বাবাদের কান্না শোনা যায় না

ডা: জোবায়ের আহমেদ

সন্তানদের জন্য মায়ের ত্যাগের সাথে কোন কিছুর তুলনা চলে না। মা মা মা ! কিন্ত বাবা নামে একটা শব্দও আছে। রুক্ষভাষী, কঠোর আবরণের আড়ালের আবেগ লুকানো একজন মানুষ। দুনিয়ায় অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্ত একজন খারাপ বাবাও নাকি নেই। গতকাল যেই শিশুটি মারা গেলো তার বাবা দূর প্রবাসে একা। মায়ের আর্তনাদ চোখে দেখবে সবাই, কিন্ত সেই মানুষটির হাহাকার কে বা বুঝবে?

সন্তানদের থেকে দূরে থাকা কোন বাবা মাঝরাতে একা,অন্ধকারে যখন বোবাকান্নায় ফুঁপিয়ে উঠেন,তখন তা কেউ দেখে না।

সন্তানকে বুকে নিয়ে ঘুমানোর তীব্র আকুলতা থাকার পরেও যখন কোন বাবা সন্তানদের সুখের পৃথিবী নির্মাণে দূরে থাকেন, সেই বাবার বুকের তীব্র চিনচিন ব্যাথা মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে আমার অনেক লোন।দুই মাসের লোনের ইএমআই দিতে পারছিলাম না।খুব পেরেশানিতে যখন আমি, তখন আমার বাবা গত পরশু আমার লোনের বকেয়া দুই মাসের ইএমআই আমার হাতে তুলে দিয়ে কেঁদে দিলেন।

আমি জানতে চাইনি এই টাকা কোথায় থেকে আসলো। আমি শুধু আমার বাবার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছি।

বাবারা কান্না করতে পারে না।বাবারা কর্কশ ও মেজাজী হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।বাবাদের আবেগ দেখা যায় না।

কিন্ত সন্তানকে কত মায়া করেন বাবা,সন্তানকে কতটা ভালোবাসেন বাবা তা বুঝা যায় সন্তানের অসহায় দিনে যখন কেউ পাশে থাকে না, তখন বাবা নামক বটবৃক্ষ ছায়া দিয়ে আশ্রয় দেয়।

মাথায় হাত বুলিয়ে বলে কোন চিন্তা নেই,আমি আছি তো। “আমি আছি তো”

তিন শব্দে কতটা নির্ভরতা ও সাহস যুগায় তা বুঝানো যাবে না কাউকে।

বাবারা আমাদের গল্পে, লেখায়,কবিতায় উপেক্ষিত।মাকে ঘিরেই সন্তানের সব অনুভূতির পরেও এই লোকটা হাসিমুখে পুরান জুতা,মলিন শার্ট ও সস্তা মোবাইলে খুশি থাকে।

গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন টেস্ট দিতে মেয়েকে নিয়ে রাজশাহী যাওয়া এক বাবা ক্লান্ত শরীরে পরীক্ষার হলের বাইরে ঘাসের উপর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।সেই দৃশ্যটা এত বেশি আমার মনে দাগ কেটেছিলো বুঝাতে পারবো না।

কোটি প্রবাসী দেশের বাইরে থাকেন, সন্তানদের থেকে দূরে থাকেন। ইচ্ছা করলেও সন্তানকে ছুঁয়ে দিতে পারেন না সেই বাবারা।কোলে তুলে নিতে পারেন না। সন্তানের সাথে খুনসুটি করতে পারেন না। সারাদিনের ক্লান্তির পর রাতে প্রিয় সন্তানের ঘ্রাণ পান না।তারপর ও বুকে ব্যাথা মাটিচাপা দিয়ে সন্তানদের জন্য নীরবে কাজ করে যান তারা।

অনেকের লাশ কফিনবন্দী হয়ে দেশে এসে কবরস্থ হয়ে যায়। সন্তানরা কি কখনো অনুভব করতে পারে এই বাবাদের মায়া ও স্নেহ সমুদ্রের গভীরতা? মা সন্তানদের নিয়ে সুখে থাকুক।যত্নে থাকুন। কিন্ত বাবাদের কথাও মনে রাখি আমরা।

বাবারা অল্প কথা বলেন। অল্প কথার গভীরতার তল স্পর্শ করতে শিখুক সন্তানরা।

লেখক: চিকিৎসক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন