ভালবাসার ইটে গাঁথি সম্পর্কের ইমারত

মাহজেবিন মম

জন্মসূত্রে যে সম্পর্ক গুলো আমরা পাই সে সম্পর্ক গুলো হচ্ছে সহজাত সম্পর্ক। মাঝে মধ্যে খুঁটখাঁট লাগলেও সেই সম্পর্ক গুলোতে স্থায়ী চিড় কখনই ধরে না। কিন্তু যে সম্পর্কগুলো জীবনপথে চলতে গিয়ে আমরা তৈরি করি সেগুলোতে ভাঙন খুব সহজেই ধরতে পারে। এমনি এক সম্পর্ক হচ্ছে বিবাহ সূত্রে তৈরি হওয়া সম্পর্ক। বিবাহের মধ্য দিয়ে যে সম্পর্কের বীজ বুনে দেয়া হয়, তাকে ধীরে ধীরে অঙ্কুরোদগম পর্যায় থেকে মহীরুহে পরিনত করতে অনেক বেশি যত্ন আর ভালবাসা দিতে হয়। আজ তেমনি এক সম্পর্কের গল্প পাঠকদের বলে যেতে চাই।

আমার বৃদ্ধা নানী-শ্বাশুড়ি বয়সের ক্ষেত্রে নব্বই এর ঘর অতিক্রম করেছেন। নিজস্ব ধ্যান ধারণা এবং প্রাচীন সংষ্কার নিয়ে উনি বহাল তবিয়তে আছেন। আমি উনার বড় নাতির বউ। আমাদের যখন বিয়ে ঠিক হয় তখন আমার সেমিস্টার ফাইনাল চলছে আর কর্তা মশাইয়ের মাষ্টার্সের থিসিস সাবমিশন। এমন সময়ে বিয়ে করার মানসিকতা আসলে কারোরই থাকে না। কিন্তু বিয়ে অগ্রহায়ণ মাসেই হতে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আমার নানী শ্বাশুড়ি। উনি উনার নাতির বিয়ে কোনমতেই পৌষ মাসে হতে দিবেন না কারণ উনার সময়ে পৌষ মাসে বিয়ে হওয়া দোষ বলে প্রচলিত ছিল। এর ফলে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে অগ্রহায়ণের শেষ দিনে বিয়েটা হয়েছিল। শুরুতেই উনার এই জেদ আমার মনে অজানা এক ভীতি এবং উনাকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছিল।

প্রথমবার শ্বশুড় বাড়ি গিয়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। এর কারণ হল আমার শ্বাশুড়ি মা ভাত রান্না করার সময় চাল কয় পট দিবেন সেটাও নানীকে জিজ্ঞেস করে নিচ্ছেন। এমনকি তেল, মসলা থেকে শুরু করে ফ্রীজে কত পোটলা মাছ মাংস রাখা হচ্ছে সেটাও উনাকে দেখিয়ে রাখতে হচ্ছে। আমি শুনেছিলাম সাধারণত অনেক কড়া শ্বাশুড়িরা এগুলো করেন কিন্তু নিজের মেয়ের থেকে এমন হিসেব নেয়ার নমুনা দেখে আমি হতবাক। মনের মাঝে গান বেজে উঠল-

“আমি যে দিকে তে চাই, দেখে অবাক বনে যাই
কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ও ভাইরে”

এরপর দেখলাম উনি সবাইকে ধরে ধরে জেরা করেন যার ফলে সংসারের সমস্ত কিছু উনার নখদর্পনে। এছাড়া নিজের মেয়েকে উনি বাইরে খুব একটা যেতে দেন না। প্রথম প্রথম উনার ভাষা আমি কিছুই বুঝতাম না বলে বাসার অন্যান্য সদস্যরা আমাকে বুঝিয়ে দিত। আমাকে গ্রামের মানুষ দেখতে এলে উনি বলেছিলেন বউ তো ভালই এখন কাজেকর্মে শ্বাশুড়ির মত চটপটে হলেই হয়। এসমস্ত কাহিনি দেখে এবং শুনে আমি মনে মনে বললাম-

“ও আল্লাহ, আমারে কই আইনা ফাল্লা…”

ততদিনে উনি আমার কাছে মূর্তিমান এক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ালেন। তবুও ভয়কে গিলে ফেলে আমি উনার আশেপাশে ঘুরঘুর করি, পাশে বসে থাকি।
উনি যে ভাষায় গল্প করেন তার মাত্র ত্রিশ পার্সেন্ট বুঝলেও হু হা করি। দাঁত নেই বলে উনাকে পান পিষে দিতে হয়। আমিও পান পিষে দিতে শুরু করি। উনিও আমার সাথে হাসি ঠাট্টা করা শুরু করেন। সব সময় সবাইকে ধমকের উপর রাখা নানীকে আমার সাথে গল্প করতে দেখে অনেকেই অবাক হতে শুরু করে।

পরবর্তীতে জানতে পারি উনি আসলে খুব বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন। যার ফলে একটু বেশি আহ্লাদী মানে ওদের ভাষায় “দেওয়ানি” টাইপের আরকি। সারাজীবন খবরদারী করা স্বভাবের মহিলা অল্প বয়সে দুই সন্তান হারান। অনেক পরে উনার একমাত্র মেয়ে মানে আমার শ্বাশুড়ি জন্মান। কিন্তু মার মাত্র চার বছর বয়সেই নানা পরপারে পাড়ি জমান। এরপর থেকে একা হাতে সকল জমিজমার তদারকি করেছেন, একমাত্র মেয়েকে মানুষ করেছেন। তখন থেকেই উনার মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে, সম্পত্তির জন্য উনার মেয়েকে কেউ হত্যা করবে। সেই থেকে উনি মাকে কারো সাথে মিশতে দেননি। উনার দুই নাতিকেও উনিই মানুষ করেছেন। কারণ মা চাকরি করতেন, সারাদিন স্কুলেই থাকতেন। তাই দুই নাতির প্রতি উনার ভালবাসা অনেক বেশি।

এসকল কথা শুনে আমি উনার সকল কর্মকান্ড বিরক্তি হিসেবে না নিয়ে বিনোদন হিসেবে নিতে শুরু করলাম। উনিও আমাকে ভালবাসতে শুরু করলেন। কেউ এসে আমাকে কথা শোনাবে তার কোন জো নেই, উনি ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। উনার নাতি বউ নুপুর পায়ে হেঁটে বেড়াবে উনি দেখবেন, তাই নুপুর বানিয়ে দিলেন। আমাকে বদনজর থেকে রক্ষা করতে উনি আমার নতুন সব জামা কাপড়ের প্রান্ত পুড়িয়ে দিলেন। আমি কুসংস্কারের ঘোর বিরোধী হলেও ভালবাসা আর যত্নের বিরোধী হতে পারিনি, তাই মেনে নিলাম। আমার প্রতি উনার ভালবাসা সবচেয়ে বেশি টের পেলাম সেদিন যেদিন আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। আমার অবস্থা দেখে উনি প্রথমে ঝাড়ফুঁক করলেন, পানি পড়া দিলেন, আমার হাতটা ধরে বসে দু’আ দুরুদ পড়ছিলেন। যখন আমাকে হাসাপাতালে নেয়া হচ্ছিল উনি গগনবিদারী চিৎকার করে বলছিলেন – ” ও আল্লা, মোর নাতিবৌক ভাল করিদে”। আমি মনে মনে স্রষ্টাকে বললুম-

“আমি অকৃতি অধম ব’লেও তো
মোরে কম করে কিছু দাওনি,
যা দিয়েছ তা’রি অযোগ্য ভাবিয়া
কেড়েও তা কিছু নাওনি”

এরপর থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি কোনদিন এই মানুষটাকে কষ্ট দিব না। উনি সারাদিন মাকে কাজের উপর রাখেন কিন্তু আমাকে কিছুই বলেন না। কেউ বাসায় না থাকলে আমার সাথে বসে গল্প করেন। আমি চা নিয়ে বসলেই পাশে এসে বসেন। একদিন বললাম নানী আপনাকে চা দেই, চা খান। উনি বললেন- “মুই খাবা নাও। তোর নানা মোক খিলবা পারে নাই”। জিজ্ঞেস করলাম এর কারণটা কি বলেন তো? উত্তরে বললেন- ” মুই ওয়াজত শুনছু, চা খাওয়া হয় না। চা আর গরুর পেশাব খাওয়া এক কথা। ” উনার কথা শুনে আমি হাসব না চা খাওয়ার কষ্টে কাঁদব বুঝতে পারিনি। মনে মনে ভাবলাম-

“পরাণের চা রে, গোমূত্র খাইলাম তোর কারনে”

একদিন বাড়িতে আমার ননদেরা বেড়াতে এলেন। সুমি আপা মুখ ধুয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোন ক্রীম টিম আছে কিনা? আমি কোন ক্রীম ব্যবহার না করায় দিতে পারলাম না। নানী আমাকে অবাক করে দিয়ে ফেয়ার এন্ড লাভলী বের করে বললেন-” মোর আছে, মোরটা মুখে দে”। এই বয়সে উনার রুপ সচেতনতা দেখে আমি আপার দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করলাম। নানী বললেন “তুই হাসোছিস কেন? তোর নানা মোক কতকিছু আনি দিত। মুই সগ দেখছু, সগ পিনছু ময়না।” বলে রাখি উনি নিয়মিত ক্রীম, পাউডার সব ব্যবহার করেন এবং আমাকেও ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। জামা কাপড় এনে দিলে হাতে ধরে সুতার বুনন দেখেন, রং দেখেন, পছন্দ না হলে ছুঁড়ে ফেলে দেন। অ্যাজমার সমস্যার জন্য মা উনাকে অল্প পানিতে গোসল করান বলে উনি ঘোষণা দিলেন উনাকে গাঁ ঘষে গোসল না করিয়ে দিলে উনি গোয়ালঘরের দেয়ালে গিয়ে গা ঘষবেন। এই কথা বলে উনি অভিনয় করে দেখালেন কেমন করে গা ঘষবেন আর তা দেখে আমি আরেকবার হাসিতে লুটিয়ে পড়লাম।

উনার খবরদারিতার জন্য আমরা উনাকে ডাকি মহারাণী ভিক্টোরিয়া বলে। এমনিতে উনি কানে শোনেন না, আমি যদি বলি ভাত তো উনি শোনেন মাছ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে উনাকে নিয়ে কিছু বললে বা উনার কাছ থেকে গোপন করতে চাই এমন কথাগুলো আস্তে বললেও উনি শুনে ফেলেন। উনার দুইটা পুরোনো ট্রাঙ্ক আছে যেগুলো উনি উনার মেয়েকেও খুলতে দেন না। আমি গেলে আমাকে দিয়ে ওগুলো তদারকি করেন, প্রয়োজনীয় জিনিস বের করেন। উনার দুই কানের দুল দুই নাতির বউ এর জন্য রেখে দিয়েছেন ঐ ট্রাঙ্কে, তারজন্যেই এত সতকর্তা।

গতবার বাসায় গেলাম, নানী আমাকে আর উনার নাতিকে ডাকলেন। পাশে বসতেই উনার মাথার বালিশ নাতির হাতে দিয়ে বললেন এটা খুলে দেখ। অনেক খুঁজে বালিশের এক প্রান্তে আনাড়ি হাতের সেলাই দেখে সেদিকটাই খুললাম। বালিশের তুলার মাঝে ছোট্ট একটা ব্যাগ, তার মাঝে আরেকটা ব্যাগ, সেই ব্যাগে ছোট্ট পুটুলিতে কিছু টাকা রাখা। উনি উনার নাতিকে বললেন -“তুই এই টাকা দিয়া কাপড়া কিনবু”। আমি এই ভালবাসা দেখে বহুকষ্টে নিজের চোখের জল সামলে বললাম, নাতিকে তো দিলেন আমারে দিবেন না? উনি বললেন- “তোক মুই পৌষ মাসত দিম, এলা মোর হাত খালি”। এই কান্ডের পর বুঝলাম উনি কেন উনার বিছানা বালিশ কাউকে ধরতে দেন না, হাত কাঁপা স্বত্বেও কেন নিজেই নিজের বিছানা ঠিক করেন।

এ কয় বছরে নানী আরও বৃদ্ধ হয়েছেন।খেতে দিলেও বলেন খেতে দেয়া হয়নি, মনে রাখতে পারেন না সবকিছু । সংসারের খবরও আর আগের মত রাখতে পারেন না। তবে মাঝে মধ্যেই লাঠিতে ভর দিয়ে গোটা বাড়ি ঘুরে দেখেন। গাছের আম,পেয়ারা, জাম্বুরা ঠিকই দেখে রাখেন। কাউকে দিতেও দেননা, বলেন – “মোর নাতি বউ আসি খাইবে”। আমার যেদিন অনার্সের রেজাল্ট হল সেদিন উনার খুশির সীমা নাই। যে আসে তাকেই বলেন ” মোর নাতি বউ পাস হছে, মুই তোমাক মিষ্টি খিলামো”। সেদিন ফোন দিয়ে উনার নাতিকে সাবধান করে দিলেন আমাকে যেন কিছু বলা না হয়, ধমকের সুরে কথা বলা না হয়।

আমাকে বললেন-“মাইনষের বাড়ির বউয়েরা হাপুস হুপুস করি খায়, আর মোর বাড়ির বউ কেছু খায় না। তুই আয়, মুই দেখিম তুই কেঙ্কা করি না খাস। তোক মুই ঠাসি ঠাসি খিলাম”। এই কথা শুনে আমার আবারও হাসতে হাসতে অজ্ঞান হবার জোগাড়।

উনার সকল খবরদারী আচরণ, সংষ্কার, কুসংস্কার মাঝে মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক যে ঘটায় না এমনটা নয়। তবে আমি এত দিনে বুঝে গিয়েছি এক আকাশ সমান ভালবাসার কাছে এসকল ত্রুটি আসলে কিছুই নয়। মানুষ মাত্রই কোন না কোন ত্রুটি থাকবেই। আমি আজীবন ভালবাসা প্রত্যাশী, তাই ভালবাসা পেলে তা কুড়িয়ে নিতে এক মুহুর্তও দ্বিধা করি না। এই ক বছরে আমার উপলব্ধি হল-

” সম্পর্কে বিরক্তি ও তিক্ততা নতুন কিছু নয়,
তাই বলে করা যাবেনা সম্পর্ক ক্ষয়,
মনে জমা কালোমেঘ গুলো বৃষ্টির ন্যায় ঝরাতে হয়,
ভালবাসার ইটেই সম্পর্কের ইমারত গড়তে হয়..

আরও পড়ুন