আসুন সমাজটাকে বদলাই

ফারহানা শারমীন জেনী

কর্তার ওপর ডাক্তার সাহেবের কঠিন নির্দেশ সারাদিন যায় করেন যত জায়গায় ঘোরেন রুটিনের একটানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাটা এটা আপনাকে হাঁটতেই হবে!!! আর এটা যদি না হাঁটেন তাহলে শুধু শুধু আমাদের এখানে এসে গাদাগাদা ঔষধ আর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে উপকার কি? ডাক্তার সাহেবকে হেসে বললাম আজ পাঁচবছর ধরে হাঁটা নিয়ে চলে ঠান্ডা লড়াই। আমি যখন সকালে হাঁটার কথা বলি তখন তিনি বলেন বিকালে।বিকালে হাঁটার কথা বলি তখন তিনি বলেন সন্ধ্যায়।সন্ধ্যায় হাঁটা যখন মোটামুটি রেগুলার হয়ে গেল তখন শুরু হলো আরেক অযুহাত। যাই হোক সবশেষে এবার তার একটু হলেও ভয় হয়েছে হয়তো। বিকেলে হাঁটতে রাজী!
বাড়ির পাশে সবুজ মতিহার চত্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। দৃষ্টি নন্দন প্যারিস রোড। আমার কর্তাবাবুর জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বৈবাহিক বন্ধন সবরকম অম্লমধুর স্মৃতিগুলো তার এই প্রিয় ক্যাম্পাস ঘিরে। ডাক্তার তাকে প্রানখুলে বেড়াতে বলেছেন।কেহ দূরে যাওয়ার মতো অবস্থা এখন নেই এজন্য এই মতিহার প্রাঙ্গনে হাঁটতে যেয়ে স্মৃতিরোমন্থন আমাদের ভ্রমণের সমপরিমাণ অক্সিজেন দেয়।
বন্ধ থাকার কারণে মানুষের সংখ্যা যদিও কম তবুও খুব কম বললে ভুল হবে। জায়গায় জায়গায় ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে ঘোরাঘুরি, লাইব্রেরি বা নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের বারান্দায় চলছে গ্রুপস্টাডি পাশেই বড় রেইনট্রিতে বেলাশেষে ক্লান্ত অতিথি পাখির কিচিরমিচির।
গতপরশু হাঁটছি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম, গোডাউন এবং মেডিকেল সেন্টারের রাস্তা ধরে।দুটো বিশ একুশ বছরের ছেলেমেয়ে হেঁটে যাচ্ছে আমাদের সামনে সামনে। মেয়েটা খুব সুন্দর করে একটা আঁকাশি হিজাব পরে আছে আর সাথে বড়সড় ঢিলাঢালা জামা।মোটামুটি ধর্মীয় পোশাকে আবৃত।বেশ সুন্দর। ছেলেটি বেশ শিশুসুলভ চেহারা।আমি আর আমার কর্তা ওদের দেখার পর থেকেই সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়েই কথা বলছি।ওরা হয়তো খেয়ালই করেনি পেছনে আমরা।খুনসুটি ময় গল্প করছে হয়তো কারণ মেয়েটি দেখলাম হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে ছেলেটির গায়ে ঢলে পড়লো আর ছেলেটি মেয়েটির গলা এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরলো যা ছিলো ভিষণ অশোভন। আমার শুধু পেছন থেকে মনে হলো দু’জনকে দুটো থাপ্পড় দিতে পারলে শান্তি হতো।হয়তো মেয়েটি বাড়িতে বলে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ স্টাডির কথা আর আমরা যারা ছেলের মা তারাতো পুত্র কোথায় কি করছে জানতে চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনা। শুধু পুত্র বিয়ে দেয়ার পরে তার বৈবাহিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে আমরা তখন আদব শেখানোতে ব্যস্ত হয়ে উঠি।
আমার মনে তখন হাজারো চিন্তার ঝড়। এরকম কতশত মেয়ের কত দূর্ঘটনা ঘটছে কতশত মেয়ে চুপিচুপি লজ্জা ঢাকছে। তখন আমি আমার অতিতকে স্মরণ করি আর আমার বাবামায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সৃষ্টিকর্তার কাছে লুটিয়ে পড়ি।আমি যে পরিমাণ স্বাধীনচেতা ছিলাম তাতে আমার বাবা-মা তখন যেভাবে আমাকে বুদ্ধিমত্তা ও কাঠিন্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন নাহলে হয়তো আরও অনেক কিছু ঘটতে পারতো।তবে সেই সময় বোধহয় আমরা স্বাধীনচেতা হলেও আজকের ছেলেমেয়েদের মতো এতো বেহায়া ছিলাম না। আমরা বন্ধুদের সাথে যথেষ্ট আড্ডা দিয়েছি কিন্তু এতটুকু সেন্স ছিলো শরীরে টাচ লাগা যাবে না। আমি স্কুলে পড়া কালিন নিতু আপার ছিলাম অন্ধভক্ত। তিনি আমি যখন ক্লাস সিক্সে তিনি একদিন গল্পে গল্পে আমাকে ব্যাড টাচ সম্পর্কে অনেক ধারণা দিয়েছিলেন যেটা আমার জন্য ছিলো একটা আশীর্বাদ।
আমরা কঠিন এক ক্রান্তির মুহূর্তে অবস্থান করছি।আমাদের এখন সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। বাবা-মাকে হতে হবে সন্তানের পরম বন্ধু নির্ভরতার জায়গা।একঘেয়েমি পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। মনখুলে কথা বলার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সাথে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্য থাকার জায়গাটা তৈরি করতে হবে। ভয়মিশ্রিত পরিবেশ এবং আশ্রয় প্রশ্রয় কোনটাই সঠিক নয়। আমার এক বন্ধু যে বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সে আমাকে আমার মেয়ের পড়ালেখায় আগ্রহ সৃষ্টির জন্য অনেক সুপরামর্শ দিয়েছিলো তারমধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি ছিলো “প্রশংসার অযোগ্য হলেও প্রশংসা করো তারপরে তার ভুলগুলো বলো সে তোমার কথা মেনে নিতে বাধ্য।” আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিলোঃ “একঘেয়েমি আলোচনা ব্যস্ত থেকোনা,আচরণ শেখানোর পরিবেশ একঘেয়েমি করোনা। ” সত্যি আমি ভালো ফল পেয়েছি তাতে।
বাবা-মায়ের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেউ যদি এসে আপনার সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে এমন কোন অভিযোগ করে তবে তাকে পরম মিত্র ভাবুন প্রথমে তারপর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রয়োজনে সন্তানকে কঠোরভাবে নিয়মে আনুন।যদিও এখন সন্তান আইনের আশ্রয় নেয়ার ক্ষমতা রাখে।আইনি লড়াইয়ে যেতে হলে যাবো এইমনোভাব নিয়ে কঠিন অন্যায়গুলো কঠোরভাবে মোকাবেলা করুন। তবে কঠোরতার প্রয়োজন খুব একটা হবে না যদি শুরুতেই আপনি তার কাছে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারি। আমার বাবা-মা সবসময় বলতেন ” মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ভুল করা ভুল থেকে মানুষ শেখে। কিন্তু এই ভুলকে স্বীকার করতে পারা সাহস থাকতে হবে। আর তিনজন ব্যাক্তির কাছে কখনও কোন কথা গোপন করবে না তাহলো স্বামী, পিতা ও মাতা।আমি তখন আমার বাবাকে বলেছিলাম “স্বামীর কথা কেন আগে বললে?” তিনি বললেন “স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের মাধ্যমে একটা পরিবারের শুরু। এজন্য স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ে যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আলোচনা থাকবে তখনই সেই পরিবারে সমৃদ্ধি থাকবে”।এবং সাথে তিনি এটাও বললেন এগুলো একটাও আমার কথা নয় সব কুরআনের কথা।
একাত্তর সালে পাক হানাদার বাহিনীর ধর্ষন বা বিশ্বযুদ্ধের নারী নির্যাতন আর আজকের এই ধর্ষণ উৎসব কোনটাই কোনটার চাইতে লঘু নয়।আমাদের মেরুদণ্ড ভাঙ্গার আগেই একে রিপেয়ার করা প্রয়োজন। একটা পরিবার একটা শক্ত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হোক প্রতিবাদ আন্দোলন। সন্তান বাৎসল্য থেকে আমাদের বের হওয়া ছাড়া কোন মুক্তি নেই। একজন ভালো ছাত্র তৈরির আগে একজন ভালো মানুষ তৈরি করুন। নীতিনৈতিকতায় আগে তাকে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দিন। একটি সমাজ নীতিনৈতিকতা ছাড়া উন্নতি লাভ করতে পারেনা।আসুন আজ থেকেই বদলায়। একজন স্ত্রীকে সম্মান করতে পারলে সেই পরিবারের পুত্র সন্তানটি সকল নারীকে সম্মান করতে শিখবে।এজন্য আমরা যারা স্ত্রীকে সবসময় উপহাসের পাত্র বানায়,সমালোনায় মুখের থাকি তারা নিজের সন্তানের স্বার্থে বদলায়।
সৃষ্টিকর্তা খুব সুন্দর পরিপূর্ণ একটি জীবন বিধান দিয়ে আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সেই জীবন বিধান সঠিক ভাবে অনুসরণ করলে ইহকাল পরকাল সর্বত্রই আমরা মুক্তির আলোই উদ্ভাসিত হবো।সুন্দর একটা পৃথিবীর প্রত্যাশা আমাদের সবার।
লেখকঃ শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সহ- সম্পাদক, মহীয়সী 
আরও পড়ুন