বাবাদের ভালোবাসা

হাসিবুর রহমান ভাসানী

ন’বছর আগে আমি শেষ সিগারেট টা টানি আমার বাবার সাথে। এরপর আর কোনোদিন আমি সিগারেট খাইনি।
আর বাবাও তার ২১বছরের সিগারেট এর অভ্যেসটা ওইদিনই ছেড়ে দেন।বাবা ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সব থেকে প্রিয় মানুষ।যখন দেখলেন আমি সিগারেট খাওয়া শুরু করেছি;আমায় একটুও বকেন নি বা বেশি কিছু বলেনও নি শুধু শেষ বারের মতো সিগারেটটা মুখে নিয়ে মৃদু হেসে বলছিলেন,’ আমি আর সিগারেট ছুঁবো না।’

কলেজে উঠে যখন আমার প্রথম প্রেম হয়,মাঝে মাঝে বাবার পকেট থেকে লুকিয়ে টাকা নিতাম;বাবা কিন্তু বুঝতে পারছিলেন কিন্তু আমায় কিছুই বলেননি বরঞ্চ নীল রঙের শার্টটার পকেটে আরো বেশি খুচরো টাকা রাখতেন;
এরপর থেকে বাবা কোমরের ব্যথার অযুহাত দিয়ে রোজ আমাকেই বাজারে পাঠাতেন যাতে বাজার শেষে এক্সট্রা টাকাগুলো আমার পকেটে আসে;মা কিন্তু বারণ করেছিলেন;বাবা বললেন,’থাক না ওতো বড় হচ্ছে ওরও তো এগুলো শিখতে হবে।’

উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষায় মা খুব করে বাবাকে বলতেন রোজ যেন আমাকে পরীক্ষা শেষে গাড়িতে করে বাসায় নিয়ে আসে;
বাবা কিন্তু ভুলেও সেটা করেননি। বাবা আমাকে একটু একটু করে বড় হতে দিচ্ছিলেন,নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছিলেন যদিও তখন আমি এগুলো বুঝতাম না।

প্রথমবার যেদিন বাড়ি ছেড়ে ভার্সিটির হলে গিয়ে উঠি,মা আমাকে বেশ জড়িয়ে ধরে বেশ কান্না করছিলেন;বাবা কিন্তু একটুও কাঁদেন নি,বরং হাসি হাসি মুখ করে আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন
‘যা তোর বাবা সবসময়ই তোর সাথে আছে,আর হ্যাঁ তোর একাউন্টে দশ হাজার টাকা আমি দিয়ে দিয়েছি।মোবাইলটা বেশ পুরানো হয়ে গেছে,বদলে নিস।’

যদিওবা বাবা দুমাস আগেই আমায় নতুন মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন।বাবারা সব কথা প্রকাশ করেন না; বাবারা অনেকটা দূর অব্দি দেখতে পান।

যেদিন প্রথম বাবাকে বললাম,’বাবা আমি নিপুনকে বিয়ে করতে চাই.’
‘বাবা শুধু এটুকুই বলেছিলেন,তোর মাকে আগে ম্যানেজ কর,আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না।’
আমার উপর বাবার ভীষণ বিশ্বাস ছিলো।বাবা জানতেন তার ছেলে কোনোদিন এমন কিছু করবে না যাতে তার সমাজের কাছে হেয় হতে হবে।
গ্রাজুয়েশন শেষে যখন ভাবলাম ইউরোপ এ যাবো,মা তখন একশব্দে জানিয়ে দিয়েছিলেন ‘না’
বাবা কিন্তু মাকে ঠিকই ম্যানেজ করে নিয়েছিল।
আমাকে শুধু এটুকুই বলেছিলেন,
‘Don’t leave your dream.’

পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ অথচ অব্যক্ত ভালোবাসাটা হয়তো বাবারাই দিয়ে থাকেন;আমরা সেটা বুঝতে পারি না।
আর যখন বুঝতে পারি তখন হয়তো তারা আর থাকেন না।

ইউরোপ থেকে আসার এক বছরের মাথায় বাবা মারা গেলেন,আমারও সন্তান হলো।এখন আমিও একজন বাবা আর তাই বাবার সেদিনের সেই না বলা ভালোবাসাগুলো আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাই।

লেখকঃ সাহিত্যিক এবং মেডিকেল ছাত্র

 

আরও পড়ুন