পরিবার হোক মানুষ গড়ার ভিত্তিভূমি।

কয়েকদিন আগে সদ্য প্রসূত এক ছেলে সন্তানের মায়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় তিনি বললেন, “যাক বাবা! আমার মেয়ে হয়নি, মেয়ে মানুষ করা যেই কষ্ট, যেই টেনশন!”

আবার আমি অনেক মেয়ের মাকেও বলতে শুনেছি…
“মেয়ের মা আমি! মনে হয় যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মা! আমি খুব অপরাধ ফিল করি কারণ আমি আমার মেয়েদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”

ছেলের মায়েদের অহংকার কিংবা মেয়ের মায়েদের অসহায়ত্ব- কোনটিই কাম্য নয়। ছেলে সন্তানও আল্লাহর নিয়ামত। মেয়ে সন্তানও আল্লাহর নিয়ামত। পৃথিবীতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই প্রয়োজন আছে। তারাই আমাদের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা!

একবিংশ শতাব্দীর আলো ঝলমলে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আজো মেয়ে সন্তানের সেফটি নিয়ে মায়েরা অসহায়! আজো মেয়ে সন্তান জন্মানোর খবরটা একটা বিস্বাদ শব্দ!

আজো মেয়ের বাবা-মাকে যুদ্ধ করতে হয় পাড়ার বখাটে ছেলেদের খারাপ নজর থেকে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য! যুদ্ধ করতে হয় মেয়েকে বড় করতে গিয়ে সমাজের হাজারো প্রশ্ন আর কুকথার সঙ্গে!

মেয়েদের জীবনে যে কঠিন সমস্যাগুলো হচ্ছে, তা হচ্ছে ছেলেদের দ্বারাই। আর সেই ছেলেগুলোও তো আমাদেরই সন্তান। সে তো জন্ম থেকেই এমন হয়ে আসেনি।

প্রত্যেকটি শিশুই পৃথিবীতে আসে একেবারে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ হয়ে। এরপর সে বেড়ে ওঠে পরিবারে, সমাজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে…
তাই তার সুস্থ মানসিকতার বিকাশে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব অনেক।

শুধু মেয়েদের সুরক্ষার ব্যাপারে চিন্তা করলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে না। বরং এর চেয়েও বেশি জরুরী ছেলে সন্তানরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা সেদিকে যত্নশীল হওয়া।

আমার ছেলেটা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে,কার সাথে মিশছে, তার ভেতর কোন অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যাচ্ছে কি না ? এসব দেখার দায়িত্বও তো ছেলের অভিভাবক হিসেবে আমার।

ছেলে সন্তান বলেই তাকে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেয়া যায় না। যথাযথ যত্ন না নিলে এই নিষ্পাপ ছেলেটিই ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে ড্রাগ এডিক্ট অথবা ভয়ংকর কোনো রেপিস্ট!

একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেয়াটাও খুবই জরুরি। আর এই নৈতিক শিক্ষাটা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। নৈতিক শিক্ষা মানুষের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ছোট থেকে শিশুদের যে শিক্ষা দেওয়া হয় তারা সেটাই মনের মধ্যে লালন করতে থাকে। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সেই পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতাটাও তাদের মধ্যে তৈরি করে দিতে হবে।

এখন যেহেতু ইন্টারনেট খুবই সহজলভ্য তাই এর উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বাচ্চাদেরকে অবশ্যই জানাতে হবে। বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ কাজে তাদেরকে যুক্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত।

ছেলে সন্তানদের সাথে বাবা মায়ের সম্পর্ক অনেকসময়ই বন্ধুত্বপূর্ণ থাকে না। কিন্তু সম্পর্কটা অবশ্যই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। তাহলেই সে বাবা-মা’র সাথে তার কথাগুলো শেয়ার করবে। আর যে সন্তান শেয়ার করতে শিখবে তার আদর্শহীন হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের সামনে এমন কিছু বলা বা করা উচিত নয় যেগুলো তাদের মধ্যে নেতিবাচকতার সৃষ্টি করবে অথবা যেগুলো তাদের কোমল অনুভূতিকে আঘাত করবে কিংবা তাকে অতিরিক্ত প্রশংসার জোয়ারে ভাসাবে।

আমাদের সমাজে একটা বয়সের পর থেকে ছেলে বাচ্চাদের ক্রমাগত শেখানো হতে থাকে ‘কাঁদতে নেই, তুমি না ছেলে?’ এ কথা বলে মেয়েদের কাঁদতে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে মেয়েরা কাঁদতে শেখে এবং ছেলেরা কান্না চাপতে শেখে। এভাবে ছেলে সন্তানের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সে শ্রেষ্ঠ এবং সে যা করবে সেটাই উৎকৃষ্ট।
ছেলেদের কাঁদতে নিষেধ করা মূলত কঠিনভাবে তাদের আবেগ দমনেরই নির্দেশনা হয়। তাদেরকে শেখানো হয়, ছেলেদের কোনো আবেগ থাকতে নেই।

বাবা-মায়েরা ছেলে সন্তানকে বড় করতে গিয়ে অনেক কিছুই বিবেচনায় আনেন না। অনেকসময় ছেলেদেরকে ঘরের কাজের ধারে কাছেও আসতে দেয়া হয় না। আমাদের শত বছরের ঘুনে ধরা সংস্কার হলো ঘরের কাজ করবে কেবল কন‍্যা সন্তান। ঘরের কাজ বোনের সাথে ভাগাভাগি করে করার শিক্ষা পরিবার থেকেই শেখানো উচিত।

আরেকটি জিনিস খুব জরুরি, সেটি হচ্ছে ছেলেদেরকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো…তারা যেন মেয়েদের সম্মান করে এবং মেয়েদের প্রতি কোনো অপমানজনক শব্দ/বাক্য ব্যবহার না করে।
আর এটি সে শিখবে তখনই যখন সে দেখবে তার পরিবারে মেয়ে সদস্যদের প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে। এরপর সে বড় হয়েও সেই চর্চা করবে এবং মেয়েদের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করবে।

আমাদের ছেলেরা বেড়ে উঠুক সহিষ্ণু পরিবেশে নির্মল শুদ্ধতায়! ছেলেরা মেয়েদের পাশে থাকুক ভাই, বন্ধু আর সহমর্মি হয়ে!
পৃথিবীটা নিরাপদ হোক ছেলে মেয়ে সবার জন্যই!

—————————————————–
‘পরিবার হোক মানুষ গড়ার ভিত্তিভূমি’
লেখকঃ সাজেদা হোমায়রা,কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন