খুলে দেওয়ার আগে ভাবতে হয়

ডাঃ আহমেদ জোবায়ের

প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক ও ছোট গল্পকার সাদাত হুসেন মান্টোকে নিয়ে আমি গত দুই সপ্তাহ বিস্তর লেখাপড়া করেছি। কোন সাহিত্যিককে নিয়ে টানা দুই সপ্তাহ আমি বিভোর ছিলাম না কখনোই।অনেকগুলো গল্প পড়েছি।নন্দিতার মান্টো সিনেমা নেটফ্লিক্সে দেখেছি।ব্রিটিশ ভারতের একজন মানুষ কতটা আধুনিক ছিলেন,কতটা দরদ দিয়ে মানুষের জীবন ও টানাপোড়েন দেখেছেন,দেশভাগের স্মৃতি ও দাঙ্গা নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী লেখা ভারত পাকিস্তানের কোন সাহিত্যিক লিখেননি।

খুব ছোট ছোট গল্প কিন্ত শরীরের রক্ত হিম করে দেয়।ভীষণ বিষাদে ভরিয়ে দেয় মানুষের হৃদয়কে।চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠে প্রতিটি ঘটনা।
বিবিসির জরিপে বিশ্বের সেরা একশো গল্পে স্থান পায় মান্টোর টোবা টেক সিং।তার ঠান্ডা গোশত গল্প পড়ে আমি স্তম্বিত হয়েছিলাম অনেকক্ষণ। অন্যদিন মান্টোর উপর বিশদ লেখা লিখবো।

আজকে খুল দো (খুলে দাও) গল্পটা নিয়ে কিছু কথা বলি-“অমৃতসর থেকে ট্রেন যাচ্ছে পাকিস্তানে।মাঝপথে মুঘলপুরে ট্রেনে শিখদের আক্রমণ।দাঙ্গা চলছে।হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে মুসলমান হবার কারণে।সিরাজ উদ্দিনের সামনেই তার স্ত্রীকে নাড়িভুঁড়ি বের করে হত্যা করা হয়।সাথে ছিলো মেয়ে সখিনা।১৭ বছর বয়সী সখিনার ডান গালে একটা তিল।শ্যামল মেয়েটি হয়েছে তার মায়ের মত।স্ত্রী যখন বললো,

সখিনাকে নিয়ে পালাও তখন রাস্তায় সখিনার ওড়না পড়ে গেলে সিরাজউদ্দিন তা উঠাতে গেলে সখিনা বলেছিলো,ওটা ওখানে পড়ে থাক বাবা।সিরাজউদ্দিন ওড়নাটা নিয়ে তার পকেটে রাখেন।ওড়নাটা আছে কিন্ত সখিনা হারালো কিভাবে ভাবছে সিরাজউদ্দিন।

রিফিউজি ক্যাম্পে শুয়ে শুয়ে ভাবছে সিরাজউদ্দিন।চারদিকে মানুষের ছোটাছুটি, আহাজারি।অনেকে নিহত,অনেকে আহত,অনেকে নিখোঁজ।৮ জন যুবকের দল আটকে পড়া নারী ও শিশুদের উদ্ধার করতে ভারতে আসে।সিরাজউদ্দিন তাদেরকে তার মেয়ের কথা বলেন।ডান গালের তিলের কথাও বলে দিন।

তারা রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে একটি যুবতী মেয়েকে দেখতে পায়।তারা মেয়েটিকে জেরা করলে মেয়েটি বলে সেই সখিনা।সেই ৮ জন মেয়েটিকে ট্রাকে করে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়।মেয়েটিকে তারা পালাক্রমে ধর্ষণ করতে থাকে কয়েকদিন।৮ জনের দলের সাথে সিরাজউদ্দিনের দেখা হলে তারা বলতো যদি তোমার মেয়ে জীবিত থাকে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে আসবো।সিরাজউদ্দিন জানেন না এরাই মেয়েটার সাথে পাশবিকতা চালিয়ে যাচ্ছে।

একদিন ৪ জন মানুষ একটা অজ্ঞান মেয়েকে স্ট্রেচারে করে রিফিউজি ক্যাম্পের হাসপাতালে নিয়ে আসে।সিরাজউদ্দিন এগিয়ে গেলেন।তিনি দেখে চিনলেন এইতো সখিনা।মেয়েটি অজ্ঞান,যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।ডাক্তার মেয়েটিকে পরীক্ষার জন্য এসেছেন।তিনি বেশি আলোর জন্য সিরাজউদ্দিনকে দেখিয়ে বললেন,খুল দো মানে খুলে দাও জানালাটা।আলো আসুক।

কিন্ত অদ্ভুতভাবে দেখা গেলো খুলে দাও বলার সাথে সাথে সখিনার হাত চলে গেলো তার পায়জামার ফিতেয়।সে পায়জামা টেনে খুলে দিলো।তার উরুদেশ দেখা যাচ্ছে।।ডাক্তার হতবিহ্বল হয়ে গেছেন।সিরাজউদ্দিন আনন্দে বলে উঠলেন, আমার মেয়ে বেঁচে আছে।অবচেতন মনে সখিনার পায়জানার ফিতে খুলে দেওয়া বুঝিয়ে দেয় কতটা নারকীয় পাশবিক আচরণের শিকার সে হয়েছিলো।

এই গল্প লেখার একটা উদ্দেশ্য ছিলো।কাল প্রথম আলোর একটা নিউজ লিংকে কমেন্ট করেছিলাম,

বিসিএস ক্যাডার শুনলেই পায়জামার ফিতে খুলে দিতে হবে?

চট্রগ্রামের এক মেয়ে প্রেমে পড়েন অভিজিৎ নামের এক যুবকের।যুবকটি তাকে প্রথমে বিসিএস পুলিশ পরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দেয়।বিয়ের প্রলোভন দেখায়।মেয়েটি অভিজিৎ এর বন্ধুর ফ্ল্যাটে যায়।।সেখানে তাদের শারীরিক মিলন হয় কয়েকবার।তারপর মেয়েটির সন্দেহ হয়।সে প্রথমে চুপ থাকলেও পরে তার বাবা মা কে জানায়।তারা বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা দেয়।

এই যে প্রেম,এই যে বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক মিলন তাতো দু’জনের ইচ্ছায় হয়েছে।মেয়েটিকে তো জোর করে তুলে নিয়ে রেইপ করা হয়নি।একটা ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েতো খুকি নয়।তার পায়জামা তো সে নিজেই খুলেছিলো।বিয়ের প্রলোভন মানে তাকে লোভ দেখানো হয়েছে,সেও লোভে পড়েছিলো।

লোভের কারণে প্রতারিত হওয়া কেন রেইপ হবে?এসব মামলা গুলোর জন্য প্রকৃত নিপীড়িত নারীদের মামলা ও বিচার পাওয়া এক বিনোদনে পরিনত হয়ে যায়।এখানে তো দুই পক্ষের দায় থাকে।মেয়ের মা বাবারও দায় থাকে।মেয়েটা নিশ্চয়ই বাবা মাকে মিথ্যে বলেই ছেলেটার বন্ধুর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলো।

নিজেকে এত সস্তা বানিয়ে ফেলবেন না।।কিছুটা বিবেক বিবেচনাবোধ রাখুন।।মানুষের হাসির খোরাক কেন বানাচ্ছেন নিজেকে।

আপনার নিজ ইচ্ছায় কারো সাথে শারীরিক মিলন নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।এটা যার যার চয়েজ।তবে যখন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাছিল হয়না,তখন এসে বলবেন না বিয়ের প্রলোভনে রেইপড হয়েছেন।

ছোট ছোট কচি বাচ্চাদের চকোলেট এর লোভ দেখানো যায়, একটা প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে লোভ দেখালেই সেই লোভী হয়ে পায়জামা খুলে দিবে তা কাম্য নয়।

লেখকঃ কলাম লেখক ও চিকিৎসক

আরও পড়ুন