বেঁচে থাকতেই মানুষের মায়া দরকার

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

আজমত আলীর বয়স ৬০ এর কম হবেনা।
ভদ্রলোককে আমি চিনি ৬ বছর হলো।
উনার মা হাজী সায়রা বিবি কে নিয়ে আমার চেম্বারে আসা যাওয়া করেন ৬ বছর ধরে।
মায়ের বয়স ৯০ বছর।
মা এ্যাজমা ও হাইপারটেনশন এর রুগী।
শীতকাল আসলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়।

কিছু রুগীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক হয়ে যায়।
তারা তখন তাদের পারিবারিক সুখ দুঃখ শেয়ার করেন।
রুগী দেখায় আমার তাড়াহুড়ো কম।
আমি রুগীদের ও তাদের স্বজনদের সাথে রোগের বাইরেও তাদের যাপিত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে গল্প করতে পছন্দ করি।

আজমত আলীর বড় ভাই খুব ধনী।
উনার অনেক সম্পত্তি।। ছেলেরা সব বিদেশে থাকে।
বছর খানেক আগে বড় ভাই এর স্ত্রী মারা গেলেন।
বাড়িতে বড় জেয়াফত এর অনুষ্ঠান হলো।
বড় বড় তিনটা গরু কেটে মানুষ কে খাওয়ানো হলো।

বড় ছেলে ছিলো সায়রা বিবির খুব প্রিয়।
বড় ছেলের নাতী নাতনীদের তিনি বেশি আদর ও মায়া করতেন।

আজমত আলী বলে উঠলেন আমাকে, বাবা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে আমার ভাই স্ত্রীর জিয়াফত করলো কিন্ত মাকে একটা হাজার টাকা দিলো না।
আমি গরীব।
মায়ের চিকিৎসা করতে কত কষ্ট হয়।
তারপর ও সব মেডিসিন কিনতে গাফিলতি করিনা।

আমি দেখলাম, আজমত আলী কান্না করছেন।
উনার দুঃখের জায়গা, এলাকার মানুষকে খাওয়ালে কি হবে যে নিজের মায়েরই খবর রাখেনা।

যেই মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য নিশ্চিত কবুল হয়,যেই মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত, যেই মা ই সন্তানের জন্য বড় পীর, সেই মায়ের খবর নেয়না জীবনেও একবার, সেই মায়ের মাথায় হাত বুলায় না কখনো সে,সেই মায়ের অসুস্থতায় যে একটা টাকা দিয়ে সাহায্য করেনা কিন্ত মানুষকে জিয়াফত খাওয়ায়ে দোয়া চায়।
বড় আজিব দুনিয়া বাবা।
আজমত আলীর প্রশ্নে আমি নির্বাক।

আমি একবার এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম।

জোহরা বেগম মারা গেলেন।
উনার দাফন শেষ হলো।
দাফন এর পর দুই মেয়ে ও এক ছেলের পরিবার বসলো মিটিং এ।
বড় মেয়ের বড় নাতী ব্যবসায়ী ও টাকাওয়ালা মানুষ।
টাকার গরম চোখে মুখে।
সেই নাতী বললো,আমার নানীর জন্য দায়িত্ব আছে।
আমি দুইটা গরু দিয়ে জিয়াফত করবো।
আমি নানীর জন্য লাখ টাকা দিবো।

দায়িত্ব শব্দটা হঠাৎ আঘাত করলো ছোট মেয়ের বড় ছেলের মাথায়।
সে বলে উঠলো কি দায়িত্বের কথা বলছেন ভাই আপনি?
আজ ২০ বছর হলো নানী আমাদের কাছে।
২০ বছরে কতবার নানীকে দেখতে আসছেন,কয় টাকা দিয়ে নানীর চিকিৎসায় সাহায্য করছেন।
আপনার মা উনার খবর নিয়েছেন এই ২০ বছরে?
একদিন আপনাদের বাসায় নিয়ে সেবা করেছেন?
আপনার টাকা ছিলো, ইচ্ছে করলে দেশের বড় নামী দামী হাসপাতালে নিয়ে নানীর চিকিৎসা করাতে পারতেন।
শেষ তিন মাস আপনার মামার বাসায় আপনার নানী আপনার মামীর কাছে কতটুকুন সেবা পেলো তার খোঁজ রেখেছেন?
বেঁচে থাকতে ঈদে মানুষকে আপনারা যাকাতের কাপড় বিলাতেন কিন্ত নানীকে একটা কাপড় কখনো দিয়েছেন?
একদিন ফোন দিয়ে খবর নিয়েছেন?
এখন কি দায়িত্ব ফলাতে আসছেন??
জোহরা বেগমের ছোট মেয়ের বড় ছেলের কথায় মিটিং এ উপস্থিত সবাই চুপচাপ হয়ে গেলো।

সেই ছেলেটা বললো,যখন উনার একটু মায়া দরকার ছিলো, তখন ফিরেও তাকাননি উনার দিকে।
এখন বড় বড় গরু কেটে মানুষকে খাওয়ায়ে বুঝাতে চান আপনি নানীকে কত ভালবাসতেন?
নানা বাড়িতে গরু কেটে খাওয়ায়ে নানীর প্রতি দায়িত্ব পালন করতে আসছেন???.

আমার মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন তুললো এই কথাগুলো।

আমাদের সমাজটা ভন্ডামি ও লৌকিকতায় ভরা।
আমাদের অন্তর আলো নয়,অন্ধকার দিয়ে ভরপুর।

বেঁচে থাকতে যেই মানুষটি তার আপনজনদের কাছে অবহেলার স্বীকার হন,, মরে যাওয়ার পর উনার প্রতি দরদ দেখিয়ে লাখ টাকা খরচ করে জিয়াফত করা ভন্ডামিপূর্ণ আচরণ ছাড়া কিছুই নয়।।

আমি জীবন জিয়াফত খাওয়ানোর বিপক্ষে বলছিনা।
গরীব,মিসকিন,অসহায়,ক্ষুধার্তকে একবেলা পেটপুরে ভালো খাবার খাওয়ালে অবশ্যই সাওয়াব হবে।
নিয়তটা যেন সাওয়াব অর্জনই হয়।
কিন্ত আমাদের চারপাশে দেখা যায়,সেসব জিয়াফতে গরীবরা উপেক্ষিত, ধনীদের তোয়াজ হয় বেশি।
নিজ চোখে দেখেছি।
তবে যার জন্য জিয়াফত করা,তাকে বেঁচে থাকতে মায়া ও দরদ দেখান,মরে যাবার পর এইসব লৌকিকতায় সেই মানুষের তেমন উপকার নেই।।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং ডাক্তার 

 

 

আরও পড়ুন