“আপাকে লেখা চিঠি”

সালমা তালুকদার

শ্রদ্ধেয় আপা,

পত্রের শুরুতে তোমার প্রতি রইলো আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তোমাকে চিঠিটা লেখার আগে আমি দু’রাত ঘুমাতে পারিনি। রাতের প্রহরগুলো তোমার সাথে গল্প করে, তোমাকে ভেবে কাটিয়ে দিয়েছি। অবাক ব্যাপার হলো, একবারও মনে হয়নি নিশুতি নিস্তব্ধ রুমে আমি একা। প্রথম রাত আমরা দু’জন কখনো মুখোমুখি বসে… কখনো পাশ বালিসে হেলান দিয়ে… কখনো আমার রুমের জানালা দিয়ে আসা এক চিলতে চাঁদের উঁকিঝুঁকি আলোতে গা ভাসিয়ে কথা বলেছি। সকাল হলে প্রার্থনা করেছি পরের রাতে যেন তোমাকে পাই। পাইনি আপা। পরের রাতটা তোমায় ভেবে কাটিয়েছি। পুরো সময় আমার রুমের জানালা দিয়ে আসা সেই চাঁদের দুষ্ট মিষ্টি হাসিতে গা ভাসিয়ে বসে থেকেছি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তাই হয়তো তোমার কথাই ব্যস্ততার ফাঁকে ভীষনভাবে ভাবনায় আসে।

আমি চিঠির যুগের মানুষ আপা। প্রেমিককে প্রচুর চিঠি লিখেছি। বিয়ের পর অবহেলিত আমি খুব যত্ন করে রেখে দেয়া চিঠিগুলো নিজ হাতে পুড়িয়েছি। চিঠি পুড়েছে সেই সাথে আমার অন্তরের কষ্ট পাথরেরা কান্না ঝেড়ে ফেলে আরো কঠিন হয়েছে। তুমি আমার সবটাই জানো। কিন্তু আমি তোমাকে জানি না। সেই না জানার অতৃপ্তি থেকে তোমাকে জানার বাসনা জেগেছে মনে। হয়তো তোমার ভালোবাসাময় মনটা সেজন্যে দায়ী।

আপা, আত্মার আত্মীয়কে আমার পরম কাছের মনে হয়। সেটাও তোমার কারনে। জীবনের অর্ধেক চলে যাওয়ার পর যে মানুষটাকে আমি চিনেছি সে তো কোনোদিন আমার অপরিচিত ছিল না। সেটা পরে বুঝেছি। আমি মানুষ ভীষন ভালোবাসি। মানুষই আমার লেখার বিষয়। নানা রঙ্গের মানুষই তাদের নানাবিধ কার্যকলাপ দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি মানুষ ভালোবাসে সে কোনদিন নিজেকে নিঃস্ব ভাবে না। একা থেকেও সে মানুষের মাঝেই থাকে।

চিঠিটা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে আপা। কিন্তু তোমার সাথে যে ঐ রাতে আরো দীর্ঘ কথা বলেছি আমি। সেই কথাগুলোর জন্যেই তোমার প্রতি উপলব্ধি থেকে আজ চিঠি লিখছি। কথাগুলো সরাসরি তোমাকে বলতে পারতাম না। বলিনি কারন, আমার ভাবনা মিথ্যাও হতে পারে। হয়তো যা ভেবেছি তুমি তার ঠিক উল্টো। কিন্তু কথাগুলো না বললেও যে আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না।

আবার অনেককাল বাদে কেন যেন চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে। বিষয় একটা আছে বলে বসে গেছি চিঠি লিখতে। চিঠিটা তোমার হাতে পৌছবে কিনা জানি না। আমিই হয়তো পোস্ট করবো না। জানো তো খেয়ালি মানুষ আমি। তবে কোনো কারনে চিঠিটা হাতে পেয়ে গেলে, আমাকে জানাতে ভুলো না আমি ভুল কি সঠিক।

আমার উপলব্ধি, তুমি জীবনে অনেক ছুটোছুটি করেছো। একটা প্রেমময় মন ছিল তোমার। তুমি অনেক ভালো ছাত্রী ছিলে। তুমি একজন সৃজনশীল মানুষ। কিন্তু কম বয়সের একটা ভুল সিদ্ধান্ত এক লহমায় তোমার জীবনের পুরো দৃশ্যপটই পাল্টে দিল। কিংবা বলতে পারি তোমার জীবনে এমন রঙের উদ্ভব ঘটবে বলেই হয়তো ঐ ভুলটা তোমার হয়েছিল। জীবন বড় বৈচিত্র্যময় আপা। কখন, কেন, কি এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বৃথা। বরং যখন যেমন তেমন করে বেঁচে থাকাটাই আসল।

আপা, তোমার জীবনের অনেক বড় একটা অংশ তুমি তোমার প্রেমিককে দিয়েছো। তোমার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েও একটা নোংরা লোকের মন পেতে চেয়েছো। লোকটা তোমাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতন করেছে, এখনো করছে। তবু তুমি তার ভালোবাসার পরশই পেতে চেয়েছো তোমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে।

আমি তোমাকে এই জায়গাটায় বোধহয় খুব গভীরভাবে চিনি। তুমি অনেক রুচিশীল একজন মানুষ। রুচিশীলতা ও ভদ্রতা তোমার অলংকার। তুমি অনেক মায়াবতীও বটে। তোমার অজান্তে তোমার চাওয়া পাওয়া গুলোর কোরবানি হয়েছে, অথচ তা যেন তুমি দেখেও দেখোনি। কারন তুমি পরিবর্তন মানতে পারো না। ভালোবাসার কাঙ্গাল মানুষটি তুমি কখনো ভালোবাসা পাওনি অথচ মায়ার বন্ধনে সবাইকে আটকে রেখেছ। সেখানে নিজের কষ্টকে দেখেও না দেখার ভান করেছ।

এক সময় পুরুষ সঙ্গী অনেক চেয়েছো। কারন প্রেমময় মনটা তোমার কখনো তার ঠিকানা খুঁজে পায়নি। কিন্তু তোমার এই সুন্দর মনটিকে কেউ বুঝতে চায়নি। তুমি চেয়েছো মানসিক ও শারিরীক শান্তি। আর পুরুষ তোমার মাঝে খুঁজেছে প্রথমে শারীরিক পরে মানসিক স্বস্তি। যদিও তাদের শারীরিক ক্ষুধা নিবারনের লোক আছে। এ সবকিছুতে তুমি বিরক্ত।

পরবর্তীতে একজন নারী তোমার জীবনে এলো। ততোদিনে পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজন তোমার ফুরিয়েছে। কিন্তু খুব করে একজন বন্ধু তুমি চাইছিলে। এতদিনের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রবঞ্চনায় ত্যক্ত, বিরক্ত তুমি কোনোভাবেই নিজেকে কোনো বাঁধনে বাঁধতে চাওনি। কিন্তু মেয়েটা তোমাকে সেই শান্তি দিয়েছে যেখানে তুমি বন্ধুত্বের স্বাদ পেয়েছো। একজন ভালো বন্ধু খুঁজতে থাকা মানুষটা কোনোদিন বন্ধু পাওনি। যাকেই আঁকড়ে ধরে শান্তি পেতে চেয়েছ, সেই বেইমানি করেছে….হঠকারিতা করেছে। সেই জায়গা থেকে মেয়েটিকে তোমার পরম আপন মনে হয়েছে। উজাড় করে তোমার ভেতরের জমানো মমতা সব ঢেলে দিয়েছো। কিন্তু আপা তুমি কি জানো, মেয়েরা এখনো জানে না তারা কি! জানে না হিংসা, অহংকারের মত বাজে রিপুগুলো তাদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। তুমি যতই ভালোবাসা দিয়ে তোমার স্বজাতীকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ তোমার গলা টিপে ধরবে।

আপা তুমি আমার মায়ের পেটের বোন নও। কিন্তু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছো সে ভালোবাসা অনেক বোন তার বড় বোনের কাছে পায় না। জানো আমার ছোটবোনকে নিজের সন্তানের মত দেখেও প্রতি পদে পদে তার উদ্যত ধারালো ছুরির আঘাতে প্রতিবার রক্তাক্ত হয়েছি। তুমি তো জানো এই ধারালো ছুরি মানে সুন্দর মুখের নোংরা ভাষা।

যাই হোক, তুমি ভালো থাকো আপা। সব সময় আমি এই দোয়া করি। জগতে কিছু মানুষ থাকে যারা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও সুখ পাখিটাকে ধরতে পারে না। আমার দেখা তুমি সেই জন। অর্ধেক বয়স তোমার শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস কখনো ফেলতে পারনি। তোমার সুন্দর ঠোঁটে এক চিলতে হাসির কারন হতেও মানুষের কত কার্পন্য। অথচ সেই তুমি সবার মুখে উজাড় করা হাসি দেখতে কতটা উদগ্রীব। এখানেই বোধহয় নারীর ঔদার্য…এখানেই নারীর শ্রেষ্টত্ব…তুমিও হয়তো কোনো অসামান্য নারীর কাছ থেকে হাসতে শিখেছ। সত্যি বলতে, আমি তোমার কাছ থেকেই দুঃখ ভুলে সুখকে আলিঙ্গন করতে শিখেছি।

ইতি
তোমার ছোট বোন।

সালমা তালুকদার – সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন