তুমি যেদিন বাবা হবে

মনসুর আলম

মা/বাবা নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই ভয় পাই – স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা যাদের বদান্যতার বর্নণা দিয়েছেন সেখানে আমার মতো তুচ্ছ একজন মানুষ মা/বাবা নিয়ে কী লিখবো? মাতাপিতার চরিত্র (সামাজিক চরিত্র নয়, প্যারেন্টাল কারেক্টারিস্টিক) বিশ্লেষণ করার মতো জ্ঞান কোনো মানুষের নেই ; সেটি কেবল বিধাতার এখতিয়ার। তাঁদের চরিত্র ফুটিয়ে তোলার মতো ভাষাজ্ঞান আমার নেই, তবে দুটি জেনারেশনের সম্পর্কের একটি রসায়ন রয়েছে ; আমরা সন্তানরা রিয়াক্টর। আমাদের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে তাদের জীবনের চিত্রায়ণ। এটি এমন একটি ক্যানভাস যার কোনো পরিসীমা নেই, নেই কোনো সমাপ্তি। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে সেই ক্যানভাসে রঙ চড়ানোর সুযোগ রয়েছে, আমরা করিও তাই। কারো তুলির আঁচড়ে রচিত হয় মহাকাব্য আবার কারো কারো তুলির টান এলোমেলো হয়ে পুরো ক্যানভাস বিনষ্ট হয়ে যায়।

আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা গ্রামে ; এমন একটি গ্রাম, যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রামের কোনো তালিকা তৈরী করা হয় তাহ‌লে আমার গ্রামটি সেরা দশে থাকবে অনায়াসে। বাড়ির সামনে পেছনে দুদিকে পুকুর, ডানে বামে সীমানা শেষে একটু খালি জায়গা তারপর প্রতিবেশীদের বাড়ি ; এভাবেই লম্বা হয়ে সরল রেখার মতো এগিয়ে গেছে একটি পাড়া। পুকুরগুলি বর্ষাকালে পানির নীচে ডুবে যেতো, কার্তিক থেকে বৈশাখ শুকনো মৌসুম। নানাজাতের মাছে ভরপুর থাকতো গ্রামের সব পুকুর, খাল, বিল। নিজেদের পুকুরের মাছই ধরে শেষ করা যেতোনা যদিও গ্রামের যেকোনো পুকুর নিজের মনে করে মাছ ধরার স্বাধীনতা ছিলো আমাদের ছোটোবেলায়। বাড়ির সীমানার শেষেই খেলার মাঠ- নরম, সবুজ দূর্বা ঘাসের কার্পেট মখমলের মতো নরম চাদর বিছিয়ে স্বাগতম জানাতো বছরের ছয়টি মাস। জৈষ্ঠ্য মাস আসলেই আবার পানির নীচে। তখন সেই মাঠ হয়ে যেতো আমাদের সাঁতার কাটার জন্য বিশাল সুইমিং পুল আর পাঁচমিশালি মাছতো আছেই।

আমাদের অঞ্চলে কালচে সবুজ একধরনের একদন্ডী উদ্ভিদ পাওয়া যায় যাকে আমরা মুর্তা বলে ডাকি। এই মুর্তার বেত দিয়ে বিভিন্নধরনের শীতলপাটি এবং গৃহস্থালি আরো অনেক কুঠিরশিল্প তৈরী হয়। প্রায় মাথা সমান কিংবা সামান্য কম বেশি উঁচু হয়ে জন্মানো এই উদ্ভিদটি কোনো এক বিচিত্র কারণে প্রায় শতভাগ সোজা হয়ে জন্মায় একেবারে তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে। এতটাই ঘন হয়ে দলবেঁধে বেড়ে ওঠে একপাশ থেকে আরেকপাশ প্রায় দেখাই যায়না। আমাদের বাড়ির চতুর্দিকে এই মুর্তার একটি বেশ বড়সড় কলোনী রয়েছে যা বাউন্ডারি দেয়ালের মত পুরো বাড়িকে ঘিরে রেখেছে। এই চিত্র গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে। কোনো যত্ন আত্তি ছাড়াই বেড়ে ওঠা এই উপকারী গাছটির ধবধবে সাদা ফুল হয় যা খেতে মিষ্টি। সেই বাউন্ডারির মাঝে মাঝে আবার বড় গাছও রয়েছে যাতে করে পর্যাপ্ত ছায়া পাওয়া যায়, যেহেতু বর্ষাকালে পানির নীচে চলে যায় সেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কদম, বরুণ এধরনের গাছ থাকে যা পানিতে বাঁচতে পারে।

বাড়ির কাছেই গ্রামের সদ্য প্রতিষ্ঠিত হাই স্কুল। ধীরেসুস্থে হাঁটলে সর্বোচ্চ দশ মিনিট লাগতে পারে। পায়ে হাঁটার রাস্তা, যানবাহনের কোন ভয় নেই সুতরাং রাস্তায় কোনো বিপদ হবার আশংকাও নেই। স্কুল ছুটির পরে ডানে বামে তাকানোর কোনো অভ্যাস আমার ছিলোনা, সোজা বাড়িতে। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ির সামনে গেলেই মুর্তাগাছের দেয়ালের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে একটি নারী মুর্তি বের হয়ে এসে জড়িয়ে ধরে, স্কুল ব্যাগটি হাত থেকে কেড়ে নিয়ে হাত ধরে ঘর পর্যন্ত নিয়ে যান। আমার স্মৃতিতে এমন কোন দিন নেই যে স্কুল থেকে এসে আম্মাকে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। মাঝেমধ্যে খুবই বিরক্ত হয়ে বলতাম, “এই একটু জায়গা, কোন যানবাহন চলেনা, কীসের এত ভয় তোমার? ” প্রতিদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকো তোমার পায়ে ব্যথা করেনা। আমরাই ভাই বোন নয়জন, তারউপর যৌথ পরিবার ভাবতে পারেন কী পরিমাণ কাজ সংসারে? এত পরিশ্রমের পরও প্রতিদিন এসে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকো, “আমি বড় হয়েছি আম্মা।” মুখে বিরক্তির ভাব ফোটালেও মনে মনে ভাবি আমি যদি কোনোদিন এসে দেখি আম্মা দাঁড়িয়ে নেই তাহলে আমার চোখ আমার কথা শুনেবেতো? আমার বিরক্তি মার্কা চেহারা দেখে আম্মা মুখ কাঁচুমেচু করে বলতেন, ” এখন বুঝবেনা, বুঝবে যেদিন তোমার নিজের বাচ্চা হবে।” আম্মার এই অসহায় চেহারার দিকে তাকাতে পারতামনা, আমার নিজেরই কান্না চলে আসতো। আমরা নয় ভাইবোনের কেউই আম্মার কাছ থেকে কোনোদিন কোনো ধমক খাইনি। আব্বার বকা খেয়েছি কদাচিৎ আগে আগে পড়ার টেবিল ছেড়ে চলে গেলে। ক্লাস ফাইভ থেকে সংসারের যাবতীয় বাজার খরচ আব্বা আমার উপর ছেড়ে দেন। জীবনে কোনোদিন হিসাব নেননি। স্কুলের হেডমাস্টার কিন্তু, বাড়িতে আসলেই আমাদেরকে নিয়ে আড্ডার আসর বসাতেন।

আম্মার সেই কথার মর্ম অনুধাবন করার জন্য আমার নিজের বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি – তার আগেই বিধাতা আমাকে থাপ্পড় দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন আম্মা এমনটি কেন করতেন। বড় ভাই হয়েই পিতৃত্বের স্বাদ পেয়েছি। প্রথমে আমি, আমার বোনকে নিয়ে শহরে চলে আসলাম কলেজে ভর্তি হবার জন্য। ভাই বোন একেকজন মেট্রিক পাশ করে, একটা একটা করে যোগ হয় আমাদের সংসারে। ভাই – বোনের সংসার কোন মুরুব্বী নেই সাথে, নিজেরাই রান্না করি, গোল হয়ে মেঝেতে বসে খাই। আমি যখন মাস্টার্সের ছাত্র, বিকেলে ভাই / বোন সবগুলো বাসায় আসার আগ পর্যন্ত আমার গলা শুকিয়ে থাকে, আমি স্থির হয়ে বসতে পারিনা। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার অনেক দূর গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। একটা এই কলেজে, আরেকটি সেই কলেজে, আরেকটি ইউনিভার্সিটিতে এভাবে সবগুলো বাসায় না আসা পর্যন্ত আমার মনে একদণ্ড শান্তি নেই। আম্মা যেরকম মুখচোখ শুকিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন, আমিও সেরকম তাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকি। একটা করে বাসায় ঢুকে আমার হার্টবিট একটু করে নরমাল হয়। পাঁচ/ছয়টি ছেলেমেয়ে কলেজ / বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমি নিজেও ছাত্র এযে কত বড় দায়ীত্ব, কতটা দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো আমাকে সারাক্ষণ ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারবেননা।

এক দিনের একটি ছোট্ট ঘটনার উদাহরণ দেই। ছোট ভাইয়ের ইন্টারের রেজাল্টের দিন অপেক্ষা করছি কখন আসবে, কী রেজাল্ট হয়? যদি রেজাল্ট ভালো নাহয় তাহ‌লে নিজেকে অপরাধী ভাববো ; মনে হয় আমি সঠিক গাইডেন্স দিতে পারিনি, আম্মা আব্বা সাথে থাকলে হয়তো আরো ভালো সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারতেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত গভীর হয়ে যাচ্ছে তার কোন খবর নেই। আমার গলা শুকনা, বারবার পানির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছি, মুখ তেঁতো হয়ে আছে টেনশনে। পায়চারি করতে করতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে, আমার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু আমার ভাইয়ের কোনো খবর নেই। হার্ট এ্যাটাক হয় কি না সেই শংকা দেখা দিয়েছে, আমার দুশ্চিন্তা দেখে অন্যান্য ভাই / বোনগুলো চুপসে গেছে। রাতের গভীরতা আর আমার হার্টবিট সমানতালে বাড়ছে, কতযে অজানা আশংকা আসছে মনের মধ্যে? শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় এগারোটার সময় একপাল বন্ধু বান্ধব নিয়ে ভাই আমার এসেছে বাসায়। আমারতো ধরে পানি আসলো, মনে হলো মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফেরত আসলাম আর মনে মনে বলছিলাম, “আম্মা, তোমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার শাস্তি আমি হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি, আল্লাহ্ আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন। ”
– কীরে, তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

– রেজাল্ট ভালো হয়েছে তো তাই প্রিন্সিপাল স্যার ডেকে নিলেন, সব স্যারদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বন্ধুরা জোড় করে ধরে নিয়ে গেলো। চায়নিজ খাইয়ে, শপিং করে একগাদা গিফট দিলো – এই কারণে সবাই সাথে এসেছে যাতে বকা নাখাই।

– আমার তো রাগে মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছেনা। সবাই দুশ্চিন্তায় মরে যাচ্ছি, নাখেয়ে বসে আছি আর উনি গেছেন বন্ধুদের নিয়ে চায়নিজ খেতে। রেজাল্ট কী?

– বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছি, তাইতো বন্ধুরা এই কাণ্ড করলো।

সেই অনুভূতি! আহারে! কী বলবো? রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, আনন্দ সব মিলেমিশে চোখের পানি হয়ে গেছে। ওর বন্ধুরা বিদায় নিলো আর আমার বন্ধুরা আসতে শুরু করলো কনগ্রাচুলেট করতে।

যেদিন সাউথ আফ্রিকা আসি, আব্বা বললেন তোর ব্যবহার করা একটি লুঙ্গি রেখে যা, মাঝেমধ্যে ঘ্রাণ নিবো।

আমার মেয়েকে যেদিন প্রথম স্কুলে নিয়ে গেলাম, মেয়ে স্কুলে থাকবেনা; কিছুটা কান্নাকাটি করলো। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে কোনোরকম টিচারের কোলে তুলে দিয়ে আসলাম। গাড়িতে এসে বসলাম ঠিকই কিন্তু, হাত পা অবশ হয়ে গেলো – কোনভাবেই গাড়ি স্টার্ট দিতে পারছিনা। মেয়েকে স্কুলে রেখে আমি বাসায় যেতে পারছিনা। এই প্রথম আমার মেয়ে একা ঘরের বাইরে সারাদিন থাকবে – পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম গাড়ির ভেতরে সারাদিন স্কুল ছুটি হওয়ার আগ পর্যন্ত, আর মান্না দের এক গান রিপিট করে হাজারবার শুনলাম – তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে? এখনো মাঝে মাঝে মন ঠেকেনা। লাঞ্চব্রেকের সময় চলে যাই মেয়ের স্কুলে, বাউন্ডারির বাইরে গাড়িতে লুকিয়ে বসে থাকি – মেয়ে স্কুলের মাঠে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে দৌড়ায়, চুরি করে চেয়ে থাকি সেই ছোট্ট দুটি পায়ের দিকে; মুখের দিকে তাকাবার সাহস করতে পারিনা যদি দেখে ফেলে!

 

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং প্রবাসী বাংলাদেশী, সাউথ আফ্রিকা।

 

আরও পড়ুন