প্রতিটি মানুষই ভালো, প্রতিটি মানুষই খারাপ

সালমা তালুকদার

মেয়েটা বিধ্বস্ত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত…নানা কারনে তার মন ভীষণ রকম খারাপ। কি করবে বুঝতে পারছে না। খুঁজছে এমন একজনকে, যার সাথে কিছু সময় কাটাতে পারে। যার সঙ্গ মনকে শান্ত করতে পারে। কিন্তু কাকে বিশ্বাস করবে! অনেক মানুষ আশেপাশে কিন্তু বিশ্বাস করার মত কয়জন আছে। তাছাড়া মেয়েটি তো এখনো সেই জায়গাটায় পৌছতে পারেনি যে জায়গায় পৌছলে একটা বোধের জন্ম হয়। বিশ্বাস করে ভালোবাসলে, কিছু কথা শেয়ার করলে পরবর্তীতে কোন ক্ষতি হলে তা থেকে উদ্ধার পেতে পারবে। তবু মেয়েটি বন্ধু পায়…নির্ভরতা পায়। কিছুদিন বেশ আনন্দে কাটে। তারপর হঠাৎই সব এলোমেলো হয়ে যায়। এক সেকেন্ডের ও কম সময়ের মধ্যে এতদিনের বিশ্বাস চুরমার হয়ে পায়ের কাছে লুটায়। মেয়েটা দিশেহারা হয়। বুঝতে পারে না কি করবে! কি করা উচিৎ তার। কয়েক ঘন্টা, কয়েকটা মাস অথবা কয়েকটা বছরের জন্য সে একরমক ট্রমায় চলে যায়। বিশ্বাস করতে পারে না আর কাউকে। নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়। সবাই অবশ্য এমন নয়। অনেকে উঠেও আসে। আবার নতুন করে বিশ্বাসও করে।

এবার কথাগুলো বলার পেছনের কারণটা বলি। আমি অনেক বাইরে যাই। অনেক মানুষের সাথে ওঠাবসা। চেহারা দেখলে মনের কথা পড়তে পারি। আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু সহজে কাউকে পড়তে চাই না। যার সাথে কিছুটা পথ হাঁটতে হবে বলে মনে করি, তাকে পড়ার চেষ্টা করি। ব্যর্থ যে হই না তা নয় কিন্তু। আমার বিশ্বাসের জায়গাটাও অনেক সময় নড়ে ওঠে। আমি তখন চুপ হয়ে যাই। নিজের কাছে ফিরে আসি। নিজেকে শাসন করি, এখনো মানুষ চেনার বাকি। সাধু সাবধান! তবে প্রবোদ দেই এই বলে যে, আমি সঠিক ছিলাম। সে আমায় চিনলো না। ভুল তো তার। আমাকে মানুষ কি চোখে দেখে সেই জায়গাটায় আমি কম যাই। নিজের মত করে চলি। পারলে উপকার করি কারো ক্ষতি করি না।

তো অনেকেই আমাকে বলে, আপনার পাশের মানুষটি কিন্তু বিতর্কিত। আপনার ডান পাশের নারীটির চরিত্র ভালো না। অনেক পুরুষকে সে নাচায়। আপনার বাম পাশের পুরুষটি অনেক নারীর ক্ষতি করেছে। আপনি কি জানেন?

ভাই আমি জানি না। জানতেও চাই না। সে আমার ক্ষতি করেছে কিনা সেটা একটা বিষয়। কেন এভাবে ভাবছেন আপনি? মেয়েটি যদি আপনার কাছের কোন বান্ধবী হতো তাহলে কি এভাবে বলতে পারতেন? না ভাই, বলতে পারতাম না। হয়তো তখন বান্ধবীকে বোঝাতাম। মানসিক সাপোর্ট দিতাম। তবে অবশ্যই বিশ্বাস করি এক হাতে কখনো তালি বাজে না। মেয়েটির চোখের ইশারা ছাড়া ছেলেটি কখনো কাছে আসেনি।

হ্যা এটা ঠিক ছেলেটি মেয়েটির বিশ্বাস ভেঙ্গে দিয়েছে, এটা অন্যায়। এবং সৃষ্টিকর্তা সেজন্য ছেলেটিকে অবশ্যই শাস্তি দিবেন। কিন্তু মেয়েটি কেন নিজেকে উজাড় করে দিল! তাকে তো একটি বিবেক দেয়া হয়েছিল। সে সেটিকে কেন কাজে লাগায়নি?

তবু বলবো, একসাথে কিছু সময় তো ভালোভাবেই উপভোগ করেছে। কিছুটা সময় তো মানসিকভাবে শান্তি পেয়েছে। অতটুকু মনে রেখেই তার সব ভুলে যাওয়া উচিৎ। আরে ভাই প্রেম বলেন, ভালোবাসা বলেন, বিবাহিত জীবন বলেন আর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বলেন কোনটার বেলাতেই গ্যারান্টি দিতে পারেন না যে, শেষ পর্যন্ত সবকিছু আপনার মনের মত যাবে। শেষ বলে কিছু নাই। মৃত্যুতে ও ইহকালের শেষ হয়, কিন্তু পরকাল শুরু হয়ে যায়। তাই প্রতিটি সম্পর্কের জন্য জীবন দেয়ার কিছু নেই। তাহলে কেন একজন আরেকজনকে দোষারোপ করবেন। মতের মিল হয়নি, বের হয়ে আসেন সম্পর্ক থেকে। ঘুরে দাঁড়ান। দেখবেন বেঁচে থাকার আরো উপাদান আছে পৃথিবীতে।

এবার আসি ডানের মেয়েটির কথায়। ভাইরে মেয়েটা হয়তো আপনার মত সুখী না। সে জীবনটা দেখেছে অনেক কঠিনভাবে। যা আপনি দেখেননি। দূর থেকে কত কথা বলা যায়। অমুক মেয়ে খারাপ। অমুক মেয়ে হাজারটা পুরুষের শয্যাসঙ্গী। তো জিজ্ঞেস করতে মন চায়, শয্যাসঙ্গী কে ছিল? বালিশ, চাদর নাকি বিছানা? নিশ্চয়ই যার শয্যাসঙ্গী সে একজন পুরুষ অথবা সমকামীর কথা বললে সে একজন নারী। একা থাকলে শয্যাসঙ্গী কথাটা আসে না। এবার আসি মেয়েটিকে নিয়ে যে কথা বললো তার প্রসঙ্গে। ভাই আপনার কি খেয়েদেয়ে আর কোন কাজ নেই! নিজের ঘরের বউকে সামলান। আপনি সময় দিচ্ছেন না বলে আপনার বউ অন্য কারো শয্যাসঙ্গী হচ্ছে না তো।

অথবা যে নারী অন্য নারী সম্পর্কে এসব কথা বলছেন তাকে বলি। আপনার পায়ের গোড়ালিটা ফাটা। সেটা কি লক্ষ্য করেছেন? রাস্তায় হাঁটতে গেলে আপনার স্বামী অন্য নারীর সুন্দর পায়ের পরিস্কার গোড়ালির দিকে তাকিয়ে থাকে। আপা নিজের শরীরের যত্ন নিন দয়া করে। তাই বলে আপনার স্বামী আপনার সুন্দর গোড়ালি দেখে আপনার দিকে আসবে সেটা ভাববেন না। সে নাও আসতে পারে। কারন তার স্বভাবই হচ্ছে অন্য নারীর দিকে তাকানো। আপনি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকবেন আপনার নিজের জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হন সেটার জন্য কাজ করেন। যে নারীর নামে বলছেন, তার পায়ের নখের যোগ্যতাও আপনার নেই। সে একজন যোদ্ধা নারী। জীবনের নানারকম ঘাত প্রতিঘাতের সাথে সে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে। আর তার এই সংগ্রামী জীবন দেখে কিছু পুরুষ আসে তাকে বশ করতে। কিছু পুরুষ আসে তাকে ভোগ করতে।

ঐ বেচারিও তো দিনশেষে একজন মানুষ। হয়তো কোন দূর্বল মুহূর্তে বিশ্বাস করে কারো বুকে মাথা রাখে। পরবর্তীতে দেখা যায় ঐ ব্যক্তিটি ভুল পছন্দ ছিল। এভাবেই এগিয়ে যায় তার জীবন। হ্যা যারা আপনারা তার জীবনের দায়িত্ব নিতে পারবেন। যারা দুই পয়সা দিয়ে তাকে সহযোগীতা করতে পারবেন। তারা কথা বলেন। কারন আপনি তার উপকার করছেন তাহলে দুটো কথা বলার অধিকার আপনি রাখেন। আর ঐ নারীও তখন চিন্তা করবে, দুধ দেয়া গরুর লাথিও ভালো।

যে কথা বলছিলাম শুরুতে। এক হাতে কখনো তালি বাজে না। এটাই সত্যি। একজন নির্লিপ্ত নারীর কাছে একজন পুরুষ কখনো আসবে না। আবার একজন নির্লিপ্ত পুরুষের কাছে একজন নারী কখনো যাবে না। অল্প কিছু সময় আনন্দে কাটানোর পেছনে দুজনের হাতই থাকে। সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে কেউ কাউকে দোষারোপ না করে বন্ধু হয়ে থাকেন। আর আমার আশেপাশের লোকজনকে নিয়ে যারা আমাকে বলতে আসেন যে, অমুক বিতর্কিত নারী, পুরুষ। তুমি মিশবে না। তাহলে তোমার মারকেট শেষ হয়ে যাবে। তাদের জন্য বলছি। এসব কথা বলতে আসবেন না দয়া করে। কারন যাকে খারাপ বলছেন তার জন্য আপনার বন্ধু বা বান্ধবীও কিছুটা দায়ী। আমার সাথে যদি তার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাহলে তার জন্য আমি দায়ী থাকবো।

আবেগে ভেসে গিয়ে ঢালাও ভাবে কাউকে দায়ী করবেন না। কারন সব মানুষের মধ্যেই ভালো খারাপ আছে। একজন মানুষ কখনোই পুরোপুরি খারাপ হতে পারে না। আবার একজন মানুষ কখনোই পুরোপুরি ভালো হতে পারে না।

সবশেষে বলতে চাই, মানুষের চরিত্র বড়ই বিচিত্র…ভালো খারাপের সঙ্গা জেনে বিচার করেন…তখন দেখবেন নিজেকে উন্নত করতেই আপনার বেলা শেষ হবে। মানুষের পেছনে কথা বলার আর সময় হবে না। আবেগে ভেসে যাওয়ার কোন অর্থ নেই। প্রতিটি মানুষই ভালো। প্রতিটি মানুষই খারাপ
২৯ মার্চ ২০২১ ইং

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন