বাংলাদেশের বিধর্মী

পিনাকী রঞ্জন বিশ্বাস

“একমাস পরে মুন্সীগঞ্জের হাটে আজু শেখের পিঠে
এক প্রকান্ড কিল মেরে
বলাই বলল, শালা
মোছোলমানের হাতের জল খাইয়ে আমার
জাত মেরে দিইচিস?
আজু শেখও চটপট জবাব দিলো, মাঠের মধ্যি পানি কোথায়
পাবো রে হারামজাদা
পস্যাব করে দিইচি তোর মুখে
তারপর দু’জনে কাঁধ ধরাধরি করে ঢুকে গেলো
গোদা পা বিষ্টুর চা মিষ্টির দোকানে”|
– একটি ঐতিহাসিক চিত্র | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ক্ষমতার লোভ বড় সাংঘাতিক, এ লোভ মানুষকে পশু করে তোলে, শুরু হয় রাজনীতি | আর এই রাজনীতির ঝুপকাষ্ঠে বলি হয় সাধারণ মানুষ | এই সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত রাজনীতিবিদরা জানেন কীভাবে এদের মগজ ধোলাই করতে হয় | কখনো পয়সার লোভ, কখনো মানসিক অত্যাচার এবং বৃহত্তর কিছু হলে ধর্মের ধুনা জ্বালিয়ে দেওয়া | তখন জোর যার মুলুক তার | একটা সময় ধুনার ধুঁয়া যায় মিলিয়ে | সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে গলদটা তখন বড় দেরী হয়ে গেছে | ওপরের ঠান্ডা ছাই দেখে ভাবে সব ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু সেই ছাইয়ের নিচে শুয়ে হাসতে থাকে সুযোগ সন্ধানী ধর্মের নিভন্ত আগুন |

একদিকে দেখি গাল ভর্তি দাঁড়ি ফেজ টুপি আর তাম্বুল চর্বিত মুখে বর্ষিত হয় ধর্মের অপব্যাখ্যা, অন্য দিকে গৈরিক বসনে গো হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ | আবার হঠাৎ করেই কোটি কোটি টাকার গরু পাচার চক্র নিয়ে একেবারে CBI তদন্তে সরব | পাতা ওল্টালেই দেখা যায় সর্ষের মধ্যে ভূত | বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন | হাসতে হাসতে গঙ্গা পদ্মা বয়ে চলে আপন গতিতে |
কি বলতে চেয়েছিলাম আর কি বলে চলেছি |

২০১৯ সাল বাংলাদেশে আমার দ্বিতীয় বার পদার্পন| ময়মনসিং, নেত্রকোনা ঘুরে সিলেট | এবারের গন্তব্য চট্টগ্রাম, ট্রেন রাত ৯ঃ২০ তে | আটটার মধ্যে স্টেশনে পৌঁছে গেছি | রাস্তায় খাবার হিসাবে সিলেট স্টেশনে থেকে কিছু বিস্কুটের প্যাকেট কিনলাম | দাম দিতে গিয়ে দেখি ছাপানো নির্ধারিত মূল্যের থেকে সব কিছুরই পাঁচ টাকা দাম বেশি দিতে হচ্ছে | অতি মৃদু প্রতিবাদ থেকে কঠোর প্রতিবাদ হবার আগেই ভাষার টানে ধরা পড়ে গেলাম বিদেশী হিসাবে | এ বঙ্গের রাজধানী কোলকাতার ছেলে শুনেই তর্ক পরিণত হলো আন্তরিকতায় | ভালোবাসার জালে আবদ্ধ করলেন দোকানদার জনাব আবুল হোসেন ভাই | অনেক অনুরোধ করলেন একটি দিনের জন্য তার আতিথেয়তা গ্রহণ করার জন্য | আমি অপরাগ তা তাকে বোঝালাম, তিনি বুঝলেন | ট্রেন এসে গেছে আমার ভারি সুটকেশটি নিজের হাতে তুলে নিলেন, খেয়াল করলেন আমার সাথে জল নেই | তাড়াতাড়ি ফ্রিজ থেকে এক বোতল জল বার করে আমার হাতে দিলেন | দাম দিতে গেলাম নিলেন না | আমায় ট্রেনে তুলে দিলেন | ট্রেন ধীর গতিতে স্টেশন ছেড়ে এগুতে শুরু করলো, এসি কামরার বন্ধ জানালা দিয়ে দেখলাম তখনো তিনি হাত নেড়ে চলেছেন, এক সময় দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন আবুল হোসেন ভাই | আমি জলের বোতলের দিকে তাকিয়ে ভাবছি এ বোতলের জল খাবো কি করে? এ বোতলটার দাম যে এখন আমার কাছে লাখ টাকা |
আপনাকে কোনদিন ভুলতে পারবো না আবুল হোসেন ভাই |

২০২০ সাল | বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ | একটি সম্বর্ধনা নেওয়ার জন্য ডাক পড়ল সিলেটের একটি সংগঠন থেকে | একটু আগেই রওয়ানা হলাম | উদ্দেশ্য চট্টগ্রামের কিছু প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখার | কোলকাতা থেকে রওয়ানা হবার মুহূর্তে খবরে শুনলাম চিনে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে | কোথায় চিন আর কোথায় বাংলাদেশ! বাংলাদেশ ঘুরতে ঘুরতে বুঝতে পারলাম করোনার গতি আমার গতির থেকে কয়েক সহস্র গুন বেশি | লকডাউনে বন্দী হলাম চট্টগ্রাম গভঃ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গেষ্ট রুমে | একদিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে দূরভাষে বাড়ী থেকে খবর পেলাম মা পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে | পায়ের নিচে মাটি কেমন যেন আলগা মনে হলো | সামনে ছিলেন প্রফেসর জনাব শামসুদ্দিন শিশির আর প্রফেসর জনাব মহসিন ইসলাম | বুকে টেনে নিলেন দুজনেই | লকডাউনে আটকে থাকলাম পুরো তিনটে মাস | খবর পেয়ে একে একে ছুটে এলেন সব প্রফেসরাই | এই তিনটে মাসে ভুলে গেলাম সংসারে অভাব নামের বস্তুটি | মা যেমন বোঝেন এবং খেয়াল রাখেন সন্তানের কখন কোথায় কিসের প্রয়োজন তেমনই আমার যখন যেখানে যে জিনিষটির প্রয়োজন তা চাইবার আগেই পৌঁছে যেত ঘরে | আরো উল্লেখযোগ্য তা হলো তখন ছিলো রমজান মাস | উঁনারা সারাদিন উপোষ থেকে আমার সকালের এবং দুপুরে আহার মুখের সামনে তুলে ধরতেন | পরবর্তী সময়ে মহসিন ভাই প্রতিদিনই তার বাড়িতে নিয়ে শুধু ইফতারই নয় রাতের খাবার খাইয়ে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেছেন | তিনমাস পরে চোখের জলে বিদায় নিলাম তাঁদের কাছ থেকে, তাঁদের চোখের জলে পিচ্ছিল হলো আমার ফেরার পথ |
ধর্মের ধুয়োধারীরা আর কবে দেখতে পাবেন এ ভালোবাসা, এ মানবিকতার আলো ?

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন