নারীবাদী বা পুরুষবাদী না হয়ে মানববাদী হই

ইসরাত জেরীন শান্তা

নারীবাদী বা পুরুষবাদী শব্দগুলো থেকে বের হয়ে আমরা কী মানববাদী হতে পারি না? পুরুষের বিরুদ্ধে কথা বললে অর্থাৎ নারীর প্রতি পুরুষের অন্যায়, অবিচার বা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বললেই নারীবাদী তকমা লেগে যায়। অন্যদিকে নারীর বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করলেই সে পুরুষবাদী। সমাজের নারীবাদের সংখ্যা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সর্বময় ক্ষমতা পুরুষের।পরিবারের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে শুরু করে পরিবার পরিচালনার জন্য উপার্জন করা ইত্যাদি সমস্ত কিছু পুরুষের উপর নির্ভরশীল। নারীরা সেক্ষেত্রে শিক্ষাসহ নানা সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত একশ্রেণীর মানুষ, যাদের কর্মক্ষেত্র নিজ পরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বভাবতই নারীদের দমিয়ে রাখার মধ্যে, নারীর উপর কর্তৃত্ব আরোপের ক্ষেত্রে পুরুষজাতি সর্বদাই অতিউৎসাহী ছিল সবসময়।

অন্যদিকে এত এত বছরের অবহেলা, নিপীড়ন, পরাধীনতা নারীর মাঝেও যে জিদ হোক বা আক্ষেপ হোক বা সংকল্প তৈরি করেছে, তা নিঃসন্দেহে নারীর শক্তি হিসেবে কাজ করেছে অনেকখানিই। যেখানেই নারীর উপর আঘাত এসেছে সেখানে রচিত হয়েছে নারীর নতুন বীরত্বের কাহিনী। তবে সময় ধীরে ধীরে তার ভাব পাল্টাতে শুরু করলে নারীরাও তাদের রূপ পাল্টাতে শুরু করেছে যা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

যদি একটু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে চাই তবে এটাও কিন্তু দেখতে পাব যে, একদিন যে নারী তার সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়েছে তার পরিবার ও তার স্বামী সন্তানের জন্য; আজ সেই নারী যখন অতি স্বাবলম্বী, যখন সে সিদ্ধান্ত তৈরি ও তা আরোপ করার মতো ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়, তখন তারা যে পুরুষের উপর সর্বদা সদয়,নিষ্ঠ বা সুবিচারক থাকতে পারছেন তা কিন্তু নয়। পুরুষেরাও অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত হয় নারী দ্বারা। নারী কর্তৃক পুরুষের সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনারও কিন্তু কমতি নেই এ সমাজে।

প্রকৃতপক্ষে সমস্যা নারী বা পুরুষের নয়। সমস্যা আমাদের চিন্তা-চেতনার, মূল্যবোধের,মন-মানসিকতার। প্রধান সমস্যা ক্ষমতাগ্রহণ বা ক্ষমতারোহন থেকে শুরু করে ক্ষমতাপ্রণোয়ন বা ক্ষমতাদম্ভে গিয়ে ঠেকে যায়। লক্ষ্য করুন দুর্নীতিগ্ৰস্থ কোন দেশের প্রধান বা কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান বা কোন পরিবারের প্রধানের দিকে। ক্ষমতা মানুষকে তার মানবিকতা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সে আপোষ করে নেয় সকল অন্যায়,অবিচারের সাথে। সে নারীই হোক বা পুরুষ। নারীর অগ্রগতিতে পুরুষদেরই কেন আমরা শুধু দোষারোপ করি ভেবে দেখুন তো।

আজ যারা সফল নারী, তারা তাদের সফলতার পথে সত্যিকার অর্থে কয়জন নারীর সমর্থন পেয়েছেন? নারীর সফলতার পেছনে কোন পুরুষের কি কোনই ভূমিকা থাকেনি? হতে পারে সে তার বাবা,ভাই, স্বামী, সন্তান, বন্ধু বা পরিচিত বা অপরিচিত কেউ। একজন পুরুষের সফলতার পেছনে নারীর যেমন অবদান আছে, তেমনি এমন অজস্র নারী আছেন যাদের সফলতাযর পেছনে পুরুষ প্রতোক্ষ বা পরোক্ষভাবে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। নারীর প্রতি পুরুষের বা পুরুষের প্রতি নারীর অবহেলা, বৈষম্য অনেক তো হলো। এসব বাদ দিয়ে চলুন আমরা মানুষ হই, আমরা মনুষ্যত্বের জন্য লড়াই করি। আমরা প্রতিটা মানুষকে তার নিজ নিজ অবস্থানে রেখে মূল্যায়ন করি। যার যার অধিকার তার তার জায়গা থেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করি। আত্মঅহমিকা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ প্রথা ত্যাগ করে সমতা, শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলি।

আমরা নারী বা পুরুষ হিসেবে আলাদা সত্ত্বা হলেও, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক সত্ত্বা। নারীবাদী বা পুরুষবাদী হয়ে বিরোধ না করে মানববাদী হয়ে সাম্যের, সৌহার্দের ও মানবিকতার গান গাই।

“প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা যখন যার,

তাণ্ডব তখন তার,

হোক সে নারী বা পুরুষ।”

আসুন সকলে মিলে এ প্রথার অবসান ঘটাই।

লেখকঃ কবি  ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন