যৌথ পরিবারে দাদা দাদির ভুমিকা

মোসা: নাছরিন সুলতান

আজকের দিনের শিশুরা জানেইনা যৌথ পরিবারের ভুমিকা কি? কতো মজা আছে সেখানে আমি প্রায়ই আমার সন্তানদের গল্প বলি আগের দিনের গল্প যেমন সব দাদা-দাদি তার নাতি নাতনিদের সাথে কি করে থাকেন! আমি একদিন আমার বাচ্চাদের বললাম আজ আমি তোমাদেরকে আমাদের ছোট্ট বেলার গল্প শুনাব! কেমন ছিল আমাদের ছোট্ট বেলা !

এরা মনোযোগী স্রোতা হয়ে গেল! আমি শুরু করলাম আমাদের গ্রামে কোন কারেন্ট ছিল না, রাস্তা ছিল না, আমরা হারিকেনের আলো দিয়ে পড়াশোনা করতাম, হেটে হেটে স্কুলে যেতাম! পুকুরে মাছ ধরতাম,সাঁতার কাটতাম, মাঠে খেলা করতাম! আর আমরা ছিলাম অনেক ভাইবোন ; আমরা ৫ বোন দুই ভাই, আর আমার চাচাতো ৬ ভাই ও ৩ বোন মোট ৮ ভাই ও ৮ বোন! এতো ভাইবোন ছিল তোমাদের মা? তাহলে তো তোমরা অনেক কম মজা খেতে পারতে, সবাই ভাগ করে নিয়ে নিতো, আমার ছেলের প্রশ্ন ? হে যেটা নিত কিন্তু আমাদের এই অল্প হওয়াতেও অনেক আনন্দ ছিল! আমার দাদি খুব রাগি ছিল কিন্তু তার চোখের মনি ছিলাম আমরা!!! আমার মা ও চাচি যখন কাজ করত দাদি আমাদের নিয়ে ওঠানে পাটি বিছিয়ে গল্প করত, রাজা রানীর গল্প, রাক্ষস খুক্ষস এর গল্প, আর বড় একটা থালাতে খাবার নিয়ে আমাদের সবাইকে খাওয়োত। আমরা তখন প্রতিযোগিতা করে খেতাম কে আগে খাবে! তোমাদের মতো এতো কষ্ট করে খাওয়াতে হতো না আমাদের !!! আমরা এতগুলো ভাইবোন বড় করতে আমাদের বাবা মাকে তেমন কোন কষ্টই করতে হয়নি; কারণ আমরা সারা দিন থাকতাম দাদা, দাদি, চাচা, চাচি, ফুফু ও বড় ভাইবোনের সাথে!

মা আমাদের কাছে এরা নেই কেন? আমাদের গ্রামে নিয়ে যাওনা কেন? শুরু হয়ে যায় আমার ছেলের হাজার প্রশ্ন! আমি আস্তে আস্তে ওদের সব প্রশ্নের উত্তর দেই! কিন্তু খুব একটা খুশি করতে পারিনি! কারন তার কেন দাদা দাদি নেই এটা সে মেনে নিতে পারছিল না! কারণ আমার ছোট্ট বেলার গল্পের সাথে ওদের ছোট্ট বেলার মিল খুজে পাচ্ছে না!

আসলে একটি শিশু সঠিক ভাবে বেড়ে উঠার জন্য যৌথ পরিবারের বিকল্প নেই! যৌথ পরিবারে একটি শিশু যে ভাবে হেসে খেলে আনন্দে ও সবার আদর যত্নে বড় হত পারে একক পরিবারে এটা কোন দিনও সম্ভবত নয়। এখন আমার চাইলেও সে আনন্দ আমাদের বাচ্চাদের দিতে পারিনা! তাদের কাছে আমাদের গল্প রুপকথার গল্পের মতো শুনায়! তবুও আমি চাই এরা এ গল্পগুলো শুনোক হৃদয়ে ধারণ করুক। এই ইট পাথরের গুহায় থেকেও একটু মাটির গন্ধ পাক!

আমি আমার দাদাকে দেখিনি কারণ দাদা আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন। তবে দাদা যে খুব ভাল মানুষ ছিল সেটা বড় হয়ে বাবা, মা ও ভাই বোনদের কাছে জেনেছি। আমার একটা বড় ভাই মারা যাওয়ার পর  আমার মা প্রায় পাগল হয়ে যায় সেই শোকে! তখন দাদা দাদি আগলে রাখে আমার মাকে! দাদা নাকি মাকে বলত, দেখবে তোমার আবার ছেলে হবে সে সবার মুখ উজ্জ্বল করবে! হয়ত দাদার দোয়ার জন্যই আমার ছোট্ট ভাই এর জন্ম হয় যাকে পেয়ে আমার মা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে!

আমি পাই আমার দাদিকে যে কিনা সারাদিন আমাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াত ।  আমাদের অনেকগুলো গরু, ছাগল ছিল ;আমরা স্কুল থেকে এসেই খাওয়ার পর দাদি আমাদের বাড়ির পাশে মাঠে নিয়ে যেতো, সেখান আমরা সবাই কানামাছি, বৌউছি, গোল্লাছুট, কুতকুত ইত্যাদি খেলা খেলতাম আর দাদি বসে বসে আমাদের পাহারা দিত। আমার ছেলে এসব খেলার নাম শুনলে বলে মা, আমরা কেন এসব খেলা খেলতে পারি না? আমি বলি সেই মাঠ যে তোমাদের নেই বাবা!! তখন ও সে দুঃখ ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে!

আমাদের এতো ভাইবোন দেখলে মানুষ কিছু বলবে বলে দাদি সবার কপালে কাল টিপ দিয়ে দিত! আমরা যখন স্কুলে পড়তাম কেউ কিছু বললে দাদি সাথে সাথে তার বাড়ি গিয়ে বকে আসতো! আর স্কুলে যখন খেলা দোলা চলত দাদি বলতো সব পুরুস্কার আমার চাই, চাই!আর আমরা যখন পুরষ্কার নিয়ে বাড়ি ফিরতাম দাদি যে কি খুশি হতো দাদি; সেগুলো নিয়ে সারা গ্রামে ঘুরে ঘুরে দেখাত আর বলত দেখ আমার নাতি নাতনীরা কতো পুরষ্কার পেয়েছে!!! সারাফ বলে মা আমি পুরুস্কার পেলে তুমি এতো খুশি হওনা কেন? মায়ের খুশি আর দাদা দাদির খুশির ধরণ এক হয়না বাবা!!!

কয়দিন আগেও আমাকে একটা স্কুলে প্রধান অতিথি হিসাবে দাওয়াত করে! সেখান থেকে ওরা অনেক গিফট দেয় । তা নিয়ে যখন বাসায় আসি হঠাৎ দেখি আমার মার চোখে পানি ছলছল করছে, বললাম কি হয়েছে মা? মা বলল জানিস আজ তোর দাদি বেচেঁ থাকলে অনেক খুশি হতো! তুই যখন ছোট্ট ছিলি তখন স্কুল থেকে অনেক পুরুস্কার পেতি সবাই না পেলেও তুই ব্যাগ ভর্তি পুরুস্কার নিয়ে বাসায় আসতি আর তোর দাদি খুব খুশি হতো। একদিন তুই একটা মগ এনে তোর দাদির হাতে দিয়ে বলেছিলি দাদি তুমি এটা দিয়ে পানি খেও আর তোর দাদি তখন নামাজ পড়ছিল, তিনি তখনই মোনাজাত করে বলেছিল হে আল্লাহ্ আমার নাতনী যেন সারা জীবন তার ভাল কাজের এমন পুরুস্কার নিয়েই ঘরে ফিরে আমি সেই দোয়া করে যাই!!! আমি বলেছিলাম আপনি দোয়া করে যান মা তাহলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই শুনবেন! হয়ত সেজন্যই আল্লাহ তোকে এমন চাকরি দিয়েছেন!!! তুই যখন সবার জন্য কাজ করিস তখন আমার ভাল লাগে আর তোর দাদির কথা মনে হয়! তোর দাদি আমাদের সাথে রাগ করলেও তোদের কাউকে  কিছু বলতে দিত না ! হে এটা সত্যি যে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাল রিজাল্ট করে পাশ করার পরও কেন বিসিএস এর জন্য ভাল করে চেষ্টা করিনি সেজন্য আমার ভাইবোনের মনে খুব কষ্ট। কিন্তু আমার মার কোন কষ্ট নেই কারণ সে যখন আমার বাসায় থাকে আমার কাজ দেখে শিক্ষকদের আনন্দ দেখে মার এটাই বিশ্বাস দাদি হয়তো এটাই চেয়েছিলেন! আর সেজন্যই আমার বিসিএস হয়নি! তার মতে আমি যদি বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডার পেতাম তা হলে একটা বিষয় এর শিক্ষক হতাম এবং কিছু ছেলে মেয়েকে পড়াতাম কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় এখন কতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সেবা করতে পারছি! আমি খুব কাছে থেকে তাদেরকে আমার সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছি আর এতেই আমার মা খুশি!

আমি বিশ্বাস করি একটা শিশু ছোট্ট থেকে বড় হতে হলে পরিবারের সবারই কমবেশি ভুমিকা থাকে। তাই তাদের ছোট্ট বেলা থেকে এই শিক্ষা প্রদান করতে হবে যে এরা যেন দাদা, দাদি, নানা নানি, চাচা, চাচি, ভাইবোনসহ প্রত্যেকে আলাদা ভাবে সম্মান করতে শিখে। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিরই যে সম্মান আছে সেটা বুঝাতে হবে ।, কারণ যদি ছোট্ট হোক আর বড় হোক অন্যকে সম্মান না করে তবে নিজেও সম্মান পাওয়া যায় না!

তাই আমিও আমার মার সাথে এটা বিশ্বাস করি দাদা দাদিসহ সকলের দোয়া আছে বলেই আজকের আমি, তাদের অবদান । যতদিন বেচেঁ থাকব ততদিন যেন মনে রাখতে পারি আল্লাহর কাছে সেই প্রার্থনাই করি সবসময়! আর সবার কাছে দোয়া চাই আমার দাদা দাদিসহ সকলের দাদা দাদিকেই যেন আল্লাহ বেহেস্ত নছিব করেন!!!!!


লেখকঃ কলামিস্ট ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার

আরও পড়ুন