আমারও একটি বোন ছিল

মাসুদুল হাসান রনি
রাত পোহালে ২২ নভেম্বর। আমাদের পরিবারের বেদনার একটি দিন। এদিনে আমি হারিয়েছি আমার একমাত্র বোনকে। দেখতে দেখতে ৩৪ বছর হয়ে গেল আমার বোন নেই আমাদের সাথে। কি করে ভুলি তাকে?

আমার পক্ষে ভূলে যাওয়া সহজ নয়। সে যে ছিল আমার সব কাজের প্রেরনা, না থেকেও দুর হতে আজো আমার সব কাজের প্রেরনা হয়ে আছে প্রিয় বোনটি।

নভেম্বর মাস এলেই আমি কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে থাকি। বোনের চলে যাবার কিছুদিন আগে থেকেই পাগলের মতন একা একা বিড়বিড় করে কত কথা বলি তার সাথে। আমি মনের আয়নায় দেখি, সে আমার কথা শুনে হাসছে।

জানিস, তুই হাসলে তোর দু’গালে কি সুন্দর টোল পড়ে?
কত খুনসুটি, কত ঝগড়াঝাটি তোর সাথে হতো। সুকুমার রায় সমগ্র, সত্যজিৎ রায় সম্পাদিত সেরা সন্দেশ, শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা সব বই, নারায়ণ গংগোপাধ্যায়, লীলা মজুমদারের বই ছিল তোর অসম্ভব প্রিয়। এসব বই কে আগে পড়ব, তা নিয়ে দু’জনের কত টানাটানি।আমাদের টানাটানিতে অনেক সময় বই ছিঁড়ে যেত।

মনে পড়ে তুই একবার আম্মাসহ কোলকাতায় গেলি শিশিরমঞ্চে নাটকে অভিনয় করতে।নাটকের নাম ছিল স্পার্টাকাস বিষয়ক জঠিলতা। তোর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, নাট্যকার, পরিচালক তাপস ব্যানার্জী। তাদের মতন গুনীজন নাটক শেষে গ্রীনরুমে এসে তোকে শুধু অভিবাদন জানায়নি, স্বহস্তে প্রশংসা লিখে দিয়েছিলেন। তোর অবর্তমানে যা আজো আমি সযত্নে আগলে রেখেছি।এটাই ছিল তোর প্রথম ও শেষ মঞ্চ নাটক। কারন তোর ছিল পড়াশুনোর প্রতি ভীষন দূর্বলতা। সব সময় পড়াশুনোটাকে প্রায়োরিটি দিয়েছিস। বিটিভিতে অনেক নাটকের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিস।

আমলাপড়া গার্লস স্কুলে ক্লাস সিক্স হতে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ার সময় প্রতিবছর বার্ষিক স্পোর্টসে সারা স্কুলের মেয়েদের হটিয়ে তুই টানা ৩ বছর চ্যাম্পিয়ান হয়েছিস। ১০০ মিটার, লং জাম্প ও ২০০ মিটার দৌড়ে কেউ তোকে কখনো টপকাতে পারেনি। তিনটি খেলায় প্রথম হয়ে চ্যাম্পিয়ানের ট্রফিটা তার হাতে শোভা পেত।সেই ট্রফিগুলোর সবই আছে আম্মার কাছে।
তোর চলে যাবার আগে আমার প্রি-টেস্ট পরীক্ষা ছিল । ঠিক এই সময়্টাতে আমি প্যারা টাইফয়েডে মাসাধিকাল ভুগে মাত্রই সুস্থ হয়েছি ।

এর কিছুদিন পর আমার একমাত্র ছোটবোন ৪/৫ দিনের অসুস্থ থাকার পর হঠাৎ করে না ফেরার দেশে চলে গেল । আজো বুঝি না কোন অভিমানে, কি তাড়ায় চলে গেল।

তার আগে একদম অবুঝ অবস্থায় পরিবারে দাদা ও মেঝচাচীর মৃত্যু দেখেছি । তখন এতটা ছোট ছিলাম যে মৃত্যু কি বুঝতাম না । বোনের মৃত্যু আমাকে ভীষন নাড়া দিয়ে যায় । আজো তাকে খুঁজি লিজা, নীলা, সনি, পলি,শম্পা,দোলা, পিয়া, তানিয়া ও অন্য বোনদের মাঝে।

দুরপ্রবাসে বসে বাবাকে হারানোর বেদনা আমাকে যতোটা মুষড়ে দিয়েছে, তার চেয়ে বেশী চিন্তিত হই মায়ের একাকীত্ব নিয়ে, তখনই মনে পড়ে এ সময়ে মায়ের নিঃসংগতা কাটিয়ে তুলতে কতটা জরুরী ছিল তার উপস্থিতি।

আমার বন্ধুদের মুখে যখন শুনি বোনদের নিয়ে তাদের কত কথা, আনন্দ, স্নেহ ভালবাসার গল্প। তখন দীর্ঘশ্বাস
আড়াল করে ভিজে যাওয়া দু’চোখ মুছি। মনে মনে বলি,আমারও একটা বোন ছিল। জানি না সে হারালো কোন অজানায়!

আমার পিঠাপিঠি সেই বোনের আগামীকাল রবিবার মৃত্যুদিন ।দেখতে দেখতে কতগুলি বছর চলে গেল ! আমি কখনই ভাবি না সে আমাদের মাঝে নেই ।
মনে হয় এইতো সে। বাইরে গেছে ,এক্ষুনি ফিরে আসবে !

  • ২১.১১.২০২০
    লেখক: কলিমিস্ট, কানাডা  প্রবাসী
আরও পড়ুন