দৃঢ় হোক ভালোবাসা,অটুট থাক বন্ধন

মেহেনাজ তাবাসসুম

মা পাগল ছেলে কিংবা বাবা পাগল মেয়ে কথাগুলি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এবং স্বাভাবিক। কিন্তু বাবা পাগল ছেলে ব্যাপারটি অস্বাভাবিক না হলেও খানিকটা অন্যরকম। আমার বেলায় হয়েছেও তাই ।আড়াই বছরের ছেলেটি আমার , বাবা বলতে অজ্ঞান ।
ঘুম থেকে উঠে আব্বু কোথায়, অফিসে কেন গেছে, কখন গেছে, কখন আসবে, অফিস পচা, আব্বু পচা, এখনো আসে না কেন – সারাদিন ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকবে যতক্ষণ বাবা না ফিরবে।
মনে হয়, মাকে ছাড়া বাবার সাথেই সারাটি বেলা পার করতে পারবে। অবশ্য কয়েকটি বিশেষ প্রয়োজনে আমার ডাক পড়ে আর কি!
ওদিকে মেয়েটি আবার আমাকে ছাড়া চলতেই চায় না। কোথাও বেড়াতে যেতে বললে আম্মু যাবে কিনা, আম্মু বাইরে গেলে কখন আসবে আসবে বলে হয়রান হ‌ওয়া,গলা জড়িয়ে ঘুমানো ইত্যাদি কাজে আম্মু ছাড়া অচল । আমার জন্য তার পরান পুড়ে চোখ ফেটে জল এসে যায়। অবশ্য বাবাকেও খুব মিস করে। বাইরে গেলে আব্বুকে ফোন দেন, আববু কখন আসবে, বারবার আব্বুর কথা জিজ্ঞাসা করে, মাথাব্যথা হলে মাথা ম্যাসাজ করাসহ বাবার প্রতিও ভালোবাসার কমতি নেই। তবে সবকিছুর পরেও পরিমাপটা বোধহয় আমার দিকে একটু ঝুঁকেই থাকে।
আর এই ভিন্নমুখী ভালোবাসাবাসির কলকাকলিতে আমি মুগ্ধ হয়ে কখনো ওদের দেখি, কখনো নিমগ্ন হয়ে ওদের ভাবি। যখন ওদের দুষ্টামির সীমা ছাড়িয়ে ভীষণ অধৈর্য হয়ে রাগ করি, বকা দেই, আঘাত করি, পরমুহূর্তে এক তীব্র যন্ত্রণা আমায় গ্রাস করে। অনুশোচনা আর ব্যাথাহত হৃদয়ে আমি নিভৃতে চোখের জল ফেলি। স্রষ্টার কাছে দোয়া করি ওদের কল্যাণের জন্য ।ওদের মারলে ওরা কষ্টের চাইতে দুঃখ‌ই বেশি পায়। মেয়েটি দরজার আড়ালে, পর্দার আড়ালে, খাটের কোনায়, সিঁড়িতে বসে থাকে। ডাকলেও সাড়া দেয় না। আর ছেলেটি একটা বিশেষ গালি শিখেছে সেটাই বারবার বলতে থাকে আর অপেক্ষায় থাকে কখন আব্বু বাসায় ফিরবে আর নালিশ করতে পারবে । কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে বারবার এসে বলবে, আম্মু আপনি আমাকে এখানে মেরেছেন, আপনি আমাকে এখানে মেরেছেন ইত্যাদি, ইত্যাদি।
দু’ভাইবোনের দুষ্টামির কোন বিরাম নেই। মারামারিও চলে। বোনটি ভাইকে বেশিই মারে , তবুও বোনের প্রতি ভাইয়ের কী দরদ ! ভাবতাম, ছোট্ট ভাইটির প্রতি মেয়েটির বোধহয় মায়া একটু কম। কিন্তু গতকাল যখন ভাইয়ের মাথায় আঘাত লেগে কেটে গেল,তখন আর বোনের কান্না দেখে কে ! ভাইয়া ভাইয়া বলে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটিই যেন অজ্ঞান হয়ে যায়!আর বোনকে মারলে বা বকা দিলে তো রক্ষা নেই। আপাকে কেন মেরেছেন, কেন বকেছেন তার জবাবদিহি করতে করতে হয়রান হবার যোগাড়। অনেকবার বুঝিয়ে ,অনেক সরি বলে, ওদেরকেও বলতে শেখাই। কখনো বলে, শেখে, আবার কখনো বলে না,শিখতেও চায়না। ওদের মর্জি মতো আরকি!
আমি নতুন করে ভালবাসার সংজ্ঞা শিখি, অনুভব করি ভাই-বোনের হৃদয়ের বন্ধন।
ওদের ঘুমে ঘরে নামে নিরবতা, স্তব্ধতা । আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি দুই কলিজার টুকরোর মায়াবী চেহারার দিকে। গায়ে,মাথায় হাত বুলাই, দোয়া করি সর্বশক্তিমানের কাছে ।
হৃদয় নিংড়ে প্রার্থনা জানাই – জীবনের প্রতিটি সময় ওরা যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে, নিরাপদে থাকে প্রভু!
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ যেনো কখনো ওদেরকে স্পর্শ না করে। আমার অনুপস্থিতিতে কিংবা আমার চোখের আড়ালে, সকল সময় তোমার নিরাপত্তার চাদরে ওদের ঢেকে রেখো দয়াময়!
তোমার ভালোবাসা আর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিও ওদের। কোনো বিপদের আঁচ যেন না লাগে ওদের গায়ে।
ঘুমাবার সময় কত বায়না তাদের!
ছেলে বলে আম্মু আমার দিকে ফেরেন, মেয়ে বলে তার দিকে ফিরতে । দুজনের টানাটানিতে আমি খানিকটা বিরক্ত ও অস্থির হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সটান দু’জনের মাঝখানে শুয়ে থাকি। আর সান্ত্বনা দিতে থাকি এই তো, আমি দুজনের পাশেই আছি।
মনে পড়ে যায় কয়েকটি ঘটনার কথা-
ছেলেবেলায় প্রতিটি সন্তান‌ই মাকে নিজের কাছে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। অথচ জীবনের শেষ বেলায় যখন কিনা বাবা-মা ই সন্তানকে আঁকড়ে বাঁচতে চায় তখন তারা অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বোঝার মত বাবা-মার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় । একজন আরেকজনের ওপর দায় চাপিয়ে দেয় বিরক্তিকর কোন বস্তুর মতো। কার্টুনের ব্যঙ্গচিত্রের মতো- এ বলে তুই নে, ও বলে তুই নে-
কেউ আর ছেলেবেলার মতো বাবা-মাকে পরম আশ্রয় বা নির্ভরতায় জড়িয়ে নেয় না। কেবল‌ই দূরে ঠেলে দিতে চায় ।
নিজের চোখে দেখেছি আমি ।
অজান্তেই শিহরিত হয়ে দুই সন্তানকে বুকের মাঝে জাপ্টে ধরে মনে মনে প্রার্থনা করি –
আমার সোনারা, এমন যেনো না হয়!
আমার এলোমেলো মাতৃহৃদয়ের আয়নায় দেখতে পাই আমার সন্তানদের অভিমানী চোখ-মুখের ছবি । বাবা অফিস থেকে দেরি করে ফিরলে ঝড়ের বেগে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর বলতে থাকে আব্বু এত দেরি করেছেন কেন ? আর অফিসে যাবেন না, আরো কত কথা ! রাগ-অভিমান-ভালোবাসার গল্প।
আমি ঈর্ষান্দিত( ঈর্ষা মিশ্রিত আনন্দ) দৃষ্টিতে ওদের এই ভালোবাসাবাসি দেখতে থাকি ।
ওদের এই আচরণ আর চেহারার মিল দেখে লোকে আমায় মজা করে বলে তুমি বেকার বেকার কষ্ট করছো। সবই তো বাবার মত হলো, আবার বাবা ছাড়াও কিছু বোঝেনা !
আমি হাসি।
ঈর্ষা হয় , সেই সাথে কী এক পরম আনন্দ আর পরিতৃপ্তি অনুভব করি অন্তরে !
নিজের বাবাকেই তো ভালোবাসছে!
বাসুক না ভালো আরো বেশি করে! – বাবা হোক, মা হোক, ভাই হোক , বোন হোক। সবাই তো আপন। রক্তের টান, আত্মার বাঁধন। আরো বেশি করে ভালোবাসুক, শ্রদ্ধা করুক, অনুভব করুক , কলিজায় ভরে রাখুক – তবুওতো কাছের মানুষদের ভালবাসতে শিখুক। সেইসাথে গুরুজনদের শ্রদ্ধা করুক, ছোটদের স্নেহ করে নিস্বার্থভাবে ভালবেসে যাক। হয়ে উঠুক চক্ষু শীতলকারী সন্তান।
আমার প্রিয় কলিজার টুকরারা,
প্রিয় সন্তানেরা,
তোমাদের জন্য দোয়া করি নিরন্তর- এই মিথ্যে ,জটিল-কুটিল , ভূয়া আর স্বার্থান্বেষী সময়ের বন্দিজীবনে বাবা হোক, মা হোক সত্যিকারভাবে ভালোবাসতে শিখো সবাইকে।
উত্তরোত্তর পরস্পরের প্রতি তোমাদের এই ভালোবাসা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হোক, অটুট থাক বন্ধন। অক্ষয় থাকুক এই অনুভূতি ।
…এমনকি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি…

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন