পরিবারে শান্তি রক্ষায় সদস্যদের করনীয়

নিশাত তামমিম

বউ-শাশুড়ি নিয়ে প্রচুর খিস্তিখেউড় চলছে ফেবুরাজ্যে। আমার স্বল্পজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে সংক্ষেপে দুইটা কথা বলি-
১. প্রত্যেকটা মেয়েই চায় বিয়ের পর নিজের একটা সংসার পেতে, যা সে নিজের মত করে গড়ে নেবে। প্রত্যেক স্ত্রীই চায়, তার স্বামী তাকে সবচেয়ে প্রায়োরিটি দিক, কারণ সে সারাজীবন এই মানুষটাকে নিয়েই স্বপ্ন সাজিয়েছে।
২. প্রত্যেকটা মা-ই চায়, সারাজীবন সংসারের ঘানি টেনে শেষ বয়সে কিছু কাজের দায়িত্ব ট্রান্সফার করে একটু স্বস্তি পেতে। অসুস্থ অবস্থায় সন্তানের কাছে একটু সেবা পেতে। প্রত্যেক মা-ই চান, তার ছেলে তাকে সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দিক, কারণ তিনিই তাকে ছোট থেকে একটু একটু করে বড় করেছেন।

আমি ফতোয়ার কথা বলছিনা, কিন্তু স্বাভাবিক দৃষ্টিতে চিন্তা করে দেখুন, এই দুটো চাওয়ার কোনটিই কি অযৌক্তিক? শাশুড়িরা মানতে না পারলে নিজের বউ অবস্থার কথা স্মরণ করুন। বউয়েরা মানতে না পারলে নিজে শাশুড়ী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, ছেলের মা হওয়াতক ধৈর্য ধরুন।
এখন এই দুই বিপরীতমুখী চাওয়া একসাথে কোলাবোরেট করতে গিয়েই শুরু হয় বিপত্তি। আগের যুগে শাশুড়িরা বউদের উপর চাপিয়ে দিতো, স্ত্রীরা নির্যাতিত হয়েও দাত কামড়ে পড়ে থাকতো। এ যুগে মেয়েরা স্বনির্ভর, তাই ধুম করে আলাদা হয়ে যাওয়াকেই সমাধান মনে করে কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করে না। অদ্বীনিরা নিজ পক্ষের ‘লজিক’ দেয়, দ্বীনিরা নিজ পক্ষের ‘হাদিস’ দেয়, বিপরীতটা ইগ্নোর করে। দুটোই প্রান্তিকতা।

দেখুন, স্ত্রীর পর্দা ও অন্যান্য প্রয়োজনে বাবা-মা থেকে আলাদা থাকা জায়েয, বরং কিছু ক্ষেত্রে এটাই উত্তম৷ আবার বাবা-মায়ের অসুস্থতা, একমাত্র সন্তান এরকম কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সাথে থাকতে চাওয়াটাও অপরাধ নয়, বরং এটাই উত্তম। একই সমীকরণ দিয়ে প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব না, ঠিকও না। এই কথাগুলো আমার না, আলেমদেরই, উনাদের সাথে আলাপ করে দেখুন।

কিছু দ্বন্দ্ব আছে, চিরন্তন ও মানবিক। যতই চেষ্টা করা হউক, এবসোল্যুট কোন সমাধান মিলবে না। এক্ষেত্রে সমাধানের পথ একটাই- কুরআন হাদিস থেকে নিজের অধিকার নয়, অন্যের হক্বগুলো বেশি বেশি জানার ও মানার চেষ্টা করা। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যের প্রতি সাধ্যমত ইহসান করার চেষ্টা করা। নিজের অধিকারের চেয়ে নিজের কর্তব্য বিষয়ে বেশি সচেতন হওয়া, কারণ অন্য কেউ আপনার উপর জুলুম করলে আল্লাহর কাছে সে জবাবদিহি করবে৷ বিপরীতে আপনার দ্বারা জুলুম হয়ে গেলে তার জবাবদিহিতা আপনার। আমরা যেন নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্য কারও উপর জুলুম না করে ফেলি।

লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, ছেলে/স্বামীকে একজন দক্ষ অভিনেতা/পলিটিশিয়ান হতেই হবে। শুধুমাত্র আপনার কিছু টেকনিক এপ্লাই করার অভাবেই বউ-শাশুড়ি সংসারে আগুন ধরে যেতে পারে। আপনার কিছু টেকনিকেই সংসারে মোটামুটি ভারসাম্য বজায় রাখা নিশ্চিত হতে পারে। দুই পক্ষ যার যার দিক থেকেই চিন্তা করবে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ব্যালেন্স আপনাকেই করতে হবে। আল্লাহ আপনাকে পরিবারের ‘ক্বওয়াম’ তথা ‘আমীর’ এর মর্যাদা দিয়েছেন, মর্যাদাসুলভ দায়িত্বও দিয়েছেন। যার পদমর্যাদা যত বড়, তার জবাবদিহিতাও তত বেশি- এটাই ইসলামের শিক্ষা।

আর হ্যা, পুরুষ ও নারী একে অপরকে প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাবার চেষ্টা করুন। কুরআনেই তো আল্লাহ তা’আলা এটা বলেছেন। তাহলে একে অপরকে খোচাখুচি করে কী লাভ? আমরা নারীরা এমন কোন ইউটোপিয়ান সমাজে যেতে পারবোনা, যেখানে পুরুষ নেই। পুরুষরাও এমন কোথাও চলে যেতে পারবেনা, যেখানে নারী নেই। আমি যে পুরুষকে গালি দিই, সে আমার বাবা-ভাই-স্বামী-সন্তান। আপনি যে নারীকে গালি দেন, সে আপনার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা। আমাদের জীবনের প্রয়োজনেই একজনের আরেকজনকে দরকার। তাহলে একে অপরকে প্রতিপক্ষ ভেবে কী লাভ? তারচেয়ে একে অপরের সাইকোলজি বুঝে, একে অপরের উপর আরেকটু ইহসান করে চলার চেষ্টা করাটাই কি উত্তম না? রাসূল সা. কিংবা উম্মুল মুমিনীনদের জীবন কি আমাদের এটাই শেখায় না?

আরেকটা কথা, ফতোয়া দিয়ে সংসার চালানো যায় না, কারণ প্রত্যেকের ভাণ্ডারেই বিপরীত পক্ষকে ঘায়েল করার মত পর্যাপ্ত ফতোয়া মজুদ আছে। বরং প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে অন্যের প্রতি ইহসানের চেষ্টা করলেই অপর পক্ষ থেকে ইহসানের আশা করা যেতে পারে। ‘ইহসানের বদলা ইহসান’ এটাও কিন্তু কুরআনের কথা, আমার কথা নয়। নিজ অবস্থানে থেকে অন্যের জুতা পরে হাটার চেষ্টা করুন, কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হবে- শাশুড়িরা তাদের অতীত আর বউয়েরা তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করুন, মাঘ মাস সবার জীবনেই আসে। আর হ্যা, ‘Happily Ever After Marriage’ বলতে দুনিয়ায় কিছু নেই, এই টার্মটাই জান্নাতের জন্য ফিক্সড। এই সত্যটা যত সহজে বোঝা যায়, জীবনের ইকুয়েশান মেলানো ততই সহজ হয়। দুনিয়ায় যারা সুখি থাকেন, সবর ও শোকরের মাধ্যমেই তারা সুখি থাকেন, তাদের জীবনেও উত্থান-পতনের গল্প আছে, সুখ-দুঃখের মিশেল আছে। এই সত্যের উপরে আর কোন সত্য আছে কি?

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন