শাশুড়ির বিষোদগার না করলে আপনার লাভ যেভাবে

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

শাশুড়ির বিষোদগার করতে পারলেই আজকাল সুশীল হওয়া সহজ বিভিন্ন বয়সী নারীদের জন্য।শাশুড়ি ফিগারটাকে ভয়ংকর একটা দস্যি, অমানবিক, হিংস্র চরিত্রে রুপান্তর করাই এসব সুশীল মহিলাদের কাজ। যাদের শাশুড়ি নিয়ে এত সমস্যা, তারা এতিমখানা থেকে ছেলে খুঁজে নেয় না কেন??

একশ্রেণীর নারীরা শাশুড়িকে শত্রু হিসেবে নিবে, কিন্ত নিজের মাকে তার সংসারে অবাধ হস্তক্ষেপ ও কূটবুদ্ধি দিয়ে একটা সুখের সংসারকে নরকে রুপান্তর করবেন।

কারো সংসারে ছেলের বউ হয়ে আসার আগ অব্দি সেই সংসারের কেন্দ্রে থাকা শাশুড়ি নামক নারীটির সেই সংসারে শ্রম, আত্মত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রামের মূল্যায়ন আজকের দিনের মেয়েরা করতে জানে না।

আপনি যখন একজন প্রতিষ্ঠিত ছেলেকে বিয়ে করেই নিজের ভবিষ্যত ভাবনায় অস্থির হয়ে আলাদা সংসার পাততে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যান, তখন কখনো হৃদয় দিয়ে ভেবেছেন কি সেই নারীটির কথা যিনি আপনার জন্য এই প্রতিষ্ঠিত বরকে উপহার দিতে কত রাত নির্ঘুম থেকেছেন? কত যাতনা সয়েছেন। নিজের মায়ের দেওয়া সোনার বালা জোড়া বিক্রি করে ছেলেকে দিয়েছেন। ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মা স্বপ্নের পিছু ছুটেছেন নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে।

সেই স্বামীকে নিয়ে আপনার আজ অনেক গর্ব, বান্ধবী ও আত্মীয় মহলে আপনার মুখ উজ্জ্বল, তাকে যিনি গড়ে তুলেছেন নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে, সেই নারীকে শত্রু ভাবতে, সেই নারীকে অপাংক্তেয় ভাবতে লজ্জা অনুভব হয় না আপনার?আপনার মাও আপনাকে আদর করে বড় করেছেন।আপনার জন্যও একি ত্যাগ আপনার মাও করেছেন। তবে বিয়ের পর কেন একজনকে নিয়ে এত বিষেদগার?

মানছি কিছু শাশুড়ির দোষ আছে, তাই বলে তাদের প্রতিনিয়ত হেয় জ্ঞান করে আপনি নিজেকে কতটুকুন মর্যাদার আসনে অসীন করছেন? মানলাম তিনি আপনাকে মেয়ে ভাবতে পারেননি, কিন্ত আপনি কি সত্যি তাকে মা ভেবে নিয়েছিলেন কখনো?

আপনি মায়া পাননি শাশুড়ির ধরে নিলাম কিন্ত আপনি নিজে কখনো মায়া করেছেন শাশুড়িকে??আপনি যেই সংসারে বউ হয়ে এলেন, সেই সংসারটাকে নিজের আপন সংসার ভেবেছেন আপনি? সেখানের দেবর ননদকে ভাই বোন হিসেবে স্নেহ দিয়েছেন কখনো? কখনো আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, একটা পরিবারের অন্য মানুষগুলোর প্রতি আপনার কোন দায় ছিলো কি না?

শাশুড়িদের অনেক ভুল ত্রুটি আছে। তাই বলে তাদের কি শাস্তি দিতে চান আপনারা? তাদের ভাসান চরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন না? আজ আপনি শাশুড়িকে অবজ্ঞা করে হেয় করছেন, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, উপহাস করছেন, এই অযাচিত আচরণ ভোগ করবেন কিন্ত আপনার মা তা ভুলে যাবেন না।ভালবাসা দিলে ভালবাসা ফিরে আসে। মায়া ও সম্মান দিলে তা অপ্রত্যাশিতভাবে ভিন্ন উপায়ে ফিরে আসবেই।

আপনি শাশুড়িকে সম্মান করলে যে আপনার নিজ মাও সম্মানিত হয়ে যান এই বোধ জাগবে কখন আপনার? এসব ঠেলাঠেলি বাদ দিন। আপনি যেই সংসারে গেছেন, তাকে নিজের আপন ঠিকানা ভাবতে শিখুন। সবার সাথে মিলেমিশে একটা Empathetic family গড়ে তুলতে আন্তরিক হউন।

আপনি অন্যায় না করলে দেখবেন  শাশুড়ি ভুল আচরণ করলে সেই পরিবারে বিবেকবান সদস্যরা উনার পক্ষ নিবেন না। বরং আপনার পক্ষেই কথা বলবে ।

আমি আমার এক বন্ধুকে জানি। সে ডিভোর্সী কিন্ত আজও তার ননদদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।অনেক শাশুড়িরা বউকে যেমন আপন করে নেন না বা সবকিছুতে বউ এর দোষ ধরেন, তেমনি অনেক অনেক শাশুড়ি বিনা কারণে ছেলের বউ এর হিংসা ও স্বার্থপরতার জন্য নীরবে অনাদর ও অসহায় অবস্থায় অশ্রু ফেলে যাচ্ছেন।

এই অবস্থা নিরসনে পুরুষদের অধিক দায়িত্বশীল হওয়া বাঞ্চণীয়।একজন পুরুষকে সচেতন থাকতে হবে তার পরিবারে যেন শাশুড়ি হস্তক্ষেপ ও প্রভাব না খাটায়, পাশাপাশি নিজ মাকেও ছেলের বউ এর প্রতি সহানুভূতিশীল হবার উৎসাহ দিতে হবে।

প্রতিটা সম্পর্কে যদি সবাই নিজ জায়গায় দায়িত্ব অনুভব করে, মিলেমিশে থাকার মানসিকতা থাকে, কিছুটা উদারতা মায়া সহানুভূতি সবাই সবার জন্য অনুভব করে, সবাই সবাইকে একটু ছাড় দেয়, তবেই সেই পরিবারে সুখের ঢেউ এসে উপচে পড়ে।

বউ শাশুড়ির এই যুদ্ধ থেমে যাক পরিবার গুলোতে।দুই পক্ষের দায়িত্ব আছে এই বোধ জাগ্রত হউক বিবেকে। শুধু শাশুড়ির বিষেদগারে কিছু লাইক কমেন্ট পেলেও জীবনের প্রকৃত সুখ ও ব্যক্তিমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়না এটা বুঝা উচিত বোনদের ।

লেখকঃ চিকিৎসক  ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন