বন্টননামা দলিল

সুস্মিতা মিলি

আজ সালেহা বেগমের বন্টননামা দলিল হলো। একেবারে লিখিতো দলিল। কেউ যেন মায়ের দায়িত্ব অস্বিকার করতে না পারে তাই তার ছোট ছেলে রাজিব একটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প নিয়ে এসেছে।
বুদ্ধিমান ছেলে !
অনেকগুলো শর্ত সম্বলিত দলিলখানা লেখা শেষ করলেন তার মেজো বৌ তানিয়া। তারপর
সালেহা বেগমের বুদ্ধিমান আর সমাজে উচ্চ শ্রেণীর পজিশনে থাকা ছেলে মেয়েরা সবাই দলিলটাতে একে একে সই করলো।
তারপর দলিলটা তাদের মায়ের হাতে দিয়ে বললো,
—– দেখতো মা কোথাও কোন ফাঁক আছে কি না। সালেহা বেগম দলিলখানা হাতে নিয়ে দেখলেন দুইভাগে ভাগ করা কিছু শর্ত।

প্রথম অংশে আছে, মা’কে সারা বছর কে কোন মাসে কার বাসায় রাখবে সেটা। মাকে পালনের বন্টননামা!
তাছাড়া আছে বড় কোন অসুখ হলে চিকিৎসার টাকা কিভাবে আসবে তার হিসাব। যেহেতু তিনি ওদের বাবার পেনশন পান তাই ঔষধ কিনতে কারও কোন টাকা লাগবে না।
এই পেনশনের টাকা থেকেই মাকে প্রতিমাসে কিছু জমিয়ে রাখতে হবে। যদি কোন বড় অসুখ হয় তাহলে ছেলেরা সবাই বাকি টাকা দিয়ে মায়ের ভালো চিকিৎসা করবে। এতে কৃপণতা চলবে না।

দ্বিতীয় ভাগের শর্তগুলো সালেহা বেগমের জন্য। তাতে লেখা
—- সবার আগে মা’কে পান খাওয়া ছাড়তে হবে।
ফ্ল্যাট বাসায় পান খেলে পিক ফেলা নিয়ে ঝামেলা তাই।
–কাজের মেয়েদের কাজে কোন খুঁত ধরা চলবে না। —-খেতে বসলে রান্নাবান্না নিয়ে কোন শব্দ করা যাবে না।
—-বৌদের চলাফেরা নিয়ে কটুকথা বা রাগ করা যাবেনা।
—-নাতি নাতনীদের উচ্চস্বরে ধমক দেয়া যাবে না।
—কাজের মানুষের সাথে সংসারের সুখদুঃখের কথা বলা যাবে না।

সালেহা বেগম একটু দুরে সোফায় বসে বসে অসহায় চোখে দেখছেন,তার সোনার টুকরো ছেলে মেয়েরা তা’কে কিভাবে মুহূর্তেই বাসার ঝঞ্জাল বানিয়ে দিলো। এতো আদরের ছেলেমেয়ের কাছে তার কি মূল্য তা ঘোলা চোখে বুঝতে চেষ্টা করছেন।
হঠাৎ বড় বউমার আগমন হলো মঞ্চে,তার বাসাতেই মিটিং বসেছে। তিনি একটু বোনের বাসায় ছিলেন তাই পারিবারিক মিটিংয়ে আসতে দেড়ি হয়ে গেলো।
এসেই দলিলখানা হাতে নিলেন ঝটপট পড়ে নিলেন তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে দেবরদেরকে শুনিয়ে বললেন,

—–বাবা মারা গেছেন চার বছর হলো এই চার বছর মা আমার কাছেই ছিলেন। আমি দয়া করে ওনাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলাম। তোমরা কেউ এতোদিন মায়ের দায়িত্ব নাওনি। তাই আগামী চার বছর তোমরা তিনজনকেই মায়ের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি আর পারছিনা। এখন তোমরা আমাকে একটু রেহাই দাও,একটু নিঃশ্বাস নিতে দাও স্বাধীনভাবে।

—-তার মানে!এই চার বছর তোমার স্বাধীনতা ছিলো না ভাবি? মা’কি এই চারবছর তোমার কোলে চড়ে ছিলো? সালেহা বেগমের মেয়ে তিথি রাগতস্বরে বললো।

ছোট ছেলে রাকিব থামিয়ে দিলো বোনকে। সে বললো —–এতো কথা বলিস কেন আপা? বরং এক কাজ কর,মাকে প্রথমে তোর বাসাতেই নিয়ে যা। মেয়েদের কাছেই মায়েরা ভালো থাকে সুখে থাকে।

—–সামনে আমার মেয়ের জেএসসি পরীক্ষা, এখন মাকে নিয়ে গেলে মেয়েটার পড়ার ক্ষতি হবে। এখন বরং তুই তোর বাসায় রাখ মাকে, তোর বাচ্চারা এখনও ছোট সমস্যা হবে না।এরপরের বার নাহয় আমি নেবো।

এমন সব কথার মাঝেই হঠাৎ করেই সালেহা বেগমের কলেজ পড়ুয়া নাতি মিশু দুটো ব্যাগ হাতে মিটিংয়ের মাঝখানে চলে এলো।
কোন ভনিতা না করেই বললো,
—-দাদুকে ভাগ করা যাবে না, দাদু কি কোন স্থাবর জমি? যে তার বন্টননামা দলিল হবে? আমি ভাবতেও পারছিনা তোমরা দাদুর ছেলেমেয়ে হয়ে দাদুর সাথে এমন করবে।
মিশুর কথায় যেন ঘরে বজ্রপাত হলো!

—–মিশু তুইতো অনেক বেয়াদব হয়েছিস,বড়দের মাঝখানে এসে এমন বেয়াদবের মতো কথা বলছিস। আমরা যা করছি মা আর সবার ভালোর জন্য করছি। সালেহা বেগমের মেজো ছেলে রাগতস্বরে বললো।

—-বেয়াদবি! এই সামান্য কথা যদি বেয়াদবি হয় তাহলে তোমরা সবাই কি আদবের কাজ করছো চাচু? একটু বলবে?

—-মিশু অনেক বাড়াবাড়ি হচ্ছে তুমি তোমার রুমে যাও,সামনে পরীক্ষা পড়ালেখা করোগে। মা বললো।

—–কেন মা?দাদু গত চার বছর আমাদের বাসায় আছে এতে তোমার কোন স্বাধীনতা নষ্ট হলো? তুমিতো ভালো করে দাদুর সাথে কথা পর্যন্ত বলনি,দাদু কি খেলো দাদুর কি লাগবে দাদু কি ঔষধ খায় তুমি কি কিছু জানো? দাদুরতো চার সন্তান তাই তোমরা বন্টননামা দলিল করছো,তোমারতো মাত্র একটা সন্তান আমি তোমাদের দুজনকে কার সাথে ভাগাভাগি করবো?

——মিশু আমরা তোকে এই শিক্ষা দিচ্ছি? বড়দের সাথে কেউ এমন করে কথা বলে?
তোমার চাচা ফুপি কি মনে করবে? মিশুর বাবা রাগেগরগর করতে লাগলেন।

—কেন বাবা, তুমি গর্বকরে সবাইকে বলো তোমার মা রত্নগর্ভা! সব ছেলেমেয়েকে তিনি সঠিক ভাবে মানুষ করেছেন। এই যদি রত্নের নমুনা হয় তাহলে আমার এমন রত্ন হওয়ার দরকার নেই।
দাদু একসাথে তোমাদের চারজনকে বড় করেছেন মানুষ করেছেন আর তোমরা চারজনে একজনকে ভাগ করছো ছিঃ!

—-মিশু! অনেক বেশি কথা হচ্ছে ঘরে যাও,মিশুর মা মিশুকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেলো।
এক ঝটকায় ছেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো তারপর রাগে চিৎকার করে বলতে লাগলো,
—–দাদুর কোন ভাগ হবে না। হবেনা কোন বন্টননামা।
দাদু শুধু আমার।
তাই আমি এখনই দাদুকে নিয়ে গ্রামের বাড়ী চলে যাবো। যতদিন দাদু বেঁচে থাকবেন আমি গ্রামেই দাদুর কাছে থাকবো।
তারপর মায়াবি গলায় দাদুকে বললো,
—-দাদু তুমি রেডি হও,এখনই বের হয়ে গেলে যেতে বেশি রাত হবে না,যেতে পারবো,,,।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন