মাওলানা সাহেবের নাতী

ডাঃ জোবায়ের আহমেদঃ

আমাদের দাদাভাই মরহুম প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল মান্নান ওয়াজেদী ছিলেন আমাদের এতদ অঞ্চলের স্বনামধন্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইসলামিক ব্যক্তিত্ব।
আমরা মাওলানা সাহেবের নাতী হিসেবে পরিচিত ছিলাম সবার কাছে।

এখনো আমাদের উপজেলায় যেকোন প্রান্ত থেকে দাদার পরিচিত দিলে মানুষ অনায়েসে আমাদের চিনে যায়।
মনে পড়ে দাদাভাইকে।

ছোট বেলায় দাদাভাই এর সাথে বিভিন্ন মাহফিল বা দাওয়াতে গেলে হাদিয়া পেতাম।
বড় হুজুর এর সাথে ছোট হুজুর ও কিঞ্চিৎ সম্মান ও হাদিয়া পেতো।।

একবার আমাদের কলেজের হিসাববিজ্ঞান এর শিক্ষক প্রফেসর ড.আলী হোসেন স্যারের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলাম দাদাভাই এর সাথে।
স্যার হাদিয়া দেওয়ার সময় হুজুর বলে সালাম দিয়ে আমার হাতেও হাদিয়া দিলেন।
আমিও তখন হাদিয়া নিয়ে তাড়াতাড়ি পকেটে পুরে ফেললাম।
২০০৩ সালে ৫০ টাকা অনেক টাকা।
পরের দিন কলেজ করিডোরে স্যার আমাকে দেখে চমকে উঠলেন।

আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,হুজুর আপনাকে গতকাল মাওলানা সাহেব হুজুর এর সাথে আমাদের বাড়িতে দেখেছি।

আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
বললাম, স্যার আমি উনার মেজো ছেলের বড় ছেলে।
স্যার বললেন,অহ তাই বলুন।
কিন্ত হুজুর কে আচমকা শার্ট প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখে স্যার যে আহত হয়েছিলেন, তা ছিলো দেখার মত।

আমাদের দাদাভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।

দাদা ভাইয়ের পুরো চিকিৎসা আমার তদারকিতে হয়েছে।
ল্যাব এইডের আইসিইউ এর সামনে রাতে ফ্লোরে শুয়ে থাকতাম।
দাদাভাই এর দোয়া নিতে সব করেছি।
মৃত্যুর আগে যখন কুমিল্লা থেকে ঢাকা নিয়ে যাই,এম্বুলেন্স ছেড়ে দিলো,কিছুদূর এসে দাদাভাই এম্বুলেন্স থামাতে বললেন।
তারপর আব্বা দৌঁড়ে আসলো পিছন থেকে।
তখন দাদাভাই আব্বার হাত ধরে বললেন, তোমাকে অনেক ভালবাসি।।
তুমি বঞ্চিত হয়েছো, অনেক কষ্ট পেয়েছো সন্তানদের নিয়ে কিন্ত আমি প্রাণভরে দোয়া দিয়ে যাচ্ছি।
তুমি যেই দোয়া অর্জন করে নিয়েছো, তা আর কেউ পায়নি।
এই দোয়া বৃথা যাবেনা।
এর ফল তুমি উপভোগ করবে ইনশাআল্লাহ।

আব্বার হাত ধরে আছেন দাদাভাই।
কি যেন ভাবলেন কয়েক মিনিট।

তারপর বললেন, “সফর যদি সংক্ষিপ্ত হয় তবে আমাদের মিলন হবে আবার।কিন্ত সফর যদি দীর্ঘ হয়ে যায়,তবে হাশরের মাঠে তোমার সাথে আমার দেখা হবে।”

আমাদের দাদাভাই এর সফর দীর্ঘ হয়ে গিয়েছে।
উনি যখন বাড়ি ফিরে আসেন,তখন নিথর দেহ কফিনে।

কিন্ত আব্বাকে বলে যাওয়া কথাটার গভীরতা আজো আমাকে বিমোহিত করে।।

আমি যখন আইসিইউ তে উনাকে দেখতে যেতাম,আমার হাত ধরে একবার বলছিলেন, ভেন্টিলেশনে দেওয়ার আগে, তোমাদের জন্য মায়া লাগে।
আর কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিলো কিন্ত সময় নেই,যেতে হবে তোমার দাদীর কাছে।
আজো আমার কানে বাজে।

কোনদিন মানুষের সাথে মুখ গোমড়া করে কথা বলেননি দাদাভাই
এত বিনয় ছিলো উনার।
একটা মিনিট সময় অপচয় করতেন না।
সারাক্ষণ কিতাবে মুখ গুজে থাকতেন।
উনি মোনাজাত এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন।
উনার মোনাজাতে মানুষ হাউ মাউ করে কেঁদে দিতো।

আজকাল অনেক আলেম, মাওলানা আমরা দেখি, যাদের ইলম থাকলেও আমল নেই।
আমাদের দাদাভাই ছিলেন ব্যতিক্রম।।

দাদাভাই কে দেখলে মানুষ শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যেতো।
সাইকেল, রিক্সা থেকে নেমে সালাম করতো।

হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে গিয়েছেন, যেন দাদাভাই উনাদের জানাজা দেন ও কবর তালকীন করেন।

একজন পূর্ণবান গভীর জ্ঞানের অধিকারী মাওলানা ছিলেন দাদাভাই।
দাদাভাই এর চেহারায় একটা আলো ঝলমল করতো সবসময়।।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. দেলোয়ার হোসেন কাকা দাদাভাইকে এতটা মানতেন,আজো উনি বাড়ি গেলে উনার কবর জিয়ারত না করে আসেন না।

দাদাভাই এর জানাজার দিন পুরো এলাকায় শোকের মাতম।
উনার ছাত্র মাওলানা আবু হানিফ হুজুর বলছিলেন,হুজুর এর মৃত্যুতে গাছের পাতারাও শোকে চুপচাপ হয়ে গেছেন।

হাজার হাজার মানুষ জানাজায় ঢল নেমেছিলো সেদিন।
দুইটা জানাজা দিতে হয়েছে।

চিটাগং এর পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও পীর সাহেব হুজুর জানাজার ইমামতি করতে ছুটে এসেছিলেন।

দাদাভাই এর জানাজা কে পড়াবেন তা তিনি আমাদের বাসায় বসে আমার সামনে আব্বাকে ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন।
সেদিন তিনি বলেছিলেন, আলেমের তো অভাব নাই কিন্ত আমলধারী আলেম তো আমার চোখে পড়ে না।

আগেই অনুমান করেছেন।
উনার দুইটা জানাজা দিতে হবে।
এত লোক আসবে আমরা অবাক হবো।
দাদাভাই বলেছিলেন,আমার মৃত্যুর পর বুঝবে মানুষ আমাকে কি পরিমান মহব্বত করে।
আমরা তা দেখেছি।।

মনে পড়ে দাদাভাই কে।
আল্লাহ দাদাভাই ও বুবুকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন এই আরজি মাবুদের দরবারে।

দাদাভাই আমার জন্য একবার দোয়া করেছিলেন, আমার রক্তের উপর কেউ যদি অন্যায়ভাবে আঘাত করে,ক্ষতিগ্রস্থ করে, সে ধ্বংস হবে।

আমার ক্ষুদ্র জীবনে অনেক মানুষকে দেখেছি বন্ধু সেজে এসে ছোবল দিতে, হীনস্বার্থে আমাকে বিপদে ফেলতে, অনেক মানুষ বিনা কারণে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে আমার অনিষ্ট করেছেন।

তাদের পরিনতি আমি নিজ চোখে দেখেছি।

আমাদের মা বাবা আমাদের প্রতিশোধ পরায়ণ হতে শিক্ষা দেননি।
ক্ষমা ও ধৈর্য্যের শিক্ষা পেয়ে আমরা বড় হয়েছি।

আপনি আমাকে গালি দিলেও আমি হাসিমুখে আপনাকে ধন্যবাদ দিবো।।
আপনি অন্যায্য ভাবে আমার বিরুদ্ধে অনিষ্ট করলেও আমি চুপ থাকবো।
আমি প্রচন্ডভাবে আমার দাদাভাই এর করে যাওয়া দোয়ায় আস্থাশীল।।

আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে,সব কিছু নিজ হাতে করতে নেই।
নিজে করতে নেই।
কিছু জিনিস ছেড়ে দিতে হয়,সেই পরাক্রমশালী আল্লাহ এর হাতে।
নিশ্চয়ই তিনি উত্তম বিচারক।
মানুষ বিচার করে বাইরে থেকে,আল্লাহ বিচার করেন অন্তর দেখে।।

লেখকঃ চিকিৎসক ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন