(স্বদেশ কাহিনি ) বাংলাদেশে জাপানি

অশির আহমেদ

আমার জাপানি বন্ধু কানো সানকে বেশ কয়েকবার আমাদের গ্রাম এখলাসপুরে নিয়ে গিয়েছি। ঢাকা থেকে গাড়িতে যাওয়া যায়, স্পিড বোটে যাওয়া যায়। কিন্তু সে যেতে চায় লঞ্চে। ছাদে বসতে চায়।

লঞ্চের ছাদে যা হয়- আমড়া ওয়ালা আসেন, চানাচুর ওয়ালা আসেন, দোতারা বাজিয়ে গান গেয়ে পয়সা তোলেন কিছু পল্লী গায়ক। একদল তাস খেলেন, আরেকদল শুধু তাকিয়ে থাকেন। মজার মজার কথা বলেন। লঞ্চের ছাদ মানে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির একটা অসাধারণ মঞ্চ।

ঢাকা থেকে এখলাসপুর যেতে চারটা নদী পার হতে হয়- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, পদ্মা তারপর মেঘনা। প্রত্যেকটা নদীর রং আলাদা, ঘ্রাণ আলাদা। সকালের রং একরকম, বিকালের রং অন্যরকম।

কানো সান বাংলা জানেন না, ইংরেজি জানেন না, কিন্তু মনে হয় সবার ভাষা বোঝেন। গ্রামের লোকজন অতি আগ্রহে এই জাপানিকে দেখেন আর প্রশ্ন করেন। অনুবাদ করার দায়িত্ব আমার। মানুষ চানাচুর খাওয়াতে চায়, ঝাল মুড়ি খাওয়াতে চায়। আমার দায়িত্ব হলো ভদ্রভাবে নিষেধ করা। কানো সান শুধু আমার অনুমতির অপেক্ষায় থাকেন।

আচ্ছা, ভিক্ষা চাইলে নিষেধ করার জন্য “আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করেন” বলা যায়। কিন্তু এখানে কাহিনি আলাদা।

কেউ খাওয়াতে চাইলে ভদ্রভাবে কীভাবে নিষেধ করবেন?
ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভেবেছি, নিজেকে ততই ছোট মনে হয়েছে। ভিক্ষুককে ডিল করার জন্য রেডিমেইড বাক্য থাকলে ও আত্নাওয়ালা গরীবকে ডিল করার জন্য ভাল একটি বাক্য তৈরি হয়নি।

১৯৯৮ সালের কথা। একবার কানো সানকে নিয়ে লঞ্চের ছাদে বসে এখলাসপুর যাচ্ছি। এক চানাচুর ওয়ালা ওনাকে চানাচুর দিলেন। আমি ধমক দিতে গেলাম। কানো সান আমাকে থামিয়ে দিয়ে কুড়মুড় করে চানাচুর খেয়ে ঝাল সহ্য করতে না পেরে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের মত হু হা ফু ফা করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পরেই এক ব্যাক্তি আনারস নিয়ে উঠলেন। ছোট ছোট আনারস কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে রস বেরিয়ে পড়ছে। কানো সান ও তার মুখের রস আটকাতে পারলেন না। আনারস ওয়ালা আসলে বিক্রেতা না, তার বাড়ির কোন অসুস্থ রোগীর জন্য হয়তো আনারস নিয়ে যাচ্ছেন। ওনারা দুইজন চোখ চাওয়া চাওয়ি করলেন।

ভাই, আপনার দেশ?
-এখলাসপুর।

ওনার দেশ?
-জাপান ।

জাপানে আনারস পাওয়া যায়?
-জ্বি যায়।

ভাই ওনারে এক পিস আনারস খাওয়াইয়া দেই? এমন ভাবে তাকাইয়া আছে, মনে হয় জীবনে আনারস খায় নাই।

আমি শুনে না শোনার ভান করলাম। শহরে বড় হওয়া গ্রাম সম্পর্কে ধারণা নেই এমন অশিক্ষিত লোক হলে এই কথায় অপমানিত বোধ করার কথা।

কানো সান বলে উঠলেন, আমি আনারস খাব।

আমাকে কিছু বলতে হল না। আনারস ভাই, আমড়া ওয়ালা থেকে ছুরি নিয়ে ক্যাচ ক্যাচ করে আনারস কেটে দিলেন।

কানো সান আনারস খেয়ে বললেন-
এতো রসালো আনারস আমি জীবনে খাই নাই। আরেকটা খাব।

লঞ্চের একজন বলে উঠলো- দে ভাই, ছিল্লা কাইট্টা লবণ লাগায় দে।
আনারস ভাই দ্বিগুণ উৎসাহে ছিল্লা কাইট্টা লবণ ছিটিয়ে দিলেন।

সারা লঞ্চের লোক কানো সানের আনারস খাওয়া দেখছেন।

একটা শিশু যখন নূতন কিছু মুখে দেয়, শিশুর সাথে সাথে আমরা হা করি, শিশু মুখ নাড়ালে মুখ নাড়াই। খাওয়া শেষ হলে সফলতার হাসি দেই।

কানো সানের খাওয়া শেষ হবার পর সবাই হাত তালি দিল।
একজন বিদেশীকে আনারস খাওয়ানোর পর্ব একটা আলাদা গর্ব।

আমি পকেটে হাত দিলাম। আনারসের দাম বের করবো। কানো সান থামালেন। বললেন, ওনাকে টাকা দিলে অপমানিত বোধ করতে পারেন। কানো সান ব্যাগ খুললেন, একটা নতুন টি-শার্ট বের করলেন। জাপানিতে লেখা য়ুজিন – মানে বন্ধু।

আনারস ভাই টি-শার্ট হাতে নিলেন। লঞ্চের লোকজন চিল্লাচিল্লি শুরু করলেন – ঐ বেটা তোর শার্ট খুইল্লা নয়া গেঞ্জি টা পর। পইরা জাপানি ভাইরে একটা কোলাকুলি দে।

কোলাকুলি পর্ব শেষ হলো। আনারস ভাই আমাদের আগের স্টেশনে নেমে গেলেন। নেমে গিয়ে ও লঞ্চ ঘাটে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কানো সান তাকিয়ে আছেন জাপানি লেখা টি-শার্ট পরা তার নতুন বন্ধুটির দিকে। আমি বললাম, একটু ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, চলো নীচে যাই। কানো সান শুনে ও না শোনার ভান করলেন, এক দৃষ্টিতে আনারস ভাই এর দিকে তাকিয়ে আছেন। আনারস ভাইকে দেখা যাচ্ছে কি যাচ্ছে না, শুধু হাত টা নড়ছে। মনে হচ্ছে লঞ্চের সাথে সাথে একটু এগিয়ে ও আসছেন।

এই দৃশ্য শুধু বাংলার গ্রামেই সম্ভব।

লেখক: জাপান প্রবাসী

আরও পড়ুন