শাশুড়ি যেন হয় মায়ের মতো বন্ধু

সাজেদা হোমায়রা

বিয়ের সাথে সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে চলে আসে শশুরবাড়ি। আমি অসংখ্য কনজুগাল লাইফে ফাটল দেখতে পেয়েছি শুধুমাত্র এই শশুরবাড়ি বা শাশুড়িকে কেন্দ্র করেই।
কখনো তুচ্ছ কোনো কারণে খিটিমিটি লেগে যায় বউ-শাশুড়ি সম্পর্কের মধ্যে। অশান্তির এক ঢেউ ওঠে। তৈরি হয় বিচ্ছেদের মতো কঠিন পরিস্থিতি!
অথবা তৈরি হয় এমন এক অবস্থা… শ্বাশুড়িকে চলে যেতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে!
ব্যাপারটি কিছুতেই সুখকর নয়।
বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক সবসময়ই কেমন যেন এক ধরনের জটিলতার মধ্য দিয়ে যায়। আর এর মূল কারণ হলো একে অপরের প্রতি সম্মান না থাকা। শ্বাশুড়ির প্রতি বউয়ের সম্মান থাকা উচিত ঠিক তেমন, যেমনটি থাকে তার নিজের মায়ের প্রতি।
শাশুড়িকে কখনোই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ মনে করা উচিত না। সব কাজে শাশুড়িকে প্রাধান্য দেয়া ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে তার অনুমতি নেয়া…এ ব্যাপারগুলো তাদের সম্পর্ককে সুন্দর করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে শাশুড়িরও উচিত বউকে নিজের মেয়ের মতো করেই আদর করা। কারণ মেয়েটি তার সব প্রিয় মানুষদের ছেড়েই তো এখানে এসেছে।

আজ যে মেয়েটি বউ হয়ে অন্যের ঘরে গেল, একটা সময় সেই মেয়েটিই আবার নিজের সন্তানকে বিয়ে দিয়ে শ্বাশুড়ি হন। ছেলে বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ আনেন।
সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়ানো একই মানুষটি যেন দুটি আলাদা সত্ত্বা। বউ হয়ে যে মেয়েটি শ্বাশুড়িকে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন, শাশুড়ি হয়ে সেই মেয়েটিই ছেলের বউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতে শুরু করেন।
ছেলের বউয়ের আগমনে শাশুড়িরা কখনো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন, সর্বাত্নক চেষ্টা করেন সংসারে একক কর্তৃত্ব স্থাপনের আবার কখনোবা মানসিকভাবে খুব নির্যাতিত কিংবা খুব অবহেলিত হয়ে পড়েন।
অবশ্যই এ দুই অবস্থার কোনটিই কাম্য নয়।
আবার অনেক শাশুড়িরা মনে করেন, বিয়ের পর তার ছেলে পর হয়ে গেছে। ছেলের ওপর তার আর একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। যে ছেলে সব সময় মাকে প্রাধান্য দিত এখন সে স্ত্রীকে প্রাধান্য দেয়। এটা অনেক মা-ই মানতে পারেন না। অপরদিকে বিয়ের পর মেয়েরা চায় তার হাজবেন্ড তার দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিক। ফলে শুরু হয় একটা মানসিক দ্বন্দ্ব!
তবে হ্যা, বউ-শাশুড়ির সব সম্পর্কই যে এমন দ্বন্দ্বময়, এটাও ঠিক নয়। অনেক পরিবারেই এ দুটি মানুষ এমন আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ থাকে যা অন্য যে কোনো সম্পর্ককে হার মানায়!

অনেক ক্ষেত্রেই বাবা মায়েরা যখন সন্তানদের বিয়ে দেন, তখন জেনারেশন গ্যাপটা বুঝতে চান না। তাদেরকে বুঝতে হবে, তাদের সময়টা এক রকম ছিলো। এখনকার সময়টা অনেক বদলেছে।
শাশুড়ি ও ছেলের বউয়ের মানসিকতা এক হবে না, এটাই স্বাভাবিক। দুজন দুজনের থেকে ভিন্ন। তাই দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে।
আবার শাশুড়ি বউকে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দিলেও আশা করেন যে এ কাজটি আমি যেভাবে করি, তাকেও
সেভাবেই করতে হবে। বউটি যখন সে কাজটি তার নিজের স্টাইলে করে, তখনও শ্বাশুড়ির সাথে একটা সমস্যা সৃষ্টি হয়। একজনের কাজের স্টাইলের সাথে আরেকজনের কাজ ১০০% মিলবে, তা কিন্তু কখনোই সম্ভব না।
অনেক শাশুড়ি চায় তার নাতি নাতনীদের ঠিক সেভাবে লালন পালন করা হোক যেভাবে তাদের সময়ে করা হয়েছে। একটা ব্যাপার হচ্ছে, তাদের সময়ের সবকিছুই যে এ সময়েও কার্যকর হবে, তাও কিন্তু না। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে নিয়ম কানুনেও পরিবর্তন এসেছে। তাই বর্তমান যুগের মায়েরা চায়, তাদের সন্তানদের আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে লালন পালন করতে। তবে অবশ্যই, যেটা ভালো সে ব্যাপারে শাশুড়িরা তাদের বউদের পরামর্শ দেবেন, শিখিয়ে নেবেন এটাই কাম্য।
পরিবার টিকে থাকে সমঝোতার ওপর।
যখন কোনো বাবা মা নিজের মেয়েকে বিয়ে দেন তখন তারা আশা করেন, আমার মেয়েটা তার শ্বশুর বাড়িতে সম্মানিত হোক। তারা আমার মেয়েকে নিজেদের মেয়ের মতো করে দেখুক।
তার ঘরে যখন অন্য একটা মেয়ে আসে তখনও তাকে বুঝতে হবে, আমার মেয়ের মাঝে যেমন ভুল আছে, সীমাবদ্ধতা আছে তেমনি আমার বাসায় যে মেয়েটি এসেছে তারও ভুল থাকবে, সীমাবদ্ধতা থাকবে।
আমি আমার মেয়ের ভুল যেভাবে একোমোডেট করি, আমার ছেলের বউয়েরটাও করবো।
আবার অনেক ক্ষেত্রে, মেয়ের বাবা মা অতিরিক্ত অনধিকার চর্চা করেন বা গ্রুপিং করেন যা মেয়ের সংসারে অশান্তির কারণ হয়।
ভুলকে ভুল হিসেবেই মেনে নেয়ার মানসিকতা সবার মধ্যেই থাকা উচিত। যেটা ভুল সেটা ভুলই, সেই ভুলটা মেয়ে বা ছেলে যেই করুক না কেন। প্রত্যেক বাবা-মার উচিত তার সন্তানদের অন্যায় বা ভুলকে প্রশ্রয় না দেয়া। অন্যায় করার পরও তাদের পক্ষ নিয়ে কথা না বলা।
হাজবেন্ড যদি কিছু সময় তার মা বা পরিবারের সাথে কাটাতে চায় ওয়াইফদের উচিত এতে সাপোর্ট করা। মেয়েটাকে বুঝতে হবে, তার হাজবেন্ডের জীবনে অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তার মা। মা তাকে লালনপালন করে বড় করেছেন। মা হিসেবে তিনি তার ছেলের কাছে কিছু আশা করতেই পারেন, কিছু দাবী করতেই পারেন। আর তাই বউদের উচিত তাদের হাজবেন্ডদের উৎসাহিত করা যেন তারা তাদের বাবা মাকে ভালোবাসে এবং তাদের প্রতি দায়িত্বগুলো পালন করে।
আবার হাজবেন্ডেরও উচিত তার ওয়াইফকে সুযোগ করে দেয়া যেন সে তার বাবা-মা, ভাই-বোনদের সাথে কথা বলতে পারে, দেখা করতে পারে।
একটু সহমর্মী হয়ে মেনে নিতে শিখলে অনেক জটিল মুহূর্তও সরল হয়ে উঠতে পারে।
বাবা-মা এবং শশুর-শাশুড়িকে রেসপেক্ট করাটা খুব জরুরি। হাজবেন্ড ওয়াইফ উভয়ে শশুর শাশুড়ি কে বাবা মা হিসেবে ভালবাসলে পৃথিবীতে আর কোনো বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠবে না…

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং পি এইচ ডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন