেনা।কোথাথেকে আপদ এসে জুটেছে?”
মাতৃত্বর পরিবর্তে রিয়া যে খুবলে খেয়েছে মমতার মাংসপিণ্ড! বাচ্চাটা খিদেতে আকুল হয়ে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কাঁদছে।
রিয়া স্বামীর সঙ্গে নাইট ক্লাবে গেছে।টিকলিও কাঁদছে।সুরমা বিনি পয়সার পরিচারিকা হয়ে এখানে এসেছে নাতনির পরিচর্যা করতে।
কেন এই শাসন আর শোষণ?

ছুটে গেল সুরমা নিজের বাচ্চার কাছে। হু হু করে কেঁদে ভাসিয়ে দিল সব পুঞ্জীভূত জমানো অভিমান।বেদনার রক্তক্ষরণ!
বাচ্চাটা মিটমিট করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মা দেখছে অপলক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চেয়ে।
বুকে জড়িয়ে আবেগে সে যে আপ্লুত।কাঁপা গলায় বললে, “আমার সোনা চাঁদের কণা বুকের কমাণিক আমার ! তুই
বাঁচবি…তোর ও তো বাঁচার অধিকার আছে; আমি সারাজীবন তোর আছি….”
কোমল তুলতুলে তুলোর মত শরীর ওর! আদর করতে ইচ্ছে করে;কিন্তু বড় অপুষ্ট আর শীর্ণ যে?

বুকের ভিতর পাথর চেপে বসেছে।কত অসহায় ! আহা কত দুর্বল ওর মা? এই পৃথিবীতে কেউ ওকে চায়না।কেউ ভালোবাসেনা। তবুও পারবে কি একটা অনাহুত শিশুর অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে?হিংস্র বাঘিনীর থাবায় এই নিষ্ঠুর সমাজ ওর নরম তুলোর শরীরে কি পারবে দিতে নখের আঁচড়?

শিশু যে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ অবদান। হিম অনলে কেন
বসন্তকে লুকাবে সুরমা? প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সমীকরণে
পাওয়াকে আগলে রাখবে; ঊষর প্রান্তরে বৃষ্টি নামিয়ে আনবে; নুড়িপাথরের নীচে নদীর এক আঁজলা জল হৃদয় কুঠুরিতে ধরে রাখবে।
বুকের ভাঁজে লুকিয়ে আছে মাতৃত্ব।রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপন তোলে শুকনো পাতার মর্মর।উষ্ণতার মোমগলানো ভালোবাসার ওম।ধীরে ধীরে তখন আলগা হয়ে যায় সমাজ সংসার বিধিনিষেধের বাঁধন।ও এসেছে দাবীদার হয়ে; আড়ালে ঢাকা সূর্যর জৌলুশ কে তো আর অমাবস্যা ঠেলে দিতে পারেনা।শৈবালেই তো বেড়ে ওঠে সবুজ পাতার সজীব ক্লোরোফিল।ও জয়ী হোক জীবন সগ্রামে।
আবার বুক ঠেলে কেন কান্না এল সুরমার?

রিয়ার বাচ্চাটা একা ঘরে কেঁদে উঠেছে।কিন্তু ওদিকে কর্ণপাত করেনা সুরমা। মাতৃত্বর দায় এখন আর এড়াতে পারবেনা।পারবেনা নিজের সন্তানকে দূরে ঠেলে দিয়ে অন্যর বাচ্চাকে আদরে সোহাগে বুকে টেনে নিতে।নদী তো খড়কুটো আঁকড়ে রাখেনা। খরস্রোতা নদীর তীব্র প্রবাহে ভেসে গেছে রিয়ার সন্তানের জন্য দায়সারা কর্তব্যবোধ।

ভোর হয়ে এল।
সূর্যের কুসুম আলোর এক চিলতে বিচ্ছুরণ জানালা দিয়ে এসে শিশুর মুখের ওপর পড়েছে। ও তখনও মায়ের শুকনো স্তনে একফোঁটা দুধের আস্বাদন খুঁজছে।

লেখকঃ কবি ও  সাহিত্যিক, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন