মহীয়সীর কলামঃ থার্ড জেন্ডার কেন অসামাজিক?

হোসনে আরা মেঘনা

মেয়েকে নিয়ে রাজশাহী ভার্সিটির ভেতরে ঘুরছিলাম যাতে ভার্সিটির বিশাল চত্বর, সেখানকার পরিবেশ, ভৌত ও অবকাঠামোগত অবস্থা, শিক্ষার মান, ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নত আবাসন ইত্যাদি দেখে ওর মনে পড়ার প্রতি আগ্রহ জাগে, লিখা পড়ায় আরও মনোযোগী হয়।

হঠাৎ চোখে পড়লো সমাজকর্ম ডিপার্টমেন্টের সামনে ডিপার্মেন্টের চেয়ারম্যান ডঃ আরেফিন মাতিন স্যারকে ঘিরে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী কথা বলছে। আমার মনে কৌতুহল জাগলো কি বিষয়ে কথা হচ্ছে জানার জন্য। গিয়ে স্যারকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করে দাঁড়িয়ে পড়লাম ওদের সাথে। বুঝলাম সেখানকার আলোচনার মধ্যমনি এমন এক ব্যাক্তি যার মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত, এক সাইডে সিঁথি করে ছেড়ে দেওয়া। পরনে একটি ফতুয়া আর জিন্স। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। অনেকটা কবি কবি চেহারা। কণ্ঠটা কেমন মেয়েলী, তবে পুরুষ না মহিলা ঠিক বুঝতে পারলামনা। বয়স অনুমান ছাব্বিশ-সাতাশ বছর হবে। কোনো সাজগোজ নেই, অতি সাধারণ বেশ। ধীর স্থির কথা, অমায়িক ব্যবহার।
ওরা চলে যাবার পর স্যার আমাকে আর আভাকে উনার চেম্বারে বসিয়ে গল্প করতে লাগলেন। গল্পের এক ফাঁকে আমি ওই ছেলের সম্পর্কে জানতে চাইলে স্যার বললেন, ওটা হিজড়ে। ভার্সিটি থেকে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। এখন ভাল একটা চাকরি খুঁজছে। আমি শুনে হা করে রইলাম। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। বললেন অবাক হবার কিছু নেই। এখন অনেক পরিবারই হিজড়ে সন্তানদের প্রতি কেয়ারফুল। আমি চমকিত হলাম আর ওই পিতা- মাতাকে মনে মনে স্যালুট জানালাম।

কিছু দিন আগে ভবানীগঞ্জ থেকে বাসে চেপে বসলাম রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। মোহনপুরে এসে বাসে একদল হিজড়ে উঠলো। একে একে সবার কাছ থেকে বিশ টাকা করে চাঁদা নিচ্ছে। একজন দশ টাকা দিয়ে বললো– আর নেই। কিন্তু হিজড়েটা টাকা দেখতে পেয়েছিল। তাই পকেটে হাত দিয়ে টাকা তুলে নিতে লাগলো। অমনি হাত চেপে ধরে মুচড়ে দিল। হিজড়েটা রেগে যাচ্ছেতাই খারাপ ভাষায় গালি দিল। আরেক জনের কাছে যেতেই সে টাকা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলো। তাতে হিজড়েটা যা করলো কল্পনার অতীত। এতগুলো লোকের সামনে নিজের গায়ের পোশাক খুলতে যাচ্ছে। তখন বাসের সবাই একযোগে ঝাঁকি দিয়ে উঠে -বললো —–“এই হিজড়েদের বাস থেকে নামিয়ে না দিলে আমরা সবাই নেমে যাবো।”
তখন বাসের কন্ট্রাক্টর ওদের নেমে যেতে বললো। নামতে নামতে আমার কাছে এসে টাকা চাইলো।
বললাম -কাজ করে খাও যাও।
হিজড়েটা হাত তালি দিতে দিতে বললো —- কে কাজ দেবে শুনি? আমাদের তো কেউ কাজে নেয়না।
আমি বললাম —- স্বভাবটা ভাল করো, সবাই কাজে নেবে।
কিছু দিন আগে মেসেঞ্জারে একটা ভিডিও পেলাম। এক হিজড়ে মাছের আড়তে এসে মাছ চাইছে। আড়তদার মাছ দিতে নারাজি হওয়ায় সে বলছে— তোর মাছে মুতে দিবো, মাছ দিবিনা ? বলতে বলতে প্রথমে জামাটা গলা পর্যন্ত তুলে থুঁতুনী দিয়ে ধরে পায়জামাটা খুলে ফেললো। আড়তদার বাধ্য হয়ে একটা মাছ দিল, সেটা নিয়ে সে চলে গেল।

হাটে -বাজারে,রাস্তা-ঘাটে হিজড়েদের দল বেঁধে ঘুরতে দেখে হাজারও প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খায়। হিজড়ে সন্তানদের দায়িত্ব অভিভাবকরা নেয়না কেন? জন্ম নেওয়া অপরাধ নাকি জন্ম দেওয়া অপরাধ ? হিজড়ে বলে না হয় অবুঝ কিছু লোক হাসি তামাশা করবে, তাই বলে কী পিতা -মাতা হিজড়ে সন্তান ঠিকানাবিহীন পথে ছেড়ে দেবে? একটুও মায়া হয়না ? পিতার ঔরষের, মায়ের গর্ভের কোনও দাবি, অধিকার নেই তাদের ? ওরা কেন পথে ঘাটে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে জীবন অতিবাহিত করবে? এদের এই করুণ পরিনতি আর অসামাজিক আচরণের জন্য দায়ী কে ?
আমি বলবো এদের অসামাজিকতার জন্য দায়ী সর্বপ্রথমে ওদের বাবা- মা। কই, ভার্সিটি থেকে পাশ করা ওই হিজড়েকে তো ওর বাবা মা ফেলে দেয়নি ! তেমন করে সব বাবা মা তাদের হিজড়ে সন্তানের দায়িত্ব নেয়না কেন?

দ্বিতীয়তঃ সরকার হিজড়েদের নিয়ে শুধু আইন পাশ করলেই চলবেনা, সে আইনের বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তার যথাযথ তৎপরতা থাকতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে সকল শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে হিজড়েদের প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতামূলক পাঠ রাখতে হবে। যাতে এদের দেখলে কেউ আর হাসি তামাশা না করে, পথে-ঘাটে উত্যক্ত না করে, তাদের নিয়ে বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে।
সমাজের সবাই যেন বুঝে—- থার্ড জেন্ডার হলেও ওরাও মানুষ, যোগ্য পরিবেশ পেলে, উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেলে ওরাও দেশের উন্নয়নে সহযোগী ভুমিকা রাখতে পারে।
লেখকঃ শিক্ষক, সাহিত্যিক ও অ্যাডমিন, মহীয়সী 

আরও পড়ুন