লকডাউন ও আমাদের জীবনযাত্রা

মোসাঃ নাছরিন সুলতান

লকডাউন আমাদের ভাল ও খারাপ দুইদিক থেকেই চরম শিক্ষা দিচ্ছে! এখন প্রশ্ন হলো আপনি কোন দলে আছেন?

প্রথমে ভাল দিকটাই বলি – প্রথম যেটা সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনেছে তাহলো জনসচেতনতা, আগে মানুষ দিনে তিনবারের বেশি হাত ধোঁয়ার কাজ করতো কি না জানি না তবে এখন সে অসংখ্য বার নিজ দায়িত্বেই হাত ধুঁচ্ছে! যে ব্যক্তি কোন দিন একবেলা নামাজ পড়েনি বা কোন দিন কুরআন পড়েনি সে এখন তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ছে এবং বাংলা অর্থসহ কোরআন পাঠ করছে! সেই ছেলেটা সিগারেট খাওয়ার জন্য বৌ এর সাথে প্রতিদিন ঝগড়া করত সেই ছেলেটাও এখন আর সিগারেট খায় না! চাকরির অজুহাতে যে ছেলেটা সংসারের কোন কাজে হাত দিত না সে এখন বৌ, মা ও বোনের সাথে সকল কাজে সাহায্য করছে! যে সকল মেয়েরা কোনদিন রান্না ঘরে যেতে চাইত না তারাও এখন মজার মজার রান্না করে ফেইসবুক গরম করছে! এরকম আরো অনেকে পরিবর্তন হয়েছে । সেগুলো আসলে আগে আমার চিন্তা করিনি বা করার প্রয়োজন মনে করি নি!
এছাড়া সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে হয়ত চাকুরিজীবী বাবা মাদের সন্তানেরা কারণ তারা তাদের বাবা, মাকে কখনো একসাথে পেতো না কিন্তু এখন তারা তাদের সন্তানের কাছে থাকছে, খেলছে, খাওয়াচ্ছে, পড়াচ্ছে এতেই খুশি, শিশুদের একটু  দুঃখ, শুধু ঘুরতে যেতে পারছে না তারা!

আবার কিছু কিছু ছেলে মেয়েদের মধ্যে অনেক ক্রিয়েটিভিটি আছে যা সময় সুযোগের জন্য আগে করতে পারে নি! যেমন গান শিখা, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, হাতের কাজ করা, গল্প লেখা, বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা ইত্যাদি হয়ত এসময়টা না পেলে এগুলো অজানাই থেকে যেত!!!

পাড়ার সবচেয়ে বখাটে ছেলেটাও আজ সবচেয়ে বেশি সচেতন হয়ে গেল । কেউ বের হলে বলছে বাসায় থাকেন, কেউ কোন সমস্যায় পড়লে সবার আগে এগিয়ে আসছে, সাহায্য করছে! এমন করে সারাদেশে কিছু সেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি হয়েছে যারা করোনা রোগীর দাফন থেকে শুরু করে সকল ধরনের সহায়তা করছে! হসপিটালে ভর্তি করা, অসহায়দের বাড়ি খাবার পৌঁছে দেওয়া, জরুরী ঔষধ সরবরাহ করা ইত্যাদি অনেক সামাজিক কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত! হয়ত এগুলো মানুষ আগেও করত কিন্তু এখন যেমন জেনে বুঝে ইচ্ছা করে করছে হয়ত সেভাবে করত না! এটাও বলা যায় এখন প্রয়োজন হচ্ছে তাই মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে আসছে!

অন্য দিকে এই লকডাউন এর ফলে কর্মহীন হয়ে পরেছে হাজার মানুষ! না খেয়ে মরছে লক্ষ মানুষ! বাংলাদেশের ৮০% লোক নিম্ন ও মধ্য আয়ের লোক যাদের কোন সঞ্চয় নেই! দিন আনে টাইপের; তারা এখন বেচেঁ থাকার জন্য জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে! সরকার লকডাউন ঘোষনা দেওয়ার পরও আমরা বলছি জনগণ মানছে না! এটা সত্যি একটা শ্রেণির পক্ষে মানা সম্ভব হচ্ছে না! আর আরেকটা শ্রেণি শখের ঠেলায় ঘুরতে বের হচ্ছে!!!! যার ঘরে ছেলে মেয়েসহ পরিবারের সবাই না খেয়ে মরছে তার পক্ষে এই লকডাউন অর্থহীন ছাড়া কিছুই না! কিছু দিন আগে আমরা দেখেছি সব গার্মেন্টস কর্মীরা একযোগে ঢাকায় আসছে এদের যখন বলা হলো গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হবে এবং এরা জানে কাজ না করলে বেতন পাবে না । তাই পেটের দায়ে সবাই ছোটাছুটি করে চলে এসেছে কেউ হেঁটে, কেউ ভ্যানে করে, এখানে কোন আইনই কার্যকর হয়নি! কথায় বলেনা “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় “! এরাতো একেবারে নিম্ন আয়ের লোক কিন্তু এদের ছাড়াও আমাদের শিক্ষিত সমাজে যারা মুটামুটি অবস্থানে আছেন তাদের অবস্থাও খুব খারাপ । তারা না পারছে কইতে না পারছে সইতে! যেমন কিল্ডার গার্ডেন স্কুলের শিক্ষক ও পরিচালকরা! আমি যদি শুধু আমার থানার কথা বলি এখানে এমপিও ভুক্ত স্কুল আছে ৩৮ টা যারা সরকারি বেতন পায় আর কিল্ডার গার্ডেন স্কুলে আছে প্রায় ৩০০ যারা শুধু প্রতিষ্ঠানের আয়ে চলে, যদি প্রতিটা স্কুলে গড়ে ১৫/২০ জন করে শিক্ষক থাকে তাহলেও ৪/৫ হাজার শিক্ষক আছেন যাদের বেশিরভাগ বেতন পাচ্ছেন না! তাদের কষ্টের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! এটাতো আমি একটা পেশার কথা বললাম এমন হাজার পেশার লোক কর্মহীন হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছে!

আমাদের করনীয় – আমি জানি আমাদের পক্ষে সারাদেশে এই কঠিন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না কিন্তু আমার তো আমাদের দায়িত্বটুকু পালন করতে পারি যেমন আপনার বাসার ছোটে ভোয়া কাজ করছেনা গত দুমাস চলেন তার বেতনটা দিয়ে দেই, আপনার বাচ্চাকে যে শিক্ষক বা হুজুর আরবি বা বাংলা পড়াতেন তাকে বিকাশ করে বেতনটা পৌঁছে দেই, আপনার ড্রাইভার, দারোয়ান, আপনার অফিসের স্টাফ, আপনার প্রতিবেশি, আপনার নিকট আত্মীয় যাদের কষ্ট হচ্ছে বলে আপনি জানেন বাড়িয়ে দিতে পারেন আপনার সাহায্যর হাত শুধু ওদের জন্য । যে টাকায় প্রতিবছর ঈদের কেনাকাটা করতেন এবার না হয় এটা ওদের দিলেন! টাকা-পয়সা, চাল-ডাল, কাপড়-চোপড় যাকে যেভাবে পারেন একটু সাহায্য করেন! মহামারী একদিন শেষ হবে ইনশাআল্লাহ কিন্তু বেচেঁ রবে আপনার মানবতা! এরা যতদিন বেচেঁ থাকবে আপনার মানবতাকে স্বরণ রাখবে! সারাদিন আমরা অনেক সমালোচনা করি, সরকার এটা করেনি ওটা করতে পারত, রোমানা হক এতো জনপ্রিয় তবুও কেন এটা করল? ড. ফ্লোরা কেন প্রতিদিন শাড়ি change করে ইত্যাদি ইত্যাদি । হ্যাঁ যত পারেন সমালোচনা করার করেন কোন সমস্যা নেই । আপনার বাক স্বাধীনতা আছে তাই করতেই পারেন! তাই আমি বলি কি দিনে একবার নিজের সমালোচনা করবেন অন্তত পাঁচ মিনিট, শুধু আপনি কি করেছেন? আশাকরি উত্তরটা পেয়ে যাবেন! আমরা শুধু সরকারকে দায়ী করি সরকার কি করছে? আরে ভাই সরকার তো একজন আমরা তো হাজারজন! সরকার তার সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব দিবেন জনতার কাছে কিন্তু আপনার আমার দায়িত্বের হিসাব দিবেন কার কাছে? ফেইসবুকে একটা কথা দেখে হৃদয়ে দাগ কেটেছে , “”আপনি মারা গেলে সরকারের কাছে একটা সংখ্যা মাত্র আর আপনার পরিবারের কাছে আপনিই পৃথিবী “হ্যাঁ আপনি যতবড় ছেলিব্রেটিই হন না কেন আপনার মৃত্যুতে সরকার শোকবার্তা প্রকাশ করবে মাত্র, আর আপনার পরিবারের পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যাবে! সরকারের তাতে কতটুকু ক্ষতি হবে জানি না কিন্তু আপনার পরিবার আর আলোর মুখ দেখবে না! তাই আসুন সবাই মিলে সংখ্যা নয় পৃথিবী বাচাঁই!!! নিজে বাঁচি!

লেখকঃ কলামিস্ট এবং থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার

আরও পড়ুন