রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি

অলভ্য ঘোষ

পাশের বাড়ির প্লাজমা টিভি এলে আমার ঢাউস ছত্রিশ ইঞ্চি টিভি টা আর ভাল লাগে না। পাশের বাড়ি পালসার কিনলে আমারো আলসার অনিবার্য। পাশের বাড়ি কাশ্মীর গেলে আমি দার্জিলিং। অ্যালবামে ভরে ফেসবুকে ছেড়ে সকলকে দেখাব। কী ফূর্তিটাই না করেছি। পাশের বাড়ির ছেলে বিয়ে করলে আমারো সুন্দরী বৌ চাই। রাস্তায় নিয়ে বেরুলে পাড়া প্রতিবেশীর চোখ যাতে ছানাবড়া হয়ে যায়। পাশের বাড়ির ছেলে হলে আমারও একটা ছেলে হবে। তারপর পাশের বাড়ির বাচ্চাটা সাউথ পয়েন্ট এ গেলে আমার ছেলেও পাঠভবনে যাবে। সে যে আমারই মতো প্রতিভাধর। কত টাকা ডোনেশন? প্লিজ জিজ্ঞেস করবেন না। পাশের বাড়ির লোকটা কবিতা লিখে বিখ্যাত হলে আমিও দিস্তা দিস্তা খাতা ভরে দিতে পারি। আমার বৌএর সাথে প্রেমালাপ শুনলে বুঝবেন কালিদাসি মহাকাব্য আর ঝগড়াগুলো সব postmodern কবিতা। বৌ তো বলে লেখ লেখ লোকে জানুক তুমি কী জিনিস। লিখলাম না তাই রবিঠাকুর করে খেল।

এমনি করতে করতে পাশের বাড়ির লোকটার হল দুরারোগ্য ব্যাধি। লোকটা কেঁদে কেটে বলতে লাগল সকলকে; কত টাকা খসল তার। আমার হিংসা হল ব্যাটার কী দেমাক দ্যাখো মরার সময়ও টাকার গরম। আমিও কম যাই না, বুকে বসলো পেসমেকার। fully satisfied। দ্যাখ শালা কত টাকার জিনিস বুকে করে নিয়ে ঘুরছি। পাশের বাড়ির লোকটার শেষ পোস্টিং হল কেওড়াতলায়। আমি ছেলেকে জানিয়ে রাখলাম আমারটা যেন নিমতলায় হয়। ওখানে রবিঠাকুর পুড়ে ছিল।

ছেলে বলল, বাবা শ্মশান ডিঙোতে নেই।

রেগে গেলাম চুপ কর হারামজাদা; বাপের ঘারে বসে এতদিন গিললি কিছু কর্তব্য কর। ঠ্যাং ধরে টানতে টানতে জলদি গতি-গঙ্গা করার মতলব। এগুতে গেলে ডিঙোতে হয়।রেসের মাঠে দেখনি।

ছেলে টোপ দিল; বাবা কেওড়াতলাতে কম মনিষী পোড়ে নি। উত্তম কুমার।
বেস যুতসই লাগল; আমারই তো ছেলে, বেশ বুদ্ধি আছে। উত্তম বাবুর পাশাপাশি সুচিত্রা সেন। How romantic! ফুটেজ পাওয়া যাবে ভালো। এই প্রথম আমি পাশের বাড়ির সাথে adjust করে নিলাম।
খাটের ওপর দুলতে দুলতে এখন চলেছি কেওড়াতলার দিকে। বাবার কথা মনে পড়ছে। তখন আমি ভালোভাবে কথা বলতে পারি না; বাবা বলত বড়ো হয়ে কী হবি? আমি আধো আধো ভাষায় বলতাম ডাকতার, ইনজিনিয়ার, ছাইনটিস্ট।

যেন পৃথিবীতে আর কোনো পেশা নেই। কথাগুলো সব ওদেরই শেখানো ছিল। কেউ বলে নি ঘাটের মড়া আগে মানুষ হ, তার পর যা ছেঁড়ার ছিঁড়বি। আমি আমার ছেলেকে শিখিয়ে রেখে গেলাম কটা শকুন মরলে তোর বাপের মতো একটা মাল জন্মায়। যাবার পথে হরিনামের বদলে ফচকে ছেলেগুলো খই ছিটিয়ে বলছে;

”সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।”
দেশটা দেখছি বেশ কালচারাল হয়ে গেলো রাতা রাতি।

লেখকঃ ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন