ছিড়ে যাওয়া বন্ধন

মূল: ড. ইয়াসির ক্বাদি
অনুবাদ: মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ

মানুষের মাঝে হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করে দেন মহান আল্লাহ। এ ক্ষমতা অন্য কারো নেই, আছে কেবল মহান আল্লাহর। পবিত্র কুরআন বলছে,

“আর তিনি তাদের (মুমিনদের) হৃদয়গুলোর মাঝে প্রীতিময় বন্ধন স্থাপন করেছেন। অথচ তুমি দুনিয়ার সবকিছু দিয়েও চেষ্টা করলেও তুমি তাদের হৃদয়গুলোর মাঝে প্রীতিময় বন্ধন স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতিময় বন্ধন স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।” [সূরা আনফাল:৬৩]

এ আয়াতে মহান আল্লাহ তার একটি নিদর্শন বর্ণনা করছেন। এটা তার অলৌকিক ক্ষমতাও অনুগ্রহও বটে। তা হল, তিনি মুমিনদের হৃদয়গুলোকে একে অপরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। যদি দুনিয়ার সবকিছু দিয়েও এমন প্রীতিময় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয়, তবু সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু মহান আল্লাহ, তিনি স্বীয় কুদরত দ্বারা তাদেরকে প্রীতিময় বিন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

সুতরাং, বুঝা গেল, মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করার ধারণা, শত্রুতা দূর করে ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ধারণা, এ জাতীয় যাবতীয় সমস্যা সমাধানের ধারণা এবং পুনরায় প্রীতিময় বন্ধনে ফিরে আসার ধারণা মহান আল্লাহ দিয়েছেন। এটা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। হ্যা, এটা সত্য যে এটি মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে; কিন্তু মহান আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে।

নিজের অন্তরের দিকে তাকান, কার সাথে আপনার ‘সমস্যা’ রয়েছে? কার সাথে আপনার ঝামেলা চলছে? কার সাথে আপনি বন্ধন ছিন্ন করেছেন? মহান আল্লাহ আমাদের সূরা আনফালে আরো নির্দেশ দিচ্ছেন,

“অতএব, তোমরা ভয় লালন করো মহান আল্লাহর। আর নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করে নাও।” [সূরা আনফাল:১]

যে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে, সে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আমাদের জীবনের যেকোনো সম্পর্ক, যেকোনো ধরণের আত্মীয়তা, যেকোনো বন্ধুত্ব হোক না কেন সেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো পুনঃস্থাপন করো। প্রীতিময় সম্পর্ক আবার গড়ে তোলো। বলা হয়েছে,

“তোমরা নিজেদের মধ্যে ‘ইসলাহ’ করে নাও।” [সূরা আনফাল:১]

তা’লীফুল-ক্বুলুব, ইসলাহ ইত্যাদির মতো সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনের ধারণাগুলো ইসলামী ধারণা (concept)। নিজের ভাই, আত্মীয় ভাই-বোন, নিজের চাচা, নিজের বন্ধু, পরিচিত মানুষজন- তাদের সাথে আপনার কোনো সমস্যা থাকলে, তাদের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে থাকলে, তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে থাকলে, তাদের সম্পর্কে আপনার হৃদয়ে কোনো রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট থাকলে সেক্ষেত্রে আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন,

“তোমাদের নিজেদের মধ্যকার এ সম্পর্কগুলো পুনরায় স্থাপন করো।” [সূরা আনফাল:১]যা ঘটেছে তা অন্তর থেকে মুছে ফেলুন। সুন্দর সম্পর্কে ফিরে যান।অন্যদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেলে, সে সম্পর্কও আমাদের জুড়ে দিতে হবে। এটা কল্যাণকর।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলছেন,

“অধিকাংশ গোপন শলা-পরামর্শে ভালো কিছু থাকে না।” [সূরা নিসা:১১৪] মানুষের অগোচরে কাজ করলে অনেকক্ষেত্রেই তাতে উত্তম কিছু থাকে না। তবে ব্যাতিক্রম আছে। আল্লাহ আয়াতের পরের অংশে বলছেন, “তবে তিনটা কাজের উদ্দেশ্যে গোপন শলা-পরামর্শ হলে তাতে কল্যাণ রয়েছে-এক. সাদাকাহ বা দান-খয়রাত দুই. সৎকাজ তিন. মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্দেশ্যে হয়।” [সূরা নিসা:১১৪]

দুজন মানুষের মধ্যে ঝগড়া চলছে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো ইস্যুতে মনোমালিন্য হয়েছে অথবা দুই ভাই একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সম্পর্কের এই বাজে অবস্থা কাটাতে আপনার একটা গোপন গ্রুপ করলেন, যাতে তাদের মনের মিলন ঘটানো যায়। আবার তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরো খারাপ করে দেয়ার জন্য এমনটা করে বসবেন না! আপনার উদ্দেশ্য হবে তাদের চিড় ধরা সম্পর্ক জোড়া লাগিয়ে তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যারা এমনটা করবে, মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলছেন,

“আর যে ব্যক্তি মহান এমনটা করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে, অচিরেই তাকে দেয়া হবে মহা পুরস্কার।” [সূরা নিসা:১১৪]

আসুন, নিজেদের অন্তরের দিকে তাকাই। আমাদের সম্পর্কগুলোর অবস্থা কেমন তা খতিয়ে দেখি। আমাদের নবিজি সা. ইরশাদ করেন, হাদীসটি উল্লিখিত হয়েছে আবু দাউদে-

“তোমরা কি জানো, কোন জিনিসটি সাদাক্বাহ, সালাত ও সিয়ামের থেকে অধিক উত্তম?” সিয়াম, সালাত ও দান-খয়রাতের থেকে উত্তম কোন বিষয়টি, তা কি তোমরা জানতে চাও? —এটা শুনে সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, “এর থেকে উত্তম আর কি হতে পারে?” নবিজি সা. জানালেন, “ভেঙ্গে যাওয়া বন্ধন, আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করা।”

আমরা প্রতিদিন সালাত আদায় করি, রমাদানে সাওম পালন করি, সামর্থ্যানুযায়ী দানও করি ইন শা আল্লাহ! আর আমাদের নবিজি সা. বলেছেন, এগুলোর থেকে অনেক উত্তম কিছু রয়েছে। তা হল- মানুষের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা।

সহীহ বুখারীর বিখ্যাত এক হাদীস হতে আমরা জানতে পারি,নবিজি সা. সফরে যাওয়া ব্যতীত মসজিদে নববীতে সালাত আদায় করতে সক্ষম হন নি- এমনটি ঘটেনি বললেই চলে। আপনারা যেমনটা জানেন, মদিনায় থাকা কালে তিনি সালাতের ইমামতি করতেন। তিনি মদিনার বাইরে না থাকলে অন্য কেউ ইমাম হতেন না। কিন্তু একদিন আযান হয়েছে, ইক্বামাত হয়ে কিন্তু নবিজি সা. ছিলেন না। সাহাবায়ে কিরাম কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। সহীহ বুখারী আমাদের জানাচ্ছে, অবশেষে তারা আবু হুরায়রা, অন্য বর্ণনায় আবু বকর রা. এর ইমামতিতে সালাত আদায় করেছেন।
কেন নবিজি সা. জামায়াতে সালাত পড়তে পারেন নি তখন? কারণ, দুটি গোত্রের মধ্যে শারিরীকভাবে একে অপরের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিল, আর গোত্রদ্বয় ছিল ক্বুবার বাইরে। ফলে নবিজি সা. সেখানে গিয়ে দুই গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে গিয়েছেন। নবিজি সা. মানুষকে মিলেমিশে থাকার ব্যবস্থা করতে সালাত দেরিতে আদায় করেছেন।

পারস্পরিক ক্রোধ, রাগ, অভিমান মিটিয়ে ফেলা উচিত। অন্যের দোষ ক্ষমা করে দেয়াই পবিত্র কুরআনের নির্দেশ। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেন,“(মুমিন হচ্ছে তারা), যারা ক্রোধ দমন করে, মানুষের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে এবং মুহসিনদের আল্লাহ ভালোবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান:১৩৪]

‘মুহসিন’ শব্দটি আয়াতে এসেছে। মুহসিন হল সেই ব্যক্তি, যে প্রয়োজনীয় আমলের বাইরেও অতিরিক্ত আমল করে। যেমন, মুহসিন ব্যক্তির সাথে অন্যায়ভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে তাকে ক্ষমা করে দেয়। এটুকু করলেই তার হতো, কিন্তু সে আরেকটু বাড়িয়ে করে। সে ক্ষমা করার সাথে সাথে সেই সম্পর্ক পুনরায় গড়ে তোলে। উপরোল্লিখিত মহান আল্লাহর বাণী যদি আমরা শ্রেণিবিন্যাস করি-
এক. যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে –এটা সর্বনিম্ন স্তর
দুই. যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয় —এটা আরেকটু উপরের স্তর
তিন. যে উপরের দুটি করে এবং সম্পর্কও পুনস্থাপন করে —এটা সর্বোচ্চ স্তর

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ করেন,“খারাপের বদলা খারাপই। তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং সম্পর্ক সংশোধন করে নেয় তবে তাকে পুরস্কার প্রদান করা মহান আল্লাহর দায়িত্ব।” [সূরা আশ-শুরা: ৪০]

কেউ যদি আপনার প্রতি খারাপ কিছু করে, আপনার উপর অন্যায়ভাবে কিছু করে তবে আপনার অধিকার রয়েছে তার প্রতিও অনুরূপ করার। কেউ আপনার প্রতি খারাপ কিছু করলে আপনিও তার প্রতি খারাপ কিছু করতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ এর থেকে ভালো কিছুর খবর আপনাকে দিচ্ছেন,

“যে ক্ষমা করে দেয় ও সম্পর্ক পুনরায় ঠিক করে নেয় তবে তাকে পুরস্কার দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব।”

এটাই সর্বাধিক উত্তম স্তর। কেবল ক্ষমা করা নয়, ক্ষমা করা এবং ক্ষোভ পুষে না রাখা ন্যুনতম কাজ। এটা ভাল বিষয়। আপনি কারো অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে নিজের জীবন সুন্দরভাবে চালালে এটা ভাল। কিন্তু সর্বোচ্চ ভালো বিষয় হল, অপরাধকারীকে ক্ষমা করে দেয়া এবং একইসাথে তার সাথে প্রীতিময় সম্পর্ক আবারও গড়ে তোলা। “ইসলাহ যাতাল বাইন” করা। এটা সত্য যে, ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করা মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল। তবে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো ঠিক করে নেয়ার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে —এটাই মহান আল্লাহর নির্দেশ।

আমরা জানি, আমাদের দ্বীনে মিথ্যা বলা একদম হারাম। যে বিষয়টি সত্য নয় তা বলা আমাদের জন্য অবৈধ। কিন্তু নবিজি সা. বলছেন,“তুমি যদি দু’জন মানুষের সম্পর্ক ঠিক করে দিতে কিছু বলো তবে তা মিথ্যা হিসেবে গণ্য হবে না।”

হাদীসটি সম্পর্কে ভাবুন। সম্পর্ক পুঃস্থাপনের উদ্দেশ্যে ভালো কিছু বলা (যদিও তা সত্য না হয়) মিথ্যা হিসেবে ধরা হবে না। এটা মিথ্যা নয়। কারণ, আপনি এখানে উভয়ের কাছে উভয়ের ব্যাপারে উত্তম ও সুন্দর কথাগুলো বলবেন।
উদাহারণস্বরূপ- দুজনের মাঝে ঝগড়া হয়েছে। আপনি উভয়ের কাছেই গিয়ে বললেন, “সে তোমার সাথে ঝগড়া করে অনুতপ্ত, সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। সে চায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আবারও গড়ে তুলতে।” এরপর আপনি তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে তাদের মাঝে প্রীতিময় সম্পর্ক্ক আবার গড়ে দিলেন। —এমন কিছু করার ব্যাপারে আমাদের নবিজি সা. বলেছেন, “এমনটি করলে তা মিথ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।” আপনি চিন্তা করতে পারেন? এমন কিছু আপনার জন্য বলা বৈধ যা শতভাগ সত্য নয়, কিন্তু আপনার মহৎ উদ্দেশ্য আছে এতে। তা হল, দুজন মানুষের মেলবন্ধন করে দেয়া, যারা একে অপরের সাথে কথাই বলছিল না, যাদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না।

প্রিয় ভাইবোন, আপনি কি চান না মহান আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন? আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন তখনই, যখন আপনি মানুষকে ক্ষমা করবেন। আপনার হৃদয় যখন পবিত্র পরিশুদ্ধ হবে। ‘ক্বালবুন সালীম’ -এর প্রতিফলন ঘটাবেন অন্য মানুষদের সাথে।

মানুষ কত যুদ্ধ, লড়াই করে তার জীবনে। কখনো তো নিজের ভাই, চাচা, চাচাতো ভাইসহ অন্যান্যদের সাথে ঝগড়া করে। অতঃপর তাদের কেউ মারা যান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দুজনের মাঝে ‘ইসলাহ’ করা হল না। তখন জীবিতজন কতই না খারাপ অনুভব করে। এর থেকে মন্দ যন্ত্রণা আর নেই। আহ! ক্ষমাটাও চেয়ে নিতে পারলেন না আপনি! সুতরাং, এমন দুজন ব্যক্তির মধ্যে আপনি উত্তম হোন, নৈতিকতায় উচ্চতর হোন। ইতিবাচক কিছু করুন। একটা উপহার পাঠিয়ে তো দেখতে পারেন? অথবা উত্তম কথামালায় রচিত একটি চিঠি? একটা ফোন কল? হয়ত এমন একটা কাজই তিক্ত সম্পর্ক মধুর করে দিতে পারে। এভাবে উন্নত অবস্থানে থাকা ব্যক্তির মত কাজ করুন।

মহান আল্লাহ মন্দের বিপরীতে ভালো কিছু করতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার জানের দুশমনের সাথে আপনি সুমিষ্ট ও দয়ালু আচরণ করলে সে আপনার সেরা বন্ধুতে পরিণত হবে। আপনাদের ঠিকানা হবে বন্ধুত্ব। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউই এমন সম্পর্ক স্থাপন করাতে পারে না।
মহান আল্লাহর একটা নাম হল ‘মুআল্লিফুল ক্বুলুব’। ফলে ‘তালীফুল ক্বুলুব’ অন্তরের মেলবন্ধন আল্লাহর নিকট থেকে আসে—এটা সত্য। তবে এজন্য আমাদের নিজেদেরও প্রচেষ্টা করতে হবে।

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে আমাদেত কতিপয় উপায় আছে—
এক. উত্তম কথামালার মাধ্যমে। সুন্দরভাবে কথা বলে।
দুই. উপহার প্রদানের মাধ্যমে। আমাদের নবিজি সা. বলেছেন, “পরস্পরকে উপহার দাও তোমরা, দেখবে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসাময় সম্পর্ক হবে।”
তিন. সত্যিকার দুআর মাধ্যমে। মহান আল্লাহ আপনার আন্তরিক সুন্দর দুআ কিভাবে ফিরিয়ে দিবেন? আপনি দুহাত তুলে বলবেন,
“ইয়া মুআল্লিফাল ক্বুলুব! আল্লিফ বাইনা ক্বুলুবিনা” “হে অন্তরসমূহের মেলবন্ধনকারী! আমাদের অন্তরের মেলবন্ধন করে দিন।”

আন্তরিকভাবে এ দুআটি করুন। আপনি এভাবে যখন কারো জন্য দুআ করবেন, তার প্রতি আপনার যত কঠিন শত্রুতাই থাকুক, এমন আন্তরিকভাবে দুআ করলে তার প্রতি থাকা আপনার রাগ ও ক্রোধ নিমিষেই পানি হয়ে যাবে। আপনার হৃদয় তার প্রতি তিক্ত, আপনি প্রতিশোধের অপেক্ষায় আছেন… ওয়াল্লাহি! আমাদের সবার জীবনেই এমন সময় আসে, কেউ আমাদের কিছু বলে, আমাদের ক্ষতি করে, ফলে আমাদের হৃদয় ক্রোধে পরিপূর্ণ হয়। আপনার করণীয় হল, আল্লাহর দিকে ফিরুন। মহান আল্লাহর ক্ষমা যাতে আপনি পান সেই স্বার্থে দুজনের উত্তম একজনে পরিণত হোন।

সুতরাং, শত্রুতার তিক্ততা হতে মিত্রতার সুমিষ্ট ফল আহরণ করতে চাইলে উপর্যুক্ত তিনটি কাজ করুন। তার সাথে উত্তম কথা বলুন, তাকে উপহার দিন এবং আন্তরিকভাবে দুআ করুন তার জন্য। বাকিটা আল্লাহ দেখবেন, ইন শা আল্লাহ! এরপরে যদি শত্রুতা না মিটে যায়, তবে নিজেকে প্রবোধ দিতে পারবেন, “আমি অন্তত চেষ্টা করেছি”। তবে হ্যা, একবার দুইবার চেষ্টা করে ক্ষান্ত হবেন না। প্রচেষ্টা চলমান রাখুন। একটু সময় নিন, তার হৃদয় শান্ত হতে সময় কিছুটা লাগতেই পারে। সময় সকল আঘাত নিরাময় করে দেয়। তাই চেষ্টা করুন, আবার চেষ্টা করুন অতঃপর আবারও চেষ্টা করুন। মহান আল্লাহ আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন, আপনি দুজন ঝগড়াকারীর মধ্যে একজন হতে যাচ্ছেন।

ফুদাইল ইবনে ইয়াদ নামক একজন বিখ্যাত তাবেয়ী ছিলেন। তিনি বলেছেন,

“ক্ষমাকারীর বিপরীতে যে ব্যক্তি প্রতিহিংসা পুষে রাখে সে অধিক যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যে ক্ষমা করে দেয় সে শান্তিতে থাকে।”
কেন? তিনি বলেন,“কারণ হল, যে ব্যক্তি প্রতিহিংসা রাখল, রাতের বেলা মনের অস্থিরতায় ভোগে। সে ভাবে, কিভাবে সে প্রতিশোধ নিবে। এমনকি সে ঘুমাতেও পারে না হৃদয়ভর্তি ক্রোধ থাকার কারণে। আর যে ক্ষমা করে দেয় সে শান্তিতে ঘুমাতে পারে।”

ফলে আপনি যদি ওই ব্যক্তির জন্য তাকে ক্ষমা না করতে চান তবে নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করুন। নিজের জীবনের স্থিরতার জন্য তাকে মাফ করে দিন। হ্যা, ক্ষমা করে দিন, পরিশুদ্ধ হৃদয়ের মালিক হোন। চেষ্টা করুন নিজে পরিশুদ্ধ হতে, অন্যকে পরিশুদ্ধ করতে। এভাবেই হৃদয়ে হৃদয়ে বন্ধন হবে। যদিও এই বন্ধন প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ প্রদত্ত্ব, তবে চেষ্টা ও দুআ আমাদের।

মহান আল্লাহর কাছে আর্জি, তিনি যেন আমাদের সকলের হৃদয়ের সম্মিলন ঘটান। আমাদের পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ হৃদয় দান করেন। যাবতীয় হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা হতে তিনি যেন আমাদের হেফাজত করেন। আল্লাহ যেন বিচার দিবসে মুমিন নরনারীদের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ হৃদয় নিয়ে আমাদের উত্থিত করেন। আমীন।

লেখকঃ বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক

অনুবাদকঃ লেখক ও অনুবাদক 

আরও পড়ুন