স্মৃতির সীলমোহর

সুমাইয়া আরিফিন

শীতকালীন সকালে ঘুমঘুম চোখে শিউলি কুড়োতে উঠোনে নামতেই দেখি কুয়াশার সাদাটে ধোঁয়ায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত কণ্ঠস্বরে বললো, তুই কি এখনো বাচ্চাটি রয়ে গেলি সুমুন, অত ফুল দিয়ে করবি কি?
হতবাক আমি চেয়ে রইলাম, এত শুষ্ক গলায় কেউ কথা বলতে পারে! কে বলবে, দাদাভাই!

এমনি এক শীত সকালে ঘুম ভেঙ্গেছিল ঢেঁকিঘরের ধুপধাপ শব্দে, দাদু চাল গুড়ো করছে। মা, কাকীমায়েরা পিঠে বানানোর তোড়জোড়’এ ব্যস্ত।
ডালিয়া ফুলরঙা শীতের জামা গায়ে চেপে রান্নাঘরের সিঁড়ি টপকে বসার ঘরে এসে দেখলাম দাদাভাইয়ের হাতে ধোয়া উঠা চায়ের কাপ।
হাত চেপে বলেছিলাম, আমার অমন ঢেঁকি চাই। আমার কণ্ঠ থেকে আহ্লাদ ঝরে পরলো টিনের চালে পরা কুয়াশার শব্দের মতো।

আমার শৈশব রঙিন করেছিল আমার দাদাভাই, এই বুড়ো মানুষটি-ই আমার সবচেয়ে কাছের খেলার সঙ্গী ছিল। সময়কে সুন্দর করতে খুব বেশি মানুষ লাগেনা।

দুপুর গড়াতেই কোমড়ে গামছা বেঁধে দাদাভাই নারকেল গাছে, যেখানটায় বাবুই পাখির ঘর ঝুলে ঠিক সেখানটায়। তারপর, নারকেল গাছের ঢালের পাতা ছাড়ালো, পেট ফুটো করলো, আরো কি যেন করলো! পিড়িতে বসে হাটুতে দু’হাতের উপর থুঁতনি রেখে আমি মনযোগী হলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢেঁকি তৈরি, একদম দাদুর ঢেঁকির মতো কিংবা আরো সুন্দর।
আমি তাকালাম সংসারের সেরা সুখীদের মতো করে। ঢেঁকি হাতে নিতেই মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর খেলনার মালিক এখন আমিই।
হাটুতে বাত’র ব্যথা নিয়ে কপালে ভাজ ফেলে দাদাভাই উঠে দাঁড়ালো। আমার এলোচুলে হাত দিয়ে আদর করে চলে গেল।

চলে যাওয়া মানুষেরা ঠিক কতদূর যায়! যেতে যেতে রেখে যাওয়া সকালের মিষ্টি রোদের মতো স্মৃতিরা যখন আকাশের অলি- গলিতে ছড়িয়ে পরে, তখন দুঃখগুলো শৈত্যপ্রবাহ’র মতো আসে, কেন আসে! আমরা চেয়ে থাকি, কান পেতে শুনি কেউ ডাকছেনা তো!

সাতসকালে রেডিওতে ত্রিপিটক পাঠ ভেসে আসে, ঠিক যেমন করে ভেসে আসে আজানের বাক্য “আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাওম” আরবী তখনো পড়তে জানতাম না। মা বুঝিয়ে দিত, ‘ঘুম হতে নামাজ উত্তম।’
-ফজর পড়েছিলি?
-উম।
-নামাজ যেন কখনো ছুটে না যায়, মৃত্যুর পর শুধু দোয়ার দুয়ার খোলা থাকে। দাদাভাই না থাকলে দোয়া করবিতো?
আমি অবুঝ ভঙ্গিমায় তাকিয়ে থাকতাম, না থাকা কি হয়! দাদাভাই থাকবেনা কেন! মানুষটা না থাকলে আমায় মাটির হাড়ি বানিয়ে দিবে কে?

আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, চক্ষু দু’টো খেয়োনা…

সন্ধ্যা গড়াতেই রেডিও শুনতে বসতো দাদাভাই, রাজনৈতিক খবরাখবর, ছায়াছবি’র গান, কৌতুক, এত কিছু! ছোট্ট এটুকু জিনিস থেকে এত কথা কীভাবে আসে! কোথা থেকে আসে!

আমরা কাল রেডিও বানাবো- বলেই দাদাভাই হাসলো। যেই হাসিতে গলে যাবে নারী, যেই স্নেহে নত হবে পশু। আমার চোখেমুখে জোনাকি খেলে গেল, ঘুম হারালো সকালের ট্রেনে, এপাশ থেকে ওপাশ, রাত এত দীর্ঘ হয়! সম্ভবত সেই রাত ছিল আমার জীবনে প্রথম নির্ঘুম রাত। একটা সকাল সূর্যের মতো সত্য, আর সূর্য সত্য রাতের সামঞ্জস্যতায়।

মাটির উপর পানি ঢেলে দাদাভাই কারুকার্যে মগ্ন হলো,
মাটির বল, একটু চ্যাপ্টা, একটু এমন- কেমন। রেডিও হয়ে গেলো! এখানটায় ভলিউম চিহ্ন, এখানটায় চ্যানেল চেঞ্জ আরো কতো কি! সূর্যতাপ তীক্ষ্ণ হলো, পশ্চিমের রোদের কোলে নরম রেডিও রেখে গায়ে আকাশরঙা পাঞ্জাবি পরে দাদাভাই চলে যাচ্ছে।
-কই যাও?
-রেডিও শুকিয়ে গেলে রঙ করতে হবেতো, রঙ নিয়ে আসি।

আমি অপেক্ষায় থাকি, অপেক্ষা পৃথিবীর সবচেয়ে ধীর সময়, বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার হয়ে যায়। ঘড়ির কাটা কোথায়! আমাদের তখন ঘড়ি ছিলনা। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সেদিন প্রথম আমার মন খারাপ হলো। ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম একরাশ অভিমান নিয়ে। সেদিন কীসের অভিমান ছিল! ঘড়ি ছিলনা বলে! নাকি কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের?

প্রতিশ্রুতি তো সবাই ভাঙ্গে, আমিও কি ভাঙ্গিনি কখনো! যে মানুষটা আমার শৈশবকে দিয়েছিল সেরা সৃজনশীলতা, গড়েছিল কাচা মৃত্তিকার মতো করে এপিঠ- ওপিঠ। শেষবার হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতেই শুধিয়েছিল,
-তুই আসবিতো?
-এইতো সপ্তাহখানি, তারপর।

ঠিক তখনি রবী ঠাকুর এলেন, অর্জুন গাছে হেলান দিয়ে বললেন,
-“মানুষ পণ করে পণ ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া হাঁফ ছাড়িবার জন্য।”
-না না, অমনটা হবেনা। যাবো, ঠিক যাবো।
সেই প্রথম নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছে অচেনা ঠেকলো। বুঝেছিলাম, একেকটা আশ্বাসের পিছনেই লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম হঠকারিতা। যা ভেবে রাখি তার বিপরীতটুকুও যে হতে পারে তা বোধহয় ভাবতেও নারাজ আমরা।

প্রভাতকিরণ ছড়িয়ে পরে, লাউয়েরডগা থেকে কুয়াশা পিছলে পরে মৃত্তিকার নাভিতে। রোগাটে নিস্তেজ কণ্ঠস্বরের মালিক নেই, তবুও শব্দ আমার কানে বাজে।
দাদাভাই চলে যায়, কোথায় যায়! দূরে, দূরে, এত দূরে….. আমার চশমাটাও ব্যর্থতা স্বীকার করে।

জানলেনা! তুমি আমার জীবন পৃষ্ঠার সেই গাঢ় সীলমোহর দাদাভাই, কাগজ মলিন হতে হতেই যে কালি আরো কালচে হয়।

 

আরও পড়ুন