চরিত্রহীনের পরামর্শ

মতিউর মিয়াজী

নীলাকে পড়ানোর জন্য এক মাস পর টিউশনিতে আসলাম। পড়ানো শুরু করার জন্য বসতেই নীলা
ভুরু কুঁচকে বললো,
– স্যার আপনাকে আর আসতে হবে না।
আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হলাম। দু’বছর ধরে তাকে পড়াচ্ছি। নবম শ্রেণী থেকে এবার দশম শ্রেণীতে উঠেছে। ডিসেম্বর মাসে বেশিরভাগ টিউশনি বন্ধ থাকে, আমার ও ছিল। আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম,
– হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে পারি ? পারিবারিক কোন সমস্যা ?
নীলা বললো, – সমস্যাটি পারিবারিক নয়। সমস্যাটি আমার ব্যক্তিগত।
বিস্মিত হয়ে বললাম, – ব্যক্তিগত ?
– স্যার মাকে বলেছি আমাকে পড়ানোর জন্য একজন ম্যাম খুঁজে বের করতে। এখন তো অনেক বড় হয়ে গেছি, একটু পর্দাশীল থাকতে চাই।
নীলার যুক্তি দেখানো কথাটা ঠক করে বুকে বিঁধে গেলো।
আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে ও বললাম না। নিঃশব্দে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। নীলার রুম থেকে যখন বের হচ্ছি দেখলাম আন্টি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আন্টিকে ডেকে বললাম,
– নীলাকে বলবেন স্কুলে যাওয়ার সময় যেন বোরকা পড়ে বের হয়। পর্দাশীল থাকার জন্য ম্যাম রাখার মতোই বোরকা পড়ে বের হওয়াটা ও কম জরুরী নয়।
মাসের শুরুতেই টিউশনিটা চলে যাওয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আরেকটা টিউশনি জোগাড় করতে না পারলে ভার্সিটির খরচ চালিয়ে নিজে চলতে হিমশিম খেতে হবে। মন খারাপ করে নীলাদের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসতেই তুহিনের সাথে দেখা হলো। তুহিন ছেলেটা নীলার ক্লাসমিট। সে মাঝে মাঝে গনিতের সমস্যা থাকলে তা নিয়ে আমার কাছে হাজির হতো। তুহিন আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বললো,
– স্যার নীলা আপনাকে টিউশনিটা ছেড়ে দিতে বলেছে, তাই না ?
– তুমি কিভাবে বুঝলে ?
– স্যার আমি আগে থেকেই জানি। আমাদের ক্লাসের রাকিব নামের ছেলেটা নীলার সাথে প্রেম ভালবাসা নামক নতুন এক রিলেশন শুরু করেছে। রাকিবই নীলাকে এই বুদ্ধিটা দিয়েছে।
– রাকিব ছেলেটা কেমন ?
তুহিন মন খারাপ করে বললো,
– ছেলেটা খুব একটা ভালো নয়। নীলার মতো আরো অনেকের সাথেই তার রিলেশন আছে।
আমি বরফ শীতল গলায় বললাম,
– রাকিবের হয়তো নিজের চিন্তাভাবনা খারাপ, তাই অন্যদের ও নিজের মতো ভাবছে। এই রকম রাকিবদের দেওয়া পরামর্শ শুনলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।

ভার্সিটিতে যাওয়ার পর তিশা আমাকে চমকে দিলো। আমি আর রবিন ক্যাম্পাসের সামনের চা দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় তিশা এসে বললো,
– আমি আর তদের সাথে গ্রুপ স্টাডি করবো না।
অনেকটা বিস্ময় লুকানোর চেষ্টা করে বললাম,
– হঠাৎ করে এমনটা করছিস ? নতুন কোন গ্রুপে জয়েন করবি ?
– না, এখন থেকে জাহিদ স্যারের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়বো। রেশমা বলেছে স্যার অনেক ভালো বুঝায়। মন মানসিকতার দিক দিয়ে ও অনেক পজিটিভ।
কথা শুনে আর বসে থাকতে পারলাম না, দাঁড়িয়ে বললাম,
– রেশমা নামের মেয়েটা, যে মেয়েটাকে বলা হয় জনগনের গার্লফ্রেন্ড। তার কথা শুনে তুই একটা মানুষের চারিত্রিক সার্টিফিকেট কিভাবে নিচ্ছিস ? রেশমা তো প্রতি সেমিষ্টারেই দুই একটা রেফার্ড খায়, সে কিভাবে বুঝল স্যার অনেক ভালো বুঝায়!
তিশা ঠাস করে আমার গালে একটি চড় বসিয়ে দিলো। মুহূর্তেই আমার মনটা বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। আমি জলকে চোখের সীমানা প্রাচীর ডিঙোতে দিলাম না। তিশার দিকে তাকিয়ে ছোট একটি হাসি দিলাম।

অনেকদিন পর ভার্সিটি বন্ধ পেয়ে বাড়িতে আসলাম। বাবা চাকুরি শেষ করার ছয় মাসের মাথায় পেনশনের পুরো টাকাটা হাতে পেয়েছে। রাতে ঘরের সবাই একসাথে খেতে বসেছি এমন সময় বাবা বললো,
– ভাবছি পেনশনের টাকাটা দিয়ে পাশের বাড়ির রহিম মিয়ার জায়গাটা কিনে ফেলবো। অল্প দামে কেনার সুযোগ পেয়েছি হাতছাড়া করা যাবে না। সুযোগ বার বার আসে না।
মা শুনে বললো, – ঠিকই বলেছেন। এতো সুন্দর জায়গা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
দু’জনের কথার মাঝে আমি বললাম,
– রহিম মিয়া সারাদিন মদ গাঁজা খায়। এই রকম একজন নেশাখোরের সাথে লেনদেন করা কোনভাবেই উচিত নয়। খারাপ মানুষের সাথে লেনদেন করলে সবসময় বিপদে পড়তে হয়।
বাবা ধমক দিয়ে বললো,
– বেশি বুঝিস না! চোখের সামনে এরকম একটা জায়গা যেন হাতছাড়া না হয় সে জন্যই তো রহিম মিয়া আমাকে কিনার জন্য ভালো বুদ্ধি দিয়েছে। মানুষটা নেশাখোর হলেও বুদ্ধি ভালোই দেয়।
আমি খাবার না খেয়ে উঠে গেলাম। উচ্চস্বরে বললাম,
– যদি নেশাখোরের জায়গা কেনো, আমি আর এই বাড়িতেই আসবো না। যে বাড়িতে নেশাখোরের সাথে লেনদেন হয়, সে বাড়িতে আসার কোন প্রয়োজনই দেখছি না।
পরদিন সকালে ব্যাগ গুছিয়ে সত্যি সত্যিই মেসে চলে আসলাম। আসার পর মা ফোন দিয়ে জানালো – খোকা তর রাগ দেখে তর বাবা তার সিদ্ধান্ত পাল্টিয়েছে।
সকালের ঘুম ভাঙ্গলো রবিনের ফোন পেয়ে। রবিন বললো তাড়াতাড়ি করে পত্রিকা দেখতে। পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা লাইনটি দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। বড় বড় অক্ষরে লিখা – শিক্ষকের নামে ছাত্রীর ধর্ষণ মামলা, শিক্ষক পালাতক।
লিখার নিচে শিক্ষকের জায়গায় জাহিদ স্যারের নামটি, আর ছাত্রীটা আমার গালে চড় বসানো রাগী মেয়ে তিশার নাম। পত্রিকার লিখাটা বারবার পড়ছি আর ভাবছি – তিশা ভুল বুঝতে পেরেছে তবে ভুল মানুষের পরামর্শ শুনাটা কতোটা ভুল, নিজের ক্ষতি হওয়ার পর তা বুঝতে পেরেছে।
তিশা মেয়েটার জন্য কেন জানি খারাপ লাগতে শুরু করলো। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। নাস্তা করার জন্য বাজারে গেলাম। হোটেলে ঢুকতে যাবো তখনি দেখি নীলার মা হাতে একটি খাম নিয়ে কোথা থেকে যেন আসছে। এতো সকাল সকাল নীলার মাকে বাজারে দেখে বললাম,
আন্টি এতো সকালে বাজারে ? নীলা কেমন আছে, নতুন ম্যাডামের কাছে ঠিক ভাবে পড়াশুনা চলছে তো ?
আন্টি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না দেখে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি আন্টি কাঁদছে। আমি নিচু গলায় বললাম,
আপনি কাঁদছেন ?
– হ্যাঁ, বাবা। রাকিব নামের ছেলেটা আমার নীলার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। নীলাকে নিয়ে কোথায় পালিয়ে গেছে এক সপ্তাহ হলো এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। রাকিব আমার মেয়েটার একটা বিশ্রী ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দিয়েছে। তাই থানায় এসে মামলা করে গেলাম।
আন্টিকে কি বলে শান্তনা দেবো বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মনে হলো গলায় বেঁধা মাছের সূক্ষ্ম কাঁটার মতো কী একটা যেন শব্দ নালী আটকে দিয়েছে।

বাবার মনটা হাসিখুশি। একুশ দিন পর বাবা নিজের ফোন থেকে আমাকে ফোন দিলো। ফোনটি রিসিভ করতেই বাবা হাসিমুখে বললো,
– খোকা তর কথা না শুনলে বিরাট লস হয়ে যেতো, তুই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিস।
– কেন বাবা ? আমি আবার কিভাবে বাঁচালাম ?
সন্তানের প্রতি মমতা মাখানো কোমল গলায় বাবা বললো,
– রহিম মিয়ার যেই জায়গাটি কিনতে চেয়েছিলাম, সেটা নাকি আরেক জনের কাছে আগেই বিক্রি করে রেখেছে। নকল দলিল দিয়ে নতুন একজনের কাছে বিক্রি করে টাকা নিয়ে রহিম মিয়া পালিয়ে গেছে। ভাগ্যিস খোকা তুই আমারে বাঁচিয়ে দিয়েছিস, নয়তো আমার সারা জীবনের সঞ্চিত পেনশনের পুরো টাকাটা হারিয়ে ফেলতাম।
বাবার কথা শুনে শরীরটা ঘেমে গেলো। আমি আত্মবিশ্বাসী গলায় বললাম,
– পুরো এক জীবনে কখনোই চরিত্রহীন মানুষের পরামর্শ শুনা উচিত নয়, চরিত্রহীনদের পরামর্শ সাময়িক সময়ের জন্য ভালো মনে হলে ও পরবর্তীতে বিপদ ডেকে আনে, যে বিপদ জীবনকে করে তুলে দূর্বিষহ। বাবা একটা কথা মনে রেখো, যে মানুষটা নিজের চরিত্রটাই নিজের ভাবনা দিয়ে ঠিক করতে পারনি, তার ভাবনা অন্যের জীবনে কিভাবে উপকারে আসবে ?
বাবা ফোনটা নিয়ে মায়ের কাছে দৌড়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে বলে যাচ্ছে, – তর মাকে এখনি বলবো তরে বাড়িতে আসতে বলার জন্য।
আমি ফোনটা কেটে দিয়ে ব্যাগ গুছানো শুরু করলাম। বাড়িতে আসার জন্য মায়ের মুখে বলতে হবে না। বাবা তার খোকাকে দেখতে চেয়েছে, খোকাটা এখন এক মুহূর্ত ও দেরি করবে না।

লেখকঃ- সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন