বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানা থাকুক একসাথে

মনসুর আলম

দেশে গিয়েছিলাম ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে, ছিলাম মাত্র ২৮ দিন। এর পরে আর যাওয়া হয়নি। আব্বা অসুস্থ দীর্ঘদিন যাবত। ফোন করলেই শুধু জিজ্ঞেস করতেন দেশে কবে যাবো। ডিসেম্বর ছাড়া তো ছুটি নেই আব্বা, আগামী ডিসেম্বরে আসবো ইনশাআল্লাহ- প্রতিদিন এই একই জবাব দিতে লজ্জা লাগতো। আব্বা বলতেন আচ্ছা, ডিসেম্বরে এসো কিন্তু।

ডিসেম্বর আসার আগেই নভেম্বরের ৭ তারিখ আব্বা চলে গেলেন পালনকর্তার সান্নিধ্যে। শেষ দেখা হলো না। এখন আর ফোন ধরেই কেউ জিজ্ঞেস করে না, “দেশে কবে আসবে?” কোভিড পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বন্ধ ছিলো জানাজায় শামিল হওয়াও ভাগ্যে জোটেনি।

আব্বা দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলেন, অর্ধেক প্যারালাইজড। শেষ কয়েকবছর রোজা রাখতে পারেননি। কাফফারা হিসেবে দরিদ্র মানুষদের খাবার ব্যবস্থা করতাম। প্রতি রোজায় আলাদা করে টাকা পাঠাতাম। এবারের রোজায় আব্বা নেই, আমার টাকা পাঠাতে হয়নি। প্রথম রোজা থেকেই মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, কোনো অবস্থাতেই আব্বাকে ভুলতে পারছি না। কিছুদিন আগে আমি নিজেও বড়রকমের অসুস্থ ছিলাম। বউ, বাচ্চাকে কিছু বলি না পাছে ওরা আবার আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। বাবার স্মৃতি বুকে চেপে রেখে ঘুরে বেড়াই। নিজেও তো বাবা;

আমার সন্তানদেরকে দেখলে আব্বার কথা আরো বেশী মনে পড়ে। আমারও ইচ্ছে হয় চিৎকার করে ‘আব্বা’ ডাকি।

কাফফারার জন্য টাকা পাঠাতে হয়নি, সেই টাকা দিয়ে বৃদ্ধ মানুষদের জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। গতকাল সকালে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়েই সোজা চলে গেলাম বৃদ্ধাশ্রমে। শহরের এক কোণে নিরিবিলি পড়ে আছে শতশত বৃদ্ধ, বৃদ্ধা। কেয়ারটেকারকে সব বলে বৃদ্ধদের সাথে দেখা করার অনুমতি চাইলাম।
– স্বাভাবিক পরিস্থিতি হলে অবশ্যই তোমাকে দেখা করতে দিতাম। কোভিডের কারণে দেখা করার কোনো সুযোগ নেই, আমি খুবই দুঃখিত।

– আমি যদি ওনাদের জন্য কিছু ফলমূল নিয়ে আসি, এলাউ করবে?

– অবশ্যই, কৃতজ্ঞতার সহিত।

ফিরে এসে কয়েক ধরনের ফলমূল কিনে নিয়ে গেলাম। কেয়ারটেকার আমাকে রিসেপশনে বসিয়ে রেখে ওগুলো ভেতরে নিয়ে গেলো। ফিরে এসে বললো দুজন আসছে তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে। নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স হলেও বেশ শক্ত সামর্থ্য চেহারা ওনাদের। স্বামী- স্ত্রী দুজনই একই ইউনিটে থাকেন। আমাকে দেখেই দূর থেকে দুইজন একসাথে বলে উঠলেন “God bless you my child”

দুজনেরই চোখ ছলছল করছে, মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি। চোখেমুখে শূন্যতা, বুকের গভীরের হাহাকার কোনভাবেই লুকিয়ে রাখতে পারছেন না। প্রচন্ড ইচ্ছা হচ্ছিল একটু জড়িয়ে ধরি কিন্তু, সোশ্যাল ডিসট্যান্স মানতে হবে তো। দূরে দূরে বসে কথা বলছিলাম।

– যদি কিছু মনে না করেন একটি প্রশ্ন করবো?
– নিশ্চিন্তে করো।

– জীবনের এতগুলো বছর পার করে এসেছেন, কত চড়াই উৎড়াই অতিক্রম করেছেন। এখন বৃদ্ধাশ্রমে থেকে কোন জিনিসটার অভাব সবচেয়ে বেশী বোধ করেন? দুজন সমস্বরে বলে উঠলেন ‘গ্রান্ড চিলড্রেন’।

– ছেলেমেয়েরা এসেছিল নাতিপুতি নিয়ে সেই চার বছর আগে, আর আসেনি। আমাদের খুব ইচ্ছা করে নাতিপুতিদের সাথে খেলতে, ওদের হাত ধরে হাঁটতে ইচ্ছে করে। ওদের চিৎকার, চেঁচামেচি শুনতে খুবই ইচ্ছা জাগে। দলবেঁধে বাচ্চারা দৌড়ঝাঁপ করবে এই দৃশ্য দেখে দেখেই মরতে চাই।

আহারে জীবন! বুকের ভেতরটা কেমন জানি হাহাকার করে উঠল। মনে হচ্ছিল ডুকরে কেঁদে উঠবো। আর বেশী দিন বাকি নেই, আমরাও পৌঁছে যাবো সেই গন্তব্যে। আমরা যারা আজ বৃদ্ধদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছি কাল যে আমাদেরও বৃদ্ধ হতে হবে। তখনই আমার মাথায় একটি আইডিয়া আসলো।

আমরা চাইলেও সমাজ থেকে বৃদ্ধাশ্রম নির্মূল করতে পারবো না, এতিমখানাও নির্মূল করতে পারবো না। সমাজের প্রয়োজনেই এগুলো থাকবে। তবে দুটোকে একসাথে করে ফেলতে পারি। যেখানে বৃদ্ধাশ্রম, সেখানেই এতিমখানা। বাচ্চাগুলো দাদা/দাদীর আদর সোহাগ পাবে আর বুড়া মানুষগুলো তাদের নাতিপুতিদের অভাব কিছুটা হলেও কম বোধ করবে। একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

লেখকঃ দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী লেখক

আরও পড়ুন