একজন বাবার গল্প

হাসিবুর রহমান ভাসানী

আমার বর্তমান কর্মস্থল সরিষাবাড়ি,জামালপুর।
দুমাস হলো ঝালকাঠি থেকে বদলি হয়ে এখানটায় এসেছি।একটা ব্যাংকের সেকেন্ড ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি।
আমার ব্যাংকের বিপরীত পাশে অনেকগুলো দোকান রয়েছে;প্রতিদিন লাঞ্চ টাইমে ওখানেরই একমাত্র হোটেল ‘ভোজন’ এ খেতে যাই।
আজ হোটেলটা বন্ধ তাই সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম,পুরানো ছোট একটা দোকানে
কিছু মানুষের ভীড়।একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ রুটি ভাজছেন আবার তিনি নিজেই সার্ভ করছেন টেবিলে।
সাধারণত এত বেশি বয়স্ক লোককে আমি আগে কখনো এভাবে কাজ করতে দেখি নি।
হোটেল বন্ধ থাকায় পরপর দু তিন দিন ওখানটায় খেতে যাই।
সামান্য কৌতুহল জন্মে এই ভদ্রলোকের প্রতি।
জিজ্ঞেস করলাম…
–কাকা,একা একা এত কাজ করেন,একজন কর্মচারী রাখলেই তো পারেন।
–কি আর করবো বাবা,সারাদিনে কেবল এই দুপুরের সময়টাতেই কিছু লোক এখানে খেতে আসেন;আর বাকি সময় তো একদম ফাঁকা পড়ে থাকে।
কর্মচারী রাখলে পোষায় না।
–আপনার বাসা কোথায়..?
–এইটাই আমার বাসা।
–এটা বাসা হয় কিভাবে,এটা তো একটা দোকান..?
–পেছনের দিকটায় তোষক আর বালিশ রাখা আছে,রাত হলে ওখানেই শুয়ে পড়ি।
–আপনার ছেলেমেয়ে নেই..?
–আছে,২ ছেলে আর ১ মেয়ে।
–তারা কই থাকে..?
–জানি না বাবা।
–কেনো? তাদের সাথে যোগাযোগ হয় না..?
–আর যোগাযোগ,যোগাযোগ রাখলে কি আমার এই মরার বয়সেও রুটি ভাজা লাগে..!!
ভদ্রলোক কথাগুলো খুব আফসোস নিয়ে বললেন।
একটা অদ্ভুত বিষন্নতা লক্ষ করছিলাম তার চোখে মুখে।
আচ্ছা কাকা,আজ আর হাতে সময় নেই;কাল এসে বাকিটা শুনবো।
বাসায় এসে ওই বৃদ্ধের কথাগুলো বেশ ভাবালো আমায়,
এত বয়স্ক একজন মানুষ যাকে কিনা এখনো বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
পরদিন দুপুরবেলা আবার ওনার দোকানে যাই,

–আচ্ছা,আমায় একটু বলবেন,আপনার এই অবস্থাটা কেনো হলো..?
ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন…
–আমার বড় ছেলে রফিক।সেনাবাহিনীতে চাকরি করে।চাকরির তিন বছরের মাথায় ও বিয়ে করে।
ওর প্রমোশনও হয়।
প্রথম দিকে ও প্রায় প্রতি মাসেই বাড়িতে টাকা পাঠাতো।
এরপর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় ওর শ্বাশুড়িকে নিয়ে নেয়;বছর দুয়েক পরে ওর একটা ছেলে হয়।
এরপর থেকে বাসায় আর কোনো টাকা পয়সা পাঠায় না,বাড়িতে আসাও বন্ধ করে দেয়।
আমার ছেলে তার বউ,শ্বাশুড়ি আর ছেলেকে পেয়ে আমাদের কথা ভুলে যায়।
মাসের পর মাস গেলেও বাড়িতে একটা খোঁজ নিতো না।
এরপরে সব আশা ছিলো ছোটো ছেলেটাকে ঘিরে।
ও আমায় বললো,বাবা আমি বিদেশ যাবো;
বড় ভাইয়ের তো চাকরি আছেই,আমার তো কিচ্ছু নেই;
তুমি আমাকে আমাদের যেটুকু জমি আছে সেটা বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দাও।
অনেক চিন্তা করে দেখলাম,ছেলে বড়টা তো আট দশ বছর যাবৎ বাড়ির কোনো খোঁজ নিচ্ছে না বা যোগাযোগ ও করছে না।
ওর হিসেব আপাতত বাদ দিয়ে ছোট ছেলের কথা চিন্তা করি।
আমার সব ফসলি জমিজমা বিক্রি করে ওকে মালয়েশিয়া পাঠাই…এই ভেবে যে ও তো আমাদের আর ফেলতে পারবে না।
এর মাঝে ওর মা ও মারা যায়;আমি বাড়িতে একা হয়ে পড়ি কিন্তু তাও আর বিয়েশাদি করিনি। ছোট ছেলে চারবছর ছিলো বিদেশে।ও মাসে মাসেই টাকা পাঠাতো।দেশে ফিরে ও বিয়ে করে,
এর কয়েকমাস বাদে ও বউকে নিয়ে উত্তরে চলে যায় কিসের একটা ব্যবসা করবে বললো।
বছর ঘুরতেই ও বাড়িতে টাকা পয়সা পাঠানো বন্ধ করে দিলো;
বললো,বাড়ির সব খরচ আমি একা চালাবো কেনো,বড় ভাই আছে সে খরচ দিবে না..?
আমি একা একা আর টানতে পারবো না।
অথচ ওকে সব বিক্রি করে বিদেশে পাঠানোই হলো এই উদ্দেশ্যে যে,ওর বড় ভাই তো বাড়ির দিকে ফিরেও তাকায় না;ও যেন অন্তত বাড়ির খেয়াল রাখে।
এরপরে ছোটো ছেলেও আর যোগাযোগ করে না,কল দিলেও রিসিভ করে না।
এর আগে যখন ওকে বিদেশ পাঠানোর জন্য জমিজমাটুকু বিক্রি করলাম তার কয়েকদিন পর বড় ছেলে ফোন দিয়ে আমায় বেশ গালাগালি করেছিল যে,কেনো বিক্রি করলাম;সেও তো জমির অংশীদার ছিলো।
এরপরে মেয়েও ফোন করেছিলো,বেশ রাগান্বিত হয়েই বললো,বাবা তুমি কেনো বিক্রি করতে গেলে,
সব কেনো ছোটো ছেলের পেছনে ঢাললে..?
আমার অংশটা কই,আমিও তো জমির ভাগীদার ছিলাম।

এমনি করে আমার দুই ছেলে এক মেয়ে সবাই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
তারপরে আমি বুড়ো বয়সেও মাটি কাটা,মজুরির কাজ এগুলো শুরু করি।
যাতে অন্তত না খেয়ে মরাটা রোধ হয়।
শুনেছিলাম আমি শ্রমিকের কাজ করছি শুনে বড় ছেলে বেশ ক্ষিপ্ত হয়েছে….ছি ছি.. করছে।
সে এলাকার মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না এটা ভেবে যে তার বাবা মজুরের কাজ করে।

এরপরে অনটন আরও বাড়তে থাকে,শরীরেও আর শক্তি পাচ্ছিলাম না ভারী কাজগুলো করার জন্য।তারপর বাড়িটাও বিক্রি করে দেই।
আর এই দোকানটা আর এর সাথের দুটো রুম কিনে নেই।
রুটি ভাজি বিক্রি করি আর তাতে রোজ ১০০-২০০টাকা করে আসে;
সেটা দিয়েই কোনোমতে সংসার পার করি।
একা একা কাজ করতে কষ্ট হয় তাই শেষ বয়সে এসে আর একটা বিয়ে করি।
এটা শুনেও আমার ছেলেমেয়েরা সব একজোট হয়ে আমার বিরুদ্ধে লাগে।
শেষের বৌও এমন অনটনের সংসার ছেড়ে ছ’মাস পর আমাকে রেখে চলে যায়;
এরপরে ওই রুম দুটাও বিক্রি করে দেই।
তারপরের অবস্থাটা তো দেখতেই পাচ্ছেন।
ভদ্রলোক কথাগুলো বলছিলেন আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো।
অনেক্ক্ষণ ভাবলাম যে,নিজের ছেলেমেয়ে ও এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে…!!!
তারপরে ওনার দোকানে প্রায়ই যেতাম।
তিন মাস বাদে,হঠাৎ শুনলাম ভদ্রলোক মারা গেছেন।
আমি সাথেই সাথেই ছুটে গেলাম;ভাবলাম ওনার ছেলেমেয়েদের চেহারাটা একটু দেখবো।
আর জিজ্ঞেস করবো যে,কেনো নিজ বাবার সাথে আপনারা এমনটা করলেন।
আমার আর সেই সৌভাগ্যটা হলোনা,হতাশ হয়েই ফিরতে হলো।
নানা অযুহাতে ছেলে মেয়ের কেউই আসলো না।
হয়তো তারাও বুঝতে পেরেছে যে,এখানে আসলে এলাকার লোকজনের তিরস্কার শুনতে হবে।
তাই তারাও এড়িয়ে গেলেন।
নদীর পাড়ের একটা খাস জমিতে বৃদ্ধকে কবর দেয়া হয়।

ওনার গল্পটা আমি কোনোদিনও ভুলতে পারবোনা।
ছেলেমেয়ে যে এমনটাও হতে পারে সেটা ওনার মুখ থেকে না শুনলে হয়তো বিশ্বাসই করতে পারতাম না।
এরপরে ওই ভাঙাচোরা বন্ধ রুটির দোকানটার দিকে যতবারই চোখ যায় আমি কল্পনায় ততবারই বৃদ্ধকে স্পষ্ট দেখতে পাই;
একজন অসহায় বাবার মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও মেডিকেল  ছাত্র

আরও পড়ুন