সন্তান হিসেবে মা এর দায়িত্ব আপনারই,আপনার স্ত্রীর নয়

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ
…………………………………………………….

আজকের একটা ঘটনা আমাকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করলো।
পুরো বিকালটা মন খারাপ করে দিলো।

একজন বৃদ্ধা মা কে নিয়ে উনার একমাত্র ছেলের বউ চেম্বারে আসলেন।
ছেলের বউ এর কোলে উনার দুই বছর বয়সী শিশু সন্তান।

বৃদ্ধাকে দেখলাম।
উনার দুই হাতের জয়েন্টগুলো সহ অনেক জয়েন্টে খুব ব্যাথা।
জয়েন্ট গুলো প্রায়শই ফুলে যায় ব্যাথায়।

ক্লিনিক্যালি রোগীটা রিউমাটয়েড আর্থাইটিস এর।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করার জন্য রোগীর কিছু টেস্ট দরকার।

আমি পরামর্শ দিলাম।

কিন্ত ছেলের বউ এর সময়ের বড় অভাব।
তিনি এখন টেস্ট করতে পারবেন না কারণ তার বাচ্চা গরমে কষ্ট পাবে টেস্ট করতে সময় লাগবে তাই।
এক ঘন্টা সময় উনার নেই।

বৃদ্ধা টেস্ট না করে মেডিসিন খাবেন না সাফ বলে দিলেন।
তিনি কষ্ট পাচ্ছেন অনেক দিন ধরে এবং অনেক মেডিসিন খেয়েছেন বিভিন্ন ফার্মেসীর ডাক্তারদের কাছ থেকে কিন্ত উনার আরাম নাই।

আমি চুপচাপ শুনছি বউ শাশুড়ির আলাপ।
অসহায় ভাবে শাশুড়ি তাকাচ্ছিলেন বউ এর দিকে।
চোখে মুখে মিনতির ভাব।

কিন্ত ছেলের বউ আমাকে নাখোশ ভাব নিয়ে বললেন, টেস্ট না করে পারলে চিকিৎসা দেন,আমার তাড়া আছে।

তারপর তারা পরে আসবেন বলে চলে গেলেন।

আমি ভাবছি শিশু সন্তানটির কথা।
বৃদ্ধার ছেলেটিও এমন ছিলো একদিন।
তিনিও বড় মায়া করেই তার সন্তানকে পালন করেছেন।

স্বামীহীন একমাত্র পুত্রের সংসারে তিনি আজ অন্যের মুখাপেক্ষী।

আহা মানব জীবন।
মায়ার সংসার গড়ে আজ তিনি বাস্তবিকভাবে অপাংক্তেয়।

আমাদের দেশের অনেক মানুষ বিদেশে থাকেন।
তাদের অনেকের সংসারের দায়িত্ব স্ত্রীর হাতে থাকে।
অনেক নারীকে আমি দেখেছি বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়িকে পরম যত্নে আগলে রাখেন।

আবার অযত্ন ও অবহেলার চিত্র দেখি যা মন ভারাক্রান্ত করে দেয়।

এই নারী একদিন বৃদ্ধ হবেন।
তার কোলের শিশুটি একদিন বড় হয়ে ঘরে বউ নিয়ে আসবে।

সেদিন যদি তিনি তার ছেলের বউ দ্বারা অবহেলিত হন,তবে উনার কেমন লাগবে সেই অনুভূতি জানার তীব্র ইচ্ছা থাকলো।

অনেকেই অনেক কথা বলবেন জানি।
শাশুড়ির সেবা করা ছেলের বউ এর দায়িত্ব নয় তাও বলবেন এবং আমি তা মানি।

বাস্তবতার নিরিখে যেসব পুরুষরা বিদেশে থাকেন, তারা  নতুন করে বৃদ্ধ মা বাবার সেবা যত্ন ও চিকিৎসা নিয়ে ভাবা উচিত।

আপনারা নিজেরা যখন সরাসরি মা বাবার সেবা করতে পারছেন না,তখন বিকল্প সহজ উপায় নিয়ে ভাবুন।

আপনার মা বাবা অযত্ন ও অবহেলা পেলে তার দায় আপনাদের।
আল্লাহ এর কাছে জবাবদিহি করতে হবে সন্তান হিসেবে আপনাদেরকেই।

আমার মা বাবার পূর্ণ যত্ন আমি নেই।
তাদের সব খেয়াল আমি রাখি।
তাদের কাজে  হেল্প করার জন্য লোক রেখেছি যেহেতু আমি নিজে তাদের কাজে হেল্প করতে পারছিনা।
কিন্ত আমি সব বিষয়ে যথাযথ খেয়াল রাখি।
আমার মা বাবা যেন সম্মানে আদরে যত্নে থাকেন।

আরেকটা বিষয় এর দিকেও আমাদের পুরুষদের নজর রাখা উচিত।
তা হলো স্ত্রীর বাবা মায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
যেসব নারীদের ভাই নেই, তাদের স্বামীদের বিশেষ করে স্ত্রীর মা বাবার প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া আবশ্যক।
কারণ সেসব মা বাবা তাদের মেয়েদের যত্ন করেই বড় করে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে একা হয়ে পড়েন।

ভালো থাকুক সকল বৃদ্ধ মা বাবা।
ভুলে যাবেন না মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত।

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ কবি, সাহিত্যিক ও চিকিৎসক। 

আরও পড়ুন