“এ দেশে ধর্ষণ হবে না তো কোন দেশে হবে!”….

মাহাফুজা শিরিন

“এ দেশে ধর্ষণ হবে না তো কোন দেশে হবে!” এ কথাটি খুব খারাপ কথা কিন্তু এই খারাপ কথাটি আমার সামনেই বলেছিলেন, একজন পুরুষ যিনি কিনা নামাজে যাচ্ছিলেন। মসজিদের কাছেই ছিল কমিউনিটি সেন্টার, সেখানে একদল কিশোরী মেয়েরা কালার চুলে, রঙিন ফুলে সেজেগুজে ডলের মত দাঁড়িয়ে ছিলো, বরকে বরন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
উপরে উল্লেখিত কথাটি যিনি বলেছেন, তিনি ঐ মেয়েগুলোর বাবার বয়সি ছিলেন। আর যারা মাথা কাত করে তার সাথে একমত পোষন করেছিলেন, তারা ছিলেন ঐ মেয়েগুলোর দাদা কিংবা নানার বয়সি। ঘটনাটি কয়েক মাস আগের ঘটনা। যখন বেগমগঞ্জের নিরীহ মেয়েটির ধর্ষণের খবরে আর সিলেটের এম সি কলেজে স্বামীর সাথে ঘুরতে বেড়িয়ে স্ত্রী নির্মম ভাবে ধর্ষিতা হওয়ায় সারাদেশ ফুঁসে উঠেছিলো। যখন বেগমগঞ্জের সেই ধর্ষিতা মেয়েটির আত্নচিৎকারে প্রকম্পিত হয়েছিল বাংলার আকাশ-বাতাস, যখন দেশের বেশির ভাগ মানুষই ক্ষেপে গিয়েছিলেন ধর্ষকের বিরুদ্ধে,তাদের কঠোর শাস্তির দাবীতে।
ঠিক সেই সময় দেশের এই গমগমে পরিবেশেও তারা মেয়ের বয়সি মেয়েদের পর্দা না করার অপরাধে ধর্ষণ কামনা করলেন। সত্যিই কি এর শাস্তি এরকম ভয়াবহ হতে পারে? না কি হওয়া উচিৎ?

তখন কেউ কেউ আবার মেয়েদের দিকে আঙুল তুলতেও দিধা করেন নি, এমন কি তাদের মধ্যে কিছু নারীরাও ছিলেন। যেমন কেউ কেউ বলেছেন:
“”স্রেফ একটা সাবান,পারফিউম, ব্লেড এমনকি পুরুষের শেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনেও বাধ্যতামূলকভাবে থাকবেন লাস্যময়ী একজন নারী। মোবাইল এক্সিবিশনে মোবাইলের পাশে শরীরের সব ভাঁজ প্রকাশ করে দাঁড়ানো থাকবেন স্বল্প বসনা নারী। স্টেডিয়ামে খেলার ফাঁকে ফাঁকে নারীকেই বানরের মতো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিয়ার আপ করা লাগবে, নতুবা নাকি খেলাটা ঠিক জমেনা। এসব নারীদের দেখলেই নাকি পুরুষের যৌন খুধা বেড়ে যায়।
একজন বখাটে যুবকের সামনে এত্তসব যৌন সামগ্রী উপস্থাপনের পর কীভাবে নিজেকে সামলাবে!
আহা!যৌন উত্তেজনায় উত্তেজিত পুরুষদের পক্ষে কত সুন্দর কথা। যাই হোক সমাজের মানুষের এসব কথা কে উপেক্ষা করে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মির্ত্যুদন্ড করতে।
অনেক কষ্টের পর শাস্তির ব্যাবস্থা তো হলো, অর্থাৎ ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি মির্তু্দন্ড। কিন্তু তারপরও কেনো ধর্ষণ কমছে না। তবে কি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যে যার স্থান থেকে যে মত তুলে ধরেছেন সেটাই সঠিক?
তাহলে চলুন আজকেই আমরা সবাই নেমে পড়ি, আবার দেশের সবাই একসাথে ফুঁসে উঠি। মিছিল করি, সভা করি,সমাবেশ করি আমাদের দাবী থাকবে কখনো কোন নারী বোরকা ছাড়া বেরোতে পারবেনা। বিজ্ঞাপনে দেখা যাবে না শরীরের ভাজ দেখানো কোন নারীকে। লাস্যময়ি কোন নারীর ছবি থাকবেনা যুবকদের চোখের সামনে।
ধরুন, কালকে আমরা সফল হয়ে ফিরে এসেছি। আমাদের দাবী পুরন হয়ে গেছে। কিন্তু এরপর কি আমরা আশা করতে পারব যে আর কখনো ধর্ষণ হবে না?
নিরাপদে থাকবে, মায়ের পাশে ঘুমানো কন্যা শিশুটি? যুবতি মেয়ে, মা, ষাট বছরের বৃদ্ধা নির্ভয়ে একা পথ চলতে পারবে ? আমার আপনার ফুলের মত বোন নুসরাতদেরকে বাবার বয়সি মাদরাসা শিক্ষক শ্লিলতাহানী করবে না তো, এরপর এর জন্য বিচার চাইতে গেলে তাকে আগুনে পুড়ে মারবে না ? মাদরাসায় পড়তে যাওয়া ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেরা বলৎকরের শিকার হবে না। অভাবের তারনায় পেটে খুধা নিয়ে , কাজ করতে আসা কাজের মেয়েটার উপর খুর্ধার্ত কুকুরের মত রাতের অন্ধকারে ঝাপিয়ে পড়বে না ঘরের কর্তা ? স্বামীর সাথে ঘুরতে বেড়িয়ে বোরকা পরিহিতা নববধূ ধর্ষিতা হয়ে ঘরে ফিরবে না। আপনার স্ত্রী কিংবা মাকে গভীর রাতে চিকিৎসা দিয়ে একজন অভিজ্ঞ নারী চিকিৎসক নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে তো, নাকি তাকে টেনে-হিচরে অচেনা কোন পুরুষ নামের হিংস্র জানোয়ার নিয়ে যাবে কোন অন্ধকার গলিতে?
আর পিরিয়ডের দিনে পরনের কাপরে চট বেধে থাকা রাস্তার ধারের সেই পাগলিটা, যার মাথা ভর্তি উকুন,গায়ে দুর্গন্ধ, দাতে ময়লা, নোংরা শরীর। সেই পাগলিটা যেসব পুরুষ নারীদের পোশাক নিয়ে কথা বলে , যারা আটসাট করে পরা পোষাকে নারীদের দেখলে যৌন পীপাসায় কাতর হয়ে যায়। তাদের মধ্যে কারো দারা ধর্ষিতা হয়ে পেগন্যান্ট হবে না তো?
সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সবাই নিরাপদে থাকবে??
যদি উত্তর আসে না, তাহলে কেনো???

তাহলে ধর্ষনের জন্য কি দায়ী। বিকৃত মানুষিকতা নয় তো? যে মানুষিকতার অদৃশ্য বীজ আমরা সমাজের কেউ কেউ নিজেদের অজান্তেই বপন করে দিচ্ছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। নারীর প্রতি অসন্মান, অবহেলা করে তাদের প্রতি অব মুল্যায়ণ করে তাদের কে পর্দা করতে উৎসাহ না যুগিয়ে তাদের কে কুমন্তব্য করে। নারীকে সহজলভ্য মনে করে।

অনেকে হয়ত মনে করতে পারেন , যে সকল নারী নিজেদের পোষাক সম্পর্কে উদাসীন কিংবা যে সকল নারীগন পর্দা করে না আমি হয়ত তাদের হয়ে কথা বলতে এসেছি।অথবা যারা নারীদের পোষাক নিয়ে কথা বলে আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি।উল্লেখিত এই দু’টি বিষয়ের কোনটির সাথেই আমি একমত নই। আমি নিজেও আলেম পরিবেশে বড় হয়েছি।বিয়ের পর মেয়েরা নানা রকম না পাওয়া নিয়ে ভোগে। নানা ধরনের অপুর্নতা থাকে। আমার যে না পাওয়া ছিলো, বা যা অপুর্নতা ছিল তা হলো, মনের মত পর্দা করতে পারিনি।
বিভিন্ন সময় অভিজ্ঞ আলেমগন নারীদের পোশাক নিয়ে কুরআন হাদিসের আলোকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করে থাকেন নারীদেরকে উতসাহিত করেন পর্দা করার জন্য। যুবক কিংবা পুরুষদের আমল আখলাক ঠিক রাখার জন্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুনিপুণ ভাবে মতামত দিয়ে থাকেন। এ জন্য আমার তাদের প্রতি রয়েছে অগাধ সন্মান কারন তাদের এই ওয়াজ মাওহফিলের জন্য সমাজের বেশ কিছু নারী-পুরুষগন সুপথে আসার চেষ্টা করে।
কিন্তু বাকিটা?আমাদের সমাজ কে বাঁচাবে??

আমি নিজেও পর্দা করতে পছন্দ করি।চেষ্টা করি বাহিরে পথ চলার সময় নিজেকে বোরকায় আবৃত রাখতে। আমি চাই সমাজের সবাই এভাবে চলুক। কিন্তু সমাজের সবাই আমার আপনার রুচিমত পোষাক পরবে না এটাই স্বাভবিক। সবাই অভিজ্ঞদের দেখানো সুপথে হাটবে না, তাই বলে তাদেরকে ধর্ষণ করতে হবে।
মানে তাদের ধর্ষণের মত শাস্তিই প্রাপ্য?
তবে একথাও ঠিক যে, বর্তমানে যুব সমাজ মোবাইল ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে প্রায় ধংসের পথে। বেড়েছে জেনা-ব্যাভিচার। খারাপ নারী-পুরুষরা করছে অবাধে মেলামেশা।ঘরে ঘরে অশান্তি, ভাঙছে সংসার। যদি নারী-পুরুষ উভয়ে পর্দা করে, সচেতন হয়। তাহলে হয়ত, আমাদের সমাজ থেকে জেনা-ব্যাভিচার কমে যাবে অনেক গুন।হয়ত অবাধে মেলেমেশার কারনে আর কোন নারী গর্ভে পয়দা হবে না কোন পাপের ফসল। নোংরা ডাষ্টবিনের কাছে পড়ে থাকা অবৈধ শিশুর সংখ্যাও হয়ত কমে যাবে।
কিন্তু ধর্ষণ কমবে কী??

ব্যাভিচার আর ধর্ষণ এ দু’টো অপরাধই সামাজিক,নৈতিক ও ধর্মিয় দিক থেকে খুবই জঘন্য ও ঘৃন্য। তবে ব্যভিচারের শাস্তি যতটা ভয়াবহ হওয়া দরকার ঠিক ততটা ভয়াবহ হওয়া দরকার ধর্ষনের শাস্তি।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখছি ব্যভিচারের জন্য দায়ী থাকে নারী-পুরুষ উভয়ে। আর ধর্ষণের জন্য দায়ী থাকে শুধু মাত্র বিকৃত মানুসিকতার পুরুষ যার শিকার হয় ছোট অবুঝ কন্যা শিশু থেকে শুরু করে, যুবতি, মা,বোন,বৃদ্ধসহ সাবাই।

পোড়াকপালি আনুষকার পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব ছিলো নাকি সুবুদ্ধির অভাব ছিল আমি জানি না। যে কারনে ভুল করে দু’মাসের পরিচয়েই প্রেমের পথে পা বাড়িয়ে ফাকা বাসায় গিয়ে ধরা দিলো, প্রেমিক পুরুষের পাতা ফাঁদে। রক্ত ঝড়িয়ে মৃর্ত্যুর সাথে আলিঙ্গন করে দিলো ভুলের মাশুল।
তবে আমি এতটুকু বলতে পারি, দিহানের পারিবারিক শিক্ষার অভাবের পাশাপাশি সামাজিক শিক্ষার যথেষ্ট অভাব ছিলো। দিহান যে সমাজে বড় হয়েছে, সেখানে ছোট বেলা থেকেই দেখে এসেছে, বেশির ভাগ পুরুষদের কাছেই নারীরা নিরাপদ নয়। সে দেখেছে বাবার বয়সি পুরুষেরা কিশোরী মেয়েদের সৌন্দর্য চোখ দিয়ে চুষে চুষে উপভোগ করে আর তাদের ধর্ষণ কামনা করে। ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছে, ধর্ষণ কোন বড় ধরনের অপরাধ নয়। এখানে সুযোগ পেলেই ধর্ষণ করা যায়। তাকে শিখানো হয় নি পর্দার গুরুত্ব। অবগত করা হয়নি জেনা ব্যভিচারের কুফল সম্পর্কে। যার কারনে দিহান প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে নিজের যৌন লালসা চরিতার্থ করতে দিধা করেনি।

সমাজ থেকে এসব অন্যায় কমাতে হলে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা জেনা-ব্যভিচার,ধর্ষণ, মিলিয়ে গুলিয়ে তাল-গোল পাকিয়ে নারী পুরুষ একে অপরের দিক কাঁদা ছোড়াছুঁড়ি করলে, সমাজে অন্যায় অবিচার বেড়েই চলবে।
নারীদের সুশিক্ষা আর শাসনের পাশাপাশি পুরুষদেরও দিতে হবে সুশিক্ষা।করতে হবে শাসন। আমরা শতভাগ যুবকদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে না পারলেও যুব সমাজের একটি বিরাট অংশকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের ব্যার্থতা, আচরণ এবং কৃতকর্মের ফলে যদি সমাজব্যবস্থা বসবাস অযোগ্য হয়ে যায়, তখন সমাজ আমাদের সবাইকে দায়ী করবে।
দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে ধর্ষণের ধরন।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন